ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চুনতি অভয়ারণ্যে বনখেকোদের তাণ্ডব


বেলাল উদ্দিন photo বেলাল উদ্দিন
প্রকাশিত: ৩০-৯-২০২৬ দুপুর ২:৩৫

‌দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আধার এবং এশীয় বন্য হাতির নিরাপদ প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের আওতাধীন হারবাং বনবিট। প্রাকৃতির পরম মমতায় গড়ে ওঠা এই অভয়ারণ্য কেবল বিপন্ন প্রজাতির এশীয় হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজননকেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক চলাচলের প্রধান রুট বা করিডোর হিসেবেই ব্যবহৃত হয় না, বরং এটি বিলুপ্তপ্রায় মায়া হরিণ, বন্য শূকর, মেছো বিড়াল এবং অগণিত বিরল প্রজাতির পাখি ও উদ্ভিদরাজির এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তবে প্রাকৃতিক সুরক্ষার এই প্রাচীরে আজ মারাত্মক ফাটল ধরেছে। চুনতির হারবাং বিটের গহীন অরণ্যে এখন আর বন্যপ্রাণীর কলকাকলি বা হাতির অবাধ বিচরণ দেখা যায় না; বরং সেখানে ভর করেছে বনখেকো ও ভূমিদস্যুদের থাবা। সুরক্ষিত অভয়ারণ্যের বুক চিরে চলছে বনভূমি দখলের এক নজিরবিহীন প্রতিযোগিতা। সরকারি সংরক্ষিত বনের চিরহরিৎ গাছপালা উপড়ে ফেলে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে একটার পর একটা ছনখোলা এবং অবৈধ মৎস্য খামার।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ চিত্র। বনের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা করার বদলে শতবর্ষী প্রকাণ্ড সেগুন, বিশালাকার গর্জন এবং বন্যপ্রাণীদের খাদ্যের সংস্থানকারী ঐতিহ্যবাহী ফলজ গাছগুলো নির্মমভাবে কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। একই সাথে নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে বন্যপ্রাণীদের শতাব্দী প্রাচীন নিরাপদ প্রজাতিভিত্তিক বিচরণক্ষেত্র ও চলাচলের স্বাভাবিক পথ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রত্যক্ষ যোগসাজশ, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ এবং রহস্যজনক নীরবতার কারণেই এই অবৈধ দখলদারিত্ব ও প্রাকৃতিক ধ্বংসযজ্ঞ দিন দিন আরও জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, হারবাং স্টেশনের জোবাইর মাঝি নামক এক মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে স্থানীয় বন কর্মকর্তাদের সাথে রফদফা করে একর প্রতি বছরে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা গোপন খাজনা তোলা হয়। এই গোপন আর্থিক লেনদেনের বিনিময়েই অভয়ারণ্যের ভেতর অবৈধ ছনখোলা গড়ে তোলার এক ধরণের অলিখিত ‘বৈধতা’ দেওয়া হচ্ছে। সংরক্ষিত এই বনভূমি জবরদখল ও অনিয়ন্ত্রিত গাছ কাটার হাত থেকে রক্ষায় স্থানীয় বন বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের দৃশ্যমান বা কার্যকরী ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না, যা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের মনে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বন বিভাগের দাপ্তরিক হিসাব অনুযায়ী, হারবাং অভয়ারণ্য এলাকায় সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনের মোট আয়তন প্রায় ২,৬২১.৯৫ একর। সরকারি নথিপত্রে জবরদখলের পরিমাণ মাত্র ২৫১.১১ একর হিসেবে দেখানো হলেও সরেজমিনে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একদম ভিন্ন বাস্তবতা। বর্তমানে সরকারি হিসাবকে বহু পেছনে ফেলে বাস্তবে জবরদখল করা বনাঞ্চলের পরিমাণ ৫০০ একরেরও বেশি ছাড়িয়ে গেছে। বনটির এক বিশাল এলাকা জুড়ে অন্তত ১৫টি পৃথক স্পটে এক ডজনেরও বেশি প্রভাবশালী দখলদারের নেতৃত্বে বিটের আওতাধীন প্রায় ১০০ একর বনাঞ্চলকে পুরোপুরি সমতল করে গড়ে তোলা হয়েছে একচ্ছত্র ছনখোলা। অভিযোগ রয়েছে, এসব ছনখোলায় ঘাস চাষের সুবিধার্থে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা প্রাকৃতিক বৃক্ষরাজি কেটে পুরো এলাকা ফাঁকা করে ফেলা হয়। এভাবে নির্বিচারে বনাঞ্চল ধ্বংস করার কারণে চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বাস্তুতন্ত্র।

প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং খাদ্যের চরম সংকট দেখা দেওয়ায় বিপন্ন বন্যপ্রাণীর দল এখন অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যাকুল হয়ে পড়েছে। খাবারের সন্ধানে বন্য হাতির পাল বাধ্য হয়ে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। এতে করে লোকালয়ের ঘরবাড়ি ধ্বংস, সাধারণ মানুষের ফসল নষ্ট হওয়া এবং মানুষের জীবনহানির মতো ঘটনা নিয়মিত ডালভাতে পরিণত হয়েছে। এতে করে চরম আকার ধারণ করেছে মানব-হাতি দ্বন্দ্ব। এখানেই শেষ নয়; অভয়ারণ্য এলাকাটির মাঝখান দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে উচ্চগতির রেললাইন নির্মাণ করার ফলে সেই রেলপথে কাটা পড়ে প্রায়শই প্রাণ হারাচ্ছে বিপন্ন এশীয় হাতি। অন্যদিকে, দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অভয়ারণ্য ছেড়ে লোকালয়ের দিকে ছুটে আসা হরিণগুলোকে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করতে হচ্ছে। শিকারিরা অবাধে এসব হরিণ শিকার করে মাংস বিক্রি করছে এবং পাখি নিধনের মহোৎসব চালাচ্ছে। তদুপরি, ছন কাটার পর ওই জমিতে নতুন ছন গজানোর আশায় দখলদারেরা পরিকল্পিতভাবে পুরো এলাকায় আগুন লাগিয়ে দেয়। সেই আগুন মুহূর্তের মধ্যেই মারাত্মক দাবানলে রূপ নিয়ে বনের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের সেই প্রলয়ঙ্করী শিখায় হাজার হাজার ছোট-বড় বৃক্ষরাজি, সরীসৃপ, পাখির বাসা এবং বন্যপ্রাণী জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, যা চুনতির প্রকৃতিকে ঠেলে দিচ্ছে এক অপূরণীয় ধ্বংসের মুখে।অনুসন্ধানে আরো জানা যায়,মগঘোনায় ২০২০-২১ সালে রেলওয়ে প্রকল্পের ৭৫ হেক্টর বাগান ছিল যেটি দখল করে ও ছনখোলা করা হয়েছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে নেমে হারবাং বনবিটের গয়ালমারার পশ্চিমে অবস্থিত মগপাড়া বিল ও চিতার বিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। সেখানে প্রায় ৩০ একর সংরক্ষিত বনভূমির শতবর্ষী সেগুন ও গর্জন গাছ কেটে সম্পূর্ণ ছনখোলা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উত্তর হারবাং মধ্য বৃন্দাবনখীল এলাকার মৃত নূর আহমদের ছেলে মাহমুদুল হকের দখলে রয়েছে এই বিশাল বনভূমি। একইভাবে বনাঘোনা এলাকায় বন বিভাগের সরকারি জায়গার বিশাল একটি অংশ কেটে ছনখোলা বানিয়ে দখলে রাখার তীব্র অভিযোগ উঠেছে উত্তর হারবাং করমমুহুরী পাড়ার বাসিন্দা মৃত শহর আলীর ছেলে আবদুল আজিজ ও একই এলাকার ফাতেমা বেগমের বিরুদ্ধে। এছাড়া গয়ালমারা এলাকার মোহাম্মদ আলী, গাট্টি গফুর, উত্তর হারবাং ভিলেজার পাড়ার হাকিম আলী ও মো. শফি এবং ভান্ডারীর ডেপার আব্দুস শুক্কুরসহ আরও একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির দখলে রয়েছে প্রায় ৫০ একর সংরক্ষিত বনভূমি। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বনবিট কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ মদদে বাৎসরিক গোপন খাজনা এবং এককালীন মোটা অঙ্কের সেলামির মাধ্যমে এসব অবৈধ দখলের মহাসুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে চুনতির বিরল পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত মাহমুদুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে হারবাং বনবিট কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, বনভূমি দখল, গাছ কাটা ও ছনখোলা তৈরির বিষয়ে তিনি অবগত নন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বনভূমি দখলের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য তাঁর কাছে নেই বলেও জানান তিনি।

চুনতি বন্যপ্রাণী ও অভয়ারণ্য রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখের বক্তব্য জানতে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে বনভূমি দখল, গাছ কাটা ও ছনখোলা তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক প্রশ্ন করা হয়। তবে তিনি প্রশ্নগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমএসএম / এমএসএম

৫০৭ কোটি টাকার ভুয়া বিল দেয়ায় মাগুরা পল্লী বিদ্যুতের জিএম তাৎক্ষণিক বরখাস্ত

চুনতি অভয়ারণ্যে বনখেকোদের তাণ্ডব

বাঘায় মাদক সেবনের দায়ে যুবকের ৬ মাসের কারাদণ্ড

পঞ্চগড় পৌর শহরে ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার

নাগরিক সেবায় প্রকাশ্য ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ: কচুয়ায় ইউপি প্রশাসক অবরুদ্ধ, উদ্ধার করল প্রশাসন

সিংড়ায় ৫ দিন ধরে গৃহবধূ ও শিশুকন্যা নিখোঁজ, সন্ধান চায় পরিবার

চাঁদপুরে কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে অভিযান, ১১ জনের কারাদণ্ড

প্রকৃতির সান্নিধ্যে প্রশান্তি আর বিনোদনের অপূর্ব ঠিকানা " শালিখা ইকোপার্ক "

বরিশালের আটটি কলেজে একাদশে শ্রেণিতে এবারও মেলেনি কোনো শিক্ষার্থী

নোয়াখালী মুছাপুর রেগুলেটর নির্মাণে ৭৫১ টাকার প্রকল্প অনুমোদন

টুঙ্গিপাড়ায় পুকুর-বিলে ছাড়া হলো ২৮৫ কেজি মাছের পোনা

নাজিরপুরের বাবুরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়: ছয় দশক ধরে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি

চাঁদপুরে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ৩৩ আ.লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা