ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে জুমের সোনালি উৎসব: ঐতিহ্য ও টিকে থাকার লড়াই


অর্ণব মল্লিক, কাপ্তাই photo অর্ণব মল্লিক, কাপ্তাই
প্রকাশিত: ২২-৯-২০২৬ দুপুর ২:২৫

পাহাড়ের ঢালে ঢালে তখন সোনালি রঙের ছটা। কোথাও পাকা ধান কাটার ব্যস্ততা, কোথাও চলছে ধান মাড়াই। পাহাড়ের চূড়ায় ছোট্ট মাচাং ঘর, চারপাশে সবুজের সমারোহ। তীব্র রোদ-বৃষ্টি আর দুর্গম পথ পেরিয়ে জুমিয়াদের অবিরাম পরিশ্রমে এখন মুখর রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের পাহাড়।

আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে পাহাড়ি জনপদে। বদলেছে জীবনযাত্রার অনেক কিছুই। কিন্তু তারপরও জুমচাষ এখনো পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের জীবিকা ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বছরের পর বছর ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই চাষাবাদ শুধু ফসল ফলানোর পদ্ধতি নয়, বরং পাহাড়ি মানুষের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও টিকে থাকার সংগ্রামেরও অংশ। কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরমের জামাইছড়ি, সীতাপাহাড়, চাকুয়াপাড়া, মৈদং, আড়াছড়ি, হরিণছড়া, ব্যাঙছড়ি, ওয়াগ্গার রামপাহাড় ও মইংপাড়াসহ বিভিন্ন পাহাড়ে এখন জুমচাষের নান্দনিক সমারোহ। বিশেষ করে চিৎমরমের জামাইছড়িতে প্রায় এক হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ে মারমা সম্প্রদায়ের জুমিয়ারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই প্রাচীন চাষাবাদ করে আসছেন।

চলতি মৌসুমে কাপ্তাই উপজেলায় ৩৩৬ হেক্টর জমিতে জুমচাষ হয়েছে। এসব জমিতে আবাদ হয়েছে পাহাড়ি জাতের নানা ধরনের ধান। এর মধ্যে রয়েছে তুর্কি ধান, গ্যালন ধান, দুলি ধান, মাংসাই ধান, বাসমতি ধান, বাঁশ ধান, পাত্তিকী ধান, বিন্নি ধান—সাদা ও লাল দুই ধরনেরই—এবং কবরকসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি ধান।ধানের পাশাপাশি জুমের জমিতে ফলছে নানা ধরনের ফসল। কলা, হলুদ, আদা, পেঁপে, পাহাড়ি আলু, তিল-তিষী, পাহাড়ি মরিচ, বেগুন, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, শিম ও ভুট্টার পাশাপাশি চাষ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি।
একটি জুমের জমিতে একই সঙ্গে এত ধরনের ফসলের সমারোহ পাহাড়ি কৃষির বৈচিত্র্যকেই তুলে ধরে। জুমচাষ যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। পাহাড়ের ঢালে জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই রয়েছে কঠোর পরিশ্রম।

ফাল্গুন-চৈত্রে পাহাড় পরিষ্কার করে জুমের উপযোগী করা হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে বীজ রোপণের পর শুরু হয় দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও পরিচর্যা। বর্ষার বৃষ্টির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল এই চাষাবাদে জুমিয়াদের প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে হয়।

ফসল রক্ষায় পাহাড়ের চূড়ায় তৈরি করা হয় ছোট ছোট মাচাং ঘর। সেখানেই রাত কাটিয়ে বন্যপ্রাণীর হাত থেকে ফসল পাহারা দেন জুমচাষিরা। তীব্র রোদ, বৃষ্টি, দুর্গম পাহাড়ি পথ ও বন্যপ্রাণীর ঝুঁকি—সবকিছু উপেক্ষা করেই চলে তাদের জীবনযুদ্ধ।ভাদ্র মাস থেকে শুরু করে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে পাকা ফসল ঘরে তোলেন জুমিয়ারা। তাই এই সময়টায় পাহাড়ের আনাচে-কানাচে দেখা যায় ফসল কাটার উৎসবমুখর ব্যস্ততা।

জুমিয়াদের তথ্যমতে, একটি জুমে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং ফলন ভালো হলে সেখান থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। তবে এবার প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলন না পাওয়ায় অনেকের মুখেই হতাশার ছাপ। সময়মতো কীটনাশক ব্যবহার ও সঠিক পরিচর্যার অভাবে কিছু ধান ও অন্যান্য ফসল পোকার আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় জুমিয়া সুইহ্লামং মারমা ও উসুইসিং মারমার কণ্ঠে তাই আক্ষেপ। তিনি জানান, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সময়মতো নিয়মিত সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পেলে জুমচাষ থেকে আরও বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব হতো।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পানির সংকট। বিশেষ করে শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে পর্যাপ্ত পানির অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।মৈদং ও ব্যাঙছড়ি পাহাড়ের জুমচাষি সাইংসুই ও স্বপ্না মারমার প্রত্যাশা, সরকারিভাবে সেচ বা পানির ব্যবস্থা করা গেলে তারা আরও বড় পরিসরে শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন করতে পারবেন। তাদের মতে, পাহাড়ে পানির ব্যবস্থা করা গেলে শুধু জুমের উৎপাদনই বাড়বে না, একই সঙ্গে কৃষকদের আয়ও বাড়বে।

কাপ্তাই উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের বিভিন্ন পাহাড়ি জমিতে নিয়মিত জুমচাষ হয়ে থাকে।

কাপ্তাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (কৃষিবিদ) মো. আহসান হাবীব বলেন, ‘পাহাড়ের মানুষের কাছে জুমচাষ একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা। কৃষি বিভাগ থেকে তাদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হয়ে থাকে।’
তিনি জানান, জুমচাষের ফলে পাহাড়ি মাটির কিছুটা ক্ষতি হলেও প্রতিবছর স্থান পরিবর্তন করে চাষ করার কারণে বড় ধরনের ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। জুমের ফলন ভালো হলে পাহাড়ে খাদ্যঘাটতিও অনেকটা কম থাকে। তবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুমচাষ, উন্নত জাতের বীজ ও প্রয়োজনীয় সার সহজলভ্য করা গেলে উৎপাদন দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।তাতে শুধু নিজেদের খাদ্যচাহিদা মেটানো নয়, বাড়তি ফসল বাজারে বিক্রি করে আয় করার সুযোগও তৈরি হবে। একই জমিতে সারা বছর বিভিন্ন ফসল চাষের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে পাহাড়ি মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটতে পারে। 

কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে জুমের ধান কাটার এই দৃশ্য তাই নিছক ফসল ঘরে তোলার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, পাহাড়ি মানুষের সংস্কৃতি ও প্রকৃতিনির্ভর জীবন। প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলো প্রতিকূলতার মধ্যেও জুমের জমিতে স্বপ্ন বোনেন। কখনো সেই স্বপ্ন সোনালি ধানের শিষ হয়ে ঘরে ফেরে, কখনো পোকার আক্রমণ কিংবা পানির সংকটে ম্লান হয়ে যায়।তারপরও থেমে থাকে না জুমচাষ। কারণ পাহাড়ের মানুষের কাছে এটি শুধু জীবিকা নয়—এটি তাদের শিকড়, সংস্কৃতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক অনন্য ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরেই কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে আজও চলছে সোনালি ফসল ঘরে তোলার উৎসব, আর তার আড়ালে টিকে থাকার নিরন্তর লড়াই।

এমএসএম / এমএসএম

চাঁপাইনবাবগঞ্জে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ প্রশাসন

রাজারহাটে ইজিবাইকের চার্জার লাইন খুলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অটোচালকের মৃত্যু

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি শ্রমিক ফেডারেশনের

রায়গঞ্জে পাঁচ পিস ইয়াবাসহ কথিত মানবাধিকারকর্মী ও কবিরাজ গ্রেপ্তার

রশি ধরে টান দিতে বিস্ফোরিত হলো পটকা জাতীয় বস্তু ! এলাকায় আতঙ্ক

কু‌ড়িগ্রা‌মে বিদ‌্যুৎস্পৃষ্ট হ‌য়ে অ‌টোচাল‌কের মৃত‌্যু

সুধারামে অটোরিকশায় চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চালকের মৃত্যু

টাঙ্গাইলে এলজিইডি 'র ১০ কোটি টাকার সেতুতে রডের বদলে বাঁশ দিয়ে ঢালাই

কোনাবাড়ীতে বিল্ডিং কোড অমান্য করে রাস্তা দখল করে ভবন নির্মাণের অভিযোগ

কোনাবাড়ীতে শ্রমিক পুলিশ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া

বকশীগঞ্জে সাংবাদিক হিলারীর বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন

ঘরে ঘুমিয়ে থাকা মাদ্রাসা ছাত্রের মরদেহ মিলল ধান খেতের পাশে

সারের দাবিতে কুড়িগ্রামে কৃষকদের সড়ক অবরোধ