আধুনিকতার ছোঁয়ায় লাটিমের ঘূর্ণিপাক এখন শুধুই স্মৃতি
গ্রামবাংলার এক সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা লাটিম। তখন গ্রামের শিশু-কিশোররা সকাল-বিকেল খেলার মাঠে, মেঠোপথে, বাড়ির আঙ্গিনায়, উঠানে কিংবা বাড়ির বারান্দায় মনের আনন্দে দড়ি বা লেতি পেঁচিয়ে লাটিম ঘোরাতে দুরন্তপনায় মেতে থাকাতো। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় এক সময়ে শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে থাকা গ্রামীণ ঐতিহ্যের সেই লাটিম খেলা আজ শুধুই একটুকরো স্মৃতি।
বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশগুলোর অন্যতম একটি গ্রামীণ খেলা লাটিম। নব্বই দশকের জনপ্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি খেলা লাটিম। তখন গ্রাম কিংবা শহর সব জায়গায় প্রচলন ছিল এই খেলার। 'এমন মার দেব যে, লাটিমের মতো ভোঁ ভোঁ করে ঘুরবি।' গ্রমের মানুষ এখনও ছোট ছেলেমেয়েরা বেশি বিরক্ত করলে রেগে গিয়ে এ কথা বলে থাকেন। একসময়ের গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী লাটিম নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক গান, কবিতা। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ লাটিম ঘুরানো এক বালকের মনের আনন্দ ও নির্মোহ রূপটি ফুটিয়ে তুলে লিখেছেন- "বলিতে কি পারো? লাটিম ঘুরায়ে খুশি যে- বালক; আজ ভোরে- কোনও স্পৃহা নাই তার কেন লাল লাটিমের তরে-"। তেমনি প্রখ্যাত কবি ও ছড়াকার আহসান হাবীব তাঁর একটি জনপ্রিয় ছন্দোবদ্ধ ছড়ায় গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন শব্দের সাথে লাটিমের ঘূর্ণনকে চমৎকারভাবে তুলে ধরে লিখেছেন- "ঝাউয়ের শাখায় শন শন শন। মাটিতে লাটিম বন বন বন। বাদলার নদী থৈ থৈ থৈ।" এছাড়াও বর্তমান প্রজন্মের কাছে শৈশবের লাটিম খেলার স্মৃতি নিয়ে সাইফ জোয়ানের জনপ্রিয় গান- "আহারে শৈশব" গানটির শুরুতেই গ্রামীণ লাটিম খেলার নস্টালজিয়া ফুটিয়ে তুলেছেন- "লাটিম খেলা আর ঘুড়ি ওড়ানো, আম কুড়ানো আর পাতা পোড়ানো, ছোট্টবেলার সেই বন্ধুরা কই, কেন আমি আর সেই আমি নই..."। কিন্তু বর্তমান আধুনিক যুগের কম্পিউটার গেমস, ভিডিও গেমসসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে ব্যস্ত থাকে বর্তমান প্রজম্মের ছেলে-মেয়েরা আর এসব খেলার ভিড়ে হারিয়েগেছে লাটিম খেলা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মধ্যবয়সী কয়েকজন পাকা লাটিম খেলোয়াড়ের সাথে কথা বললে তারা সকালের সময়কে বলেন, একসময়ে আমাদের এলাকার গ্রামগুলোতে লাটিম খেলা ছিল শিশুদের সবচেয়ে প্রিয় খেলা। তখন স্কুলের টিফিন কিংবা ছুটির ঘণ্টা বাজতেই বই-খাতা রেখে ছুটে যেতাম মাঠে। কখনো প্রতিযোগিতা আবার কখনো আনন্দের খেলায় মেতে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ঈদ কিংবা গ্রামীণ মেলায় নতুন লাটিম কেনা ছিল শিশুদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আনন্দ। এখন সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। গ্রামের মেলায় লাটিমের দোকান আগের মতো দেখা যায় না। বর্তমান নতুন প্রজন্মের অনেক শিশুই জানে না লাটিম কীভাবে ঘোরাতে হয়।
তারা ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমাদের ছোটবেলায় বিকেল মানেই ছিল মাঠ। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় হাতে থাকতো লাটিম আর সুতা (নেতি)। কে কত সুন্দর ঘুরাতে পারে, তা নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে কত প্রতিযোগিতা হতো। লাটিম খেলা চাইলে একা যেমন খেলা যায় তেমনি দলগতভাবেও খেলা যায়। লাটিম খেলার শুরুতে সমতল ভূমিতে একটি বৃত্ত আঁকা হতো। এই বৃত্ত আঁকারও নিদৃষ্ট একটা নিয়ম আছে। প্রথমে একটি লাটিমের সঙ্গে লেপতির এক মাথা বাধা হয়। এরপর একজন লেতির অপর মাথা মাটিতে এক স্থানে চেপে ধরে। আরেকজন খেলোয়াড় লেপতি টানটান করে লাটিমটি মাটিস্পর্শ করে ঘুরিয়ে আনলেই লাটিমের সোঁচালো আলে দাগ বসে যায়। এতেই বৃত্ত তৈরি হয়। এরপর শুরু হয় খেলা। একেকজন খেলোয়াড় লাটিম বৃত্তের মধ্যে ঘোরানো শুরু করে। এরপর যার লাটিমটি ঘুরতে ঘুরতে বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সবচেয়ে বেশি দূরে যায় সে প্রথম, তারপর যার লাটিমটি থাকে সে হয় দ্বিতীয়। এমনভাবে তৃতীয়, চতুর্থও নির্ধারণ হয়। এরপর চতুর্থ অবস্থানের খেলোয়াড় বৃত্তে লাটিম ঘুরিয়ে দেয়, তৃতীয় অবস্থানের জন তার লাটিম দিয়ে ঘোরানো লাটিমকে আঘাত করে বৃত্তের বাইরে আনতে পারলে লাটিমটি তার হয়ে যায়। এরপরে তৃতীয় অবস্থানের খেলোয়াড় তার লাটিম ঘুরালে, দ্বিতীয় অবস্থানের খেলোয়াড় একইভাবে ওই লাটিমকে তার লাটিম দিয়ে আঘাত করে বৃত্তের বাইরে নিতে পারলে সেটির মালিক হয়। এরপর দ্বিতীয় খেলোয়াড়ের লাটিমকে প্রথম অবস্থানের খেলোয়াড় আঘাত করে বাইরে নিতে পারলে সেটির মালিক সে হয়। এভাবে চলতে থাকে খেলা। তবে এ খেলায় লাটিমের আঘাতে অন্যের লাটিম ভেঙেও যায় অনেক সময়। আর সেটা করতে পারলে খেলোয়াড়রা অনেক বাহ্বা পায়। এজন্য লাটিমের আল সোঁচালো করতে পছন্দ করে খেলোয়াড়রা। এখন দিন বদলেছে। বাজারে লাটিমের বিক্রিও তেমন নেই। ঘরবন্দি জীবনে স্মার্টফোন শিশু-কিশোরদের কাছে সব। তবে এখনো গ্রামাঞ্চলে গেলে প্রায় সময় দেখা যায় ছোটদের মেতে উঠতে লাটিম খেলায়। এ যেন অন্যরকম আনন্দ।
কথা হয় বাউসী অর্দ্ধচন্দ্র উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুল মোমেন বিশ্বাসের সাথে তিনি লাটিম খেলার ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খেলা লাটিম। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুসারে, স্পিনিং টপের মতো খেলার উৎপত্তি কমপক্ষে চার হাজার বছর আগে। মেসোপটেমিয়া, প্রাচীন মিশর এবং সিন্ধু উপত্যকায় মাটির তৈরি লাটিম পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ও ভারতে কাঠের লাটিম দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে খেলার প্রচলন শত শত বছর ধরে চলে আসছে। সাধারণত পেয়ারা বা গাব গাছের নরম কাঠ দিয়ে তৈরি হয় লাটিম। দড়ি তৈরিতে আগে পাটের সুতা ব্যবহার হতো, এখন বাণিজ্যিক সুতার ব্যবহার চলছে। গ্রামীণ জীবনে এটি শুধু খেলা নয়, বরং ধৈর্য, প্রতিযোগিতা, হার-জিত মেনে নেওয়া এবং সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলার মাধ্যম ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ইউটিউব, ফেসবুক ও অনলাইন গেমের আকর্ষণে সারাদেশের মত বারহাট্টার জনপদ থেকেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী লাটিম খেলা।
এমএসএম / এমএসএম
শালিখায় শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি, প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত ভাস্কররা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন,পটিয়ার ধলঘাট স্কুল এন্ড কলেজে দিনে চুরি
মোরেলগঞ্জে নসিমন-মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ২
পাটগ্ৰাম সীমান্তে বিজিবির বিশেষ অভিযানে ভারতীয় গরু আটক
মুকসুদপুর প্রেসক্লাবের সাংবাদিকের পিতার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল
আধুনিকতার ছোঁয়ায় লাটিমের ঘূর্ণিপাক এখন শুধুই স্মৃতি
ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে নরসিংদীতে, ভেলানগরে জরুরি মশকনিধনের দাবি
মতলবে বিশেষ অভিযানে মাদক কারবারিসহ আটক ২৪
বাজারে আগুন, সংসারে চাপ' কৃষক থেকে মধ্যবিত্ত, বিপাকে সাধারণ মানুষ
১৩ বছরে দুই বিয়ে! কালিহাতীতে কিশোরীকে ঘিরে চাঞ্চল্য, উঠছে নানা প্রশ্ন
কৃষক বাবার ঘর থেকে প্রশাসন ক্যাডারে রায়গঞ্জের রনি
রায়গঞ্জে পুকুর থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার