নওগাঁয় কারাম উৎসবে তুলে ধরা হলো কার্মা ও ধার্মা—দুই ভাইয়ের কাহিনি
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে পূজাস্থানে জড়ো হন শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। পুরোহিত কিচ্ছার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেন কার্মা ও ধার্মা—দুই ভাইয়ের কাহিনি। কিচ্ছা শেষে নারীরা পরস্পরকে খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়ে উপোস ভাঙেন। পরে কারাম ডালের চারপাশে ঘুরে ঢাক, মাদল ও করতালের তালে তালে নাচেন তাঁরা।
বিকেলে ধর্মীয় বিভিন্ন আচার শেষে গীত গাইতে গাইতে কারাম ডাল নিয়ে যাওয়া হয় হাইস্কুল মাঠে। সেখানে মাঠের মাঝখানে চিহ্নিত করা স্থানে কারাম ডাল পুঁতে রাখেন। সেই কারাম বৃক্ষের ডাল ঘিরে নৃত্য পরিবেশন করেন বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নৃত্যদল। পরে মাঠ থেকে কারাম ডাল তুলে আত্রাই নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
এভাবেই নওগাঁর পত্নীতলায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কারাম উৎসব উপলক্ষে আদিবাসী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (২৩সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার নজিপুর হাইস্কুল মাঠে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখা এই সাংস্কৃতিক মিলনমেলার আয়োজন করে। সহযোগিতা করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন অ্যাসেড ফাউন্ডেশন ও রুমিয়া প্রফেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট।
এর আগে মঙ্গলবার (২২সেপ্টেম্বর) উপজেলার বুজরুক মামুদপুর গ্রামে কারাম পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
দুই দিনব্যাপী এই উৎসবের মিলনমেলায় পত্নীতলা উপজেলার ছাড়াও পাশ্ববর্তী মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর, পোরশা,ধামইরহাটসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অর্ধশতাধিক সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়।
মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর বুজরুক মামুদপুর ও আশপাশের গ্রামগুলোতে শুরু হয় কারাম পূজার মূল আচার। দিনভর উপোস থাকেন নারীরা। সন্ধ্যার পর গ্রামের একদল কিশোরী কারামগাছের ডাল কেটে এনে পূজার বেদিতে স্থাপন করেন। এরপর শুরু হয় পূজা। দিয়াবাতি, জাওয়া ডালি ও ফলমূলের ডালা উৎসর্গ করা হয় কারাম দেবতার উদ্দেশে।
সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা গ্রামে গ্রামে কারাম বৃক্ষের (খিল কদম) ডাল পূজাকে কেন্দ্র করে এই উৎসবের আয়োজন করেন। ধর্মীয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার কাছে মনের কামনা-বাসনা পূরণের লক্ষ্যে প্রার্থনা করেন তাঁরা। এ ছাড়া নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি আন্দোলনের অংশ হিসেবে বেশ কয়েক বছর ধরে জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠনগুলো এই পূজাকে ঘিরে নওগাঁর বিভিন্ন অঞ্চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সম্মেলনের আয়োজন করে আসছে। ১৯৯৬ সাল থেকে কারাম পূজাকে ঘিরে নওগাঁসহ সমতলের বিভিন্ন এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সম্মেলন করে আসছে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ।
কারাম বৃক্ষের সঙ্গে কৃষি ও প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন এই জনগোষ্ঠীর মানুষ। কারাম মূলত ফসলকেন্দ্রিক উৎসব। এটি ডালপূজা নামেও পরিচিত। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষে এ উৎসব হয়। এ সময় করম দেবতার উপাসনা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এতে জমির উর্বরতা ও ফসলের ফলন বাড়ে।
এই উৎসবে অংশ নেওয়া বুজরুক গ্রামের বিসরি এক্কা, সোহাগী টপ্প্যা, ধরনাই বিজিপাড়া গ্রামের সবিতা কুজুরসহ ছয়-সাতজন নারী জানান, আগে প্রতিবছরই কারাম উৎসব হতো। খরচের কারণে এখন প্রতিবছর এই উৎসব হয় না। এনজিওগুলো সহযোগিতা করলে গ্রামের লোকজন এখন এই উৎসব করে। এই উৎসবে গ্রামে সাজ সাজ রব উঠে যায়। বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনেরা আসে। ভালো লাগে।
স্থানভেদে কারাম উৎসব চলে পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত। উৎসব ঘিরে অংশ নেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। সাঁওতাল, ওরাঁও, মাহাতো, পাহান, মাহালীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নিজেদের রীতি ও বিশ্বাস অনুযায়ী পালন করেন এই উৎসব।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখার সভাপতি সুবোধ ওঁরাও বলেন, ‘আদিবাসীদের সব উৎসব, পালাপার্বণ প্রকৃতিকে ঘিরে। কারাম ডাল ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। নতুন ফসল বপনের আচার প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের সম্পর্কের কথাও মনে করিয়ে দেয়। একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, সহযোগিতা ও ঐক্যের বন্ধনই সমাজকে টিকিয়ে রাখে। আধুনিকতার ঝড় যতই আসুক, এই ঐতিহ্য আমাদের জীবন ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে থাকবে।’
কারাম উৎসব শুধু ধর্মীয় আচার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়, পারস্পরিক বন্ধন ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। গান, নাচ ও নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তাঁদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। কারাম উৎসব তাই তাঁদের কাছে শুধু একটি উৎসব নয়, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখারও একটি আয়োজন।
পত্নীতলা উপজেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাঙস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক যোগেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ হচ্ছে সংস্কৃতিপ্রিয় ও সংস্কৃতিবান্ধব একটা জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের সমতল ভূমিতে যে কয়েকটা জনগোষ্ঠী আছে তার মধ্যে নওগাঁ হচ্ছে একটা ব্যতিক্রমধর্মী জেলা। এই জেলার ১১টি উপজেলার মধ্যে ১০টি উপজেলাতেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মানুষের বসবাস। এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মানুষের প্রধান উৎসব হচ্ছে কারাম উৎসব। কারাম পূজা হচ্ছে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আদি একটি অনুষ্ঠান।’
অন্যদের মধ্যে উৎসব উপভোগ করতে এসেছিলেন পত্নীতলা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা, চলচ্চিত্র শিল্পী ড্যানি সিডাক, বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মির্জা নুরুল গণি শোভন, অ্যাসেড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মুরাদ হোসেন প্রমুখ।
এমএসএম / এমএসএম
উলিপুর সরকারি কলেজে নবীন বরন অনুষ্ঠিত
জামিনে বের হয়ে এসে মাদকব্যবসায়ি ফের গ্রেপ্তার
পাবনায় মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব ও করণীয় শীর্ষক কর্মশালা অনুষ্ঠিত
লাকসামে নওয়াব ফয়জুন্নেচ্ছা সরকারি কলেজের নবীন বরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত
বগুড়ায় মাইক্রোবাস-ট্রাক সংঘর্ষে প্রবাসীসহ নিহত ২
উত্তরাঞ্চলে আউশ ধানের কম দাম কৃষকদের লোকসান বাড়াচ্ছে উচ্চ উৎপাদন খরচের মাঝে ধানের দরপতন
আওয়ামী লীগ-কে ফেরাতে জামায়াতের দৌড়ঝাঁপ চলছে: রাশেদ খান
কুমিল্লায় একরাতে ১৮ থানায় পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে আটক ৬২৪
নরসিংদীতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্বাস্থ্যবিষয়ক ফ্যামিলি হেলথ ফোরাম
চট্টগ্রামে অগ্রণী ব্যাংকের পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত
নওগাঁয় কারাম উৎসবে তুলে ধরা হলো কার্মা ও ধার্মা—দুই ভাইয়ের কাহিনি
বাবুগঞ্জ ডিগ্রী কলেজে নবীন শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস অনুষ্ঠিত