ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬

চায়ের দেশে কফির কাপে বদলে যাচ্ছে আড্ডা


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১-১০-২০২৬ দুপুর ১২:১২

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। রাজধানীর যে–কোনো একটি ক্যাফেতে ঢুকলেই চোখে পড়ে চেনা অথচ একসময় অচেনা এক দৃশ্য। এক টেবিলে দুই-তিনজন গল্পে মশগুল, পাশের টেবিলে ল্যাপটপ খুলে কাজ করছেন তরুণ শিক্ষার্থী বা পেশাজীবী। কোথাও আবার কয়েকজন মিলে আড্ডা দিচ্ছেন। টেবিলজুড়ে চায়ের কাপের বদলে দেখা যাচ্ছে ক্যাপাচিনো, লাতে, আমেরিকানো কিংবা মোকার মগ।

চায়ের দোকানের আড্ডার জন্য পরিচিত বাংলাদেশে কফি অবশ্য এখনো চায়ের জায়গা দখল করেনি। তবে শহুরে মানুষের অভ্যাসে কফির উপস্থিতি আগের চেয়ে স্পষ্ট। শুধু ঘুম কাটানোর পানীয় হিসেবে নয়, বিকেলের আড্ডা, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, কাজের ফাঁকে বিরতি কিংবা একান্তে কিছু সময় কাটানোর সঙ্গী হিসেবেও কফি জায়গা করে নিচ্ছে।

ঢাকার গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরা, বসুন্ধরা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শপিং মল ও বাণিজ্যিক এলাকায় এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্যাফে ও কফিশপ। নর্থ অ্যান্ড কফি রোস্টার্স, গ্লোরিয়া জিনস কফিজ, আরাবিকা কফি, দ্য কফি বিন অ্যান্ড টি লিফ, তাবাক কফির মতো পরিচিত ব্র্যান্ডের পাশাপাশি ছোট-বড় আরও অনেক স্বাধীন ক্যাফে তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের কফি সংস্কৃতির বাজার এখনও তুলনামূলক ছোট। ঢাকায় কফিকে ঘিরে একটি নতুন সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। বাজারটি এখনো পরিপক্ব না হলেও কফিশপগুলো এগোচ্ছে। কফির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর দামেও তৈরি হয়েছে নানা স্তর।

পাড়ার সাধারণ চায়ের দোকানে ১৫ থেকে ২৫ টাকায় যেখানে চা পাওয়া যায়, সেখানে একটি ভালো ক্যাফেতে এক কাপ কফির জন্য গুনতে হচ্ছে কয়েকশ টাকা। নর্থ অ্যান্ড কফি রোস্টার্সের একটি আউটলেটের প্রকাশিত মেনুতে আমেরিকানোর দাম ২৫০ টাকা, লাতে ও ক্যাপাচিনো ৩২০ টাকা। বড় কাপের ক্যাপুচিনো ৪২০ টাকা। বিভিন্ন ফ্লেভারের লাতে ৪০০ টাকা এবং বিশেষ ধরনের কফি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে।

গ্লোরিয়া জিনস কফিজের বিভিন্ন আউটলেটেও কফির পাশাপাশি রয়েছে নানা ধরনের ঠান্ডা কফি, খাবার ও ডেজার্ট। প্রতিষ্ঠানটির গুলশান আউটলেট রাত ১টা পর্যন্ত খোলা থাকে। অর্থাৎ শুধু দিনের বেলার পানীয় হিসেবে নয়, রাতের আড্ডার সঙ্গী হিসেবেও কফিশপগুলো নিজেদের জায়গা তৈরি করছে।

আরাবিকা কফির গুলশান, বনানী ও বসুন্ধরা এলাকার আউটলেটগুলোতেও নিয়মিত ভিড় দেখা যায়। তাবাক কফির একাধিক শাখা রয়েছে ধানমন্ডি, গুলশান ও অন্যান্য এলাকায়। দ্য কফি বিন অ্যান্ড টি লিফও ঢাকার কফিপ্রেমীদের কাছে পরিচিত একটি নাম।

সব মিলিয়ে ঢাকার বাজারে এক কাপ কফির দাম মোটামুটি ২০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে থাকলেও বিশেষায়িত বা ফ্লেভারড কফির ক্ষেত্রে তা ৫০০ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। অবশ্য এটি কোনো নির্দিষ্ট বাজারদর নয়। কফির ধরন, আকার, উপকরণ, দোকানের অবস্থান ও ব্র্যান্ডের ওপর দাম নির্ভর করে।

কফিশপে শুধু কফি খেতে যান না অনেকে

কফিশপের জনপ্রিয়তার গল্প শুধু কফির স্বাদ দিয়ে শেষ হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জায়গা, পরিবেশ ও সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা।

ঢাকার অনেক কফিশপে দেখা যায়, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছেন, কেউ ল্যাপটপে অফিসের কাজ করছেন, কেউ পড়াশোনা করছেন। আবার অনেকে শুধু এক কাপ কফি নিয়ে বসে থাকছেন। ফলে কফিশপ হয়ে উঠছে শহুরে জীবনের এক ধরনের সামাজিক পরিসর।

নর্থ অ্যান্ড কফি রোস্টার্স তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, তারা ২০১১ সাল থেকে স্পেশালিটি কফি সংগ্রহ, রোস্টিং ও ব্রিউ করছে। বর্তমানে ঢাকায় তাদের ১৪টি এবং উখিয়ায় একটি শাখা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে কফি বিন সংগ্রহ করে।

অন্যদিকে, গ্লোরিয়া জিনস কফিজ বাংলাদেশ তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, তারা অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা কফি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের কফি ও পানীয় পরিবেশন করছে।

তবে, কফির এই বিস্তার শুধু ক্যাফের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশে কফির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে দেশে ২৬৪ টন কফি আমদানি হলেও ২০২৫ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৪৫ টনে। অর্থাৎ এক যুগের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে প্রায় ছয় গুণ। বর্তমানে প্রায় ৪০টি দেশ থেকে কফি এলেও আমদানির বড় অংশ আসে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল ও ভিয়েতনাম থেকে।

চাহিদার এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২১-২০২৫ মেয়াদে সরকার ‘কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্প নেয়। প্রকল্পটির আওতায় কফি ও কাজুবাদামের উৎপাদন ৫০ শতাংশ বাড়ানোর পাশাপাশি আবাদি এলাকা ২ হাজার থেকে ৬ হাজার হেক্টরে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২১ সালে ১২০ হেক্টর জমিতে ৩৫ টন প্রক্রিয়াজাত গুঁড়া কফি উৎপাদিত হলেও ২০২৫ সালে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৯৫ টনে।

পাহাড়ে বাড়ছে কফির চাষ

দেশের পার্বত্য এলাকাগুলোতে কফি চাষের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। বান্দরবানেই এর বড় অংশের চাষ হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেলাটিতে ৪৩৬ হেক্টর জমিতে ৪১ টন কফি উৎপাদন হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবাদি জমি বেড়ে ৪৯৩ দশমিক ৬১ হেক্টরে পৌঁছালে উৎপাদন দাঁড়ায় ৫৪ দশমিক ৭৯ টনে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৪৪ হেক্টর জমিতে চাষ করে কাঁচা কফি চেরির উৎপাদন হয় ১২২ দশমিক ৬ টন।

পাশের খাগড়াছড়িতেও ১৭৯ হেক্টর জমিতে কফি চাষ হচ্ছে। সেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে ১ হাজার ৯৪টি কফি বাগান।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের কফি উৎপাদন ১ হাজার ৫০০ টনে উন্নীত করতে চায়। এই উৎপাদনের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। পাশাপাশি দেশের কফির জন্য ১০০ কোটি ডলারের রপ্তানি বাজার তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।

বদলে যাচ্ছে আড্ডার ধরন

বাংলাদেশে চায়ের সংস্কৃতি এতটাই গভীর যে কফির বিস্তারকে চায়ের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ কম, বরং দুটির ব্যবহার ও ভোক্তা শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। রাস্তার পাশের দোকানে ১০ থেকে ২০ টাকার চা যেমন শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে অফিসফেরত মানুষের আড্ডার অংশ, তেমনি কয়েকশ টাকা দিয়ে কফি খাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে শহরের মধ্যবিত্ত ও তরুণদের একটি অংশের মধ্যে।

একসময় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সবচেয়ে পরিচিত জায়গা ছিল পাড়ার চায়ের দোকান। সামনে ছোট টেবিল, হাতে কাচের কাপ, সঙ্গে বিস্কুট— সেখানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা। এখন সেই আড্ডার আরেকটি সংস্করণ তৈরি হয়েছে। এসি ক্যাফে, নরম আলো, ওয়াই-ফাই, ল্যাপটপ আর কফির মগ।

সেখানে হয়তো একটি কফির দাম একটি চায়ের কাপের চেয়ে ১০-২০ গুণ বেশি। তবু মানুষ যাচ্ছেন। কারণ সেখানে শুধু কফি কেনা হচ্ছে না, কেনা হচ্ছে বসার জায়গা, সময় আর একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ।

ঢাকার কফির জগতে নর্থ অ্যান্ড, গ্লোরিয়া জিনস, আরাবিকা, তাবাক, দ্য কফি বিন অ্যান্ড টি লিফের মতো প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জাভা হাউস ও উদয় কফির মতো প্রতিষ্ঠানও নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। ফলে কফির বাজার কেবল বিদেশি ব্র্যান্ডনির্ভর থাকছে না, দেশীয় রোস্টার ও উদ্যোক্তারাও এতে যুক্ত হচ্ছেন।

চায়ের দেশ বাংলাদেশে তাই কফির গল্পটা আসলে চা–কে সরিয়ে দেওয়ার গল্প নয়, বরং পুরোনো অভ্যাসের পাশে নতুন একটি অভ্যাসের জন্ম নেওয়ার গল্প।

পাড়ার চায়ের দোকানে আড্ডা যেমন থাকবে, তেমনি বিকেল নামলে কোনো এক ক্যাফেতে বন্ধুর সঙ্গে ৩০০ টাকার কফি হাতে বসে থাকবেন আরেকজন। দুই কাপের দাম আলাদা। পরিবেশও আলাদা। কিন্তু দুটির উদ্দেশ্য প্রায় একই— কিছুটা সময় কাটানো, কিছু কথা বলা এবং ব্যস্ত জীবনের ভেতর একটু বিরতি নেওয়া। চায়ের দেশে সেই বিরতির স্বাদ এখন অনেকের কাছে কফির কাপেও মিলছে।

aliul / aliul

কেরানীগঞ্জ কারাগারে অসুস্থ হাজতির ঢামেকে মৃত্যু

মালিবাগ-খিলগাঁওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-ড্রেন দ্রুত সংস্কারের নির্দেশ

মিরপুরে উচ্ছেদে ভাঙচুর-আগুন : চার মামলায় আসামি ১০০০

কমেছে বৃষ্টির প্রবণতা, টানা শুষ্ক আবহাওয়ার আভাস

ডিসেম্বর বিজয়ের মাস, কোনো অপশক্তি অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারবে না

চায়ের দেশে কফির কাপে বদলে যাচ্ছে আড্ডা

কনটেইনার ট্রেনের চাকা লাইনচ্যুত, ঢাকায় ট্রেনের লম্বা সারি

যৌথ অভিযানের আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিদায় নেবে মৌসুমি বায়ু, শেষভাগে বৃষ্টি ও লঘুচাপের আভাস

ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৪৩৯, মামলা ৩১

ফেনীর উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

এআই, সেমিকন্ডাক্টর ও রোবটিক্সে গবেষণায় তরুণদের নীতিসহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী: জহির উদ্দিন স্বপন

প্রবীণদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে সরকার