ঢাকা মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬

যে অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হলো ‘আনসিন বাংলাদেশ’


নিজস্ব প্রতিবেদক photo নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৬-১০-২০২৬ দুপুর ১:৩৩

নতুন কোনো জেলা ভ্রমণ থেকে ফিরে প্রতিবার হাতে-কলমে মানচিত্র এঁকে স্মৃতির হিসেব রাখতেন তরুণ ভ্রমণপ্রেমী মো. সাব্বির হোসাইন (২৭)। কিন্তু বারবার নতুন জেলা ঘুরে এসে আবার নতুন করে মানচিত্র আঁকা ও হিসাব মেলানো ছিল বেশ সময়সাপেক্ষ। নিজের সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও তাগিদ থেকেই তিনি তৈরি করেছেন এক অভিনব ওয়েব অ্যাপ, ‘আনসিন বাংলাদেশ’। এখন আর খাতায় আঁকাআঁকির ঝক্কি নেই, মাত্র কয়েকটি ক্লিকেই ফুটে উঠছে নিজের ভ্রমণ করা জেলাগুলোর রঙিন মানচিত্র।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সাবেক শিক্ষার্থী সাব্বিরের তৈরি এই ডিজিটাল ভ্রমণ মানচিত্র এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা মানুষের ওয়াল জুড়ে। ভ্রমণপিপাসুরা নিজেদের দেখা জেলাগুলো চিহ্নিত করে, নাম ও ছবি যুক্ত করে রঙিন সেই মানচিত্র শেয়ার করছেন ফেসবুকে।

ব্যক্তিগত প্রয়োজন থেকে সর্বজনীন উদ্যোগ

নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার সন্তান সাব্বির বর্তমানে পরিবারসহ থাকেন চট্টগ্রাম নগরের গরিবুল্লাহ শাহ মাজার এলাকায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করা এই তরুণ পেশায় একজন অ্যাপ ডিজাইনার। কাজের পাশাপাশি তার প্রধান পছন্দ নতুন নতুন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো।

আগে ভ্রমণের হিসেব রাখতে গিয়ে যে শ্রম ও সময় যেত, সেখান থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে একটি স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল মাধ্যম তৈরির ভাবনা আসে সাব্বিরের মাথায়। শুরুতে কেবল নিজের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অ্যাপটি বানালেও পরে তিনি উপলব্ধি করেন, একই সমস্যায় পড়েন আরও অনেক ভ্রমণপ্রেমী। সেই চিন্তা থেকেই ওয়েব অ্যাপটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন।

জানতে চাইলে মো. সাব্বির হোসাইন বলেন, ‘নতুন জেলা ভ্রমণের পর ম্যানুয়ালি ম্যাপ তৈরি করতে হতো। সেখান থেকেই ভাবলাম, এআই ব্যবহার করে যদি এমন কিছু করা যায় যেখানে জেলা সিলেক্ট করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ম্যাপ তৈরি হবে। পরে মনে হলো, আমার মতো অন্য ভ্রমণপ্রেমীদেরও এটি কাজে লাগতে পারে।’

ডিজিটাল ক্যানভাসে ‘আমার বাংলাদেশ’

বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে পাহাড়, সমুদ্র, নদী, হাওর কিংবা চিরসবুজ প্রান্তরের প্রতিটি জেলাই যেন একেকটি আলাদা গল্পের জন্ম দেয়। কিন্তু ৬৪ জেলার মধ্যে কতটি ঘুরে দেখা হলো, তা মনে রাখা অনেকের জন্যই কঠিন।

‘আনসিন বাংলাদেশ’ ওয়েব অ্যাপটিতে প্রবেশ করে ‘আপনার কোথায় ঘোরা হয়েছে’ অপশনে গেলেই শুরু করা যায় সেই হিসাব। দেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলার তালিকা থেকে বেছে নেওয়া, সরাসরি মানচিত্রে ক্লিক করা কিংবা সার্চ বারে জেলার নাম লিখে খুঁজে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ধরা যাক, ৬৪ জেলার মধ্যে কেউ ১৫টি জেলা ভ্রমণ করেছেন; জেলা নির্বাচন করার সঙ্গে সঙ্গেই স্ক্রিনে ভেসে উঠবে ‘১৫/৬৪’। একসঙ্গে সব জেলা নির্বাচনের জন্য রয়েছে ‘সব বাছাই করুন’ এবং পূর্বের হিসাব মুছে ফেলার জন্য ‘সব মুছুন’ সুবিধা।

তবে অ্যাপটির কাজ কেবল সংখ্যার হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো নির্দিষ্ট জেলা নির্বাচন করলে সেই জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, দর্শনীয় স্থান, বিখ্যাত খাবার এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্যের তথ্য পাওয়া যায়। যেকোনো দর্শনীয় স্থানে ক্লিক করলে সরাসরি গুগল ম্যাপের লোকেশনসহ বিস্তারিত বিবরণও মেলে। বাংলা ও ইংরেজি, দুই ভাষাতেই তথ্য দেখার ব্যবস্থা থাকায় দেশি-বিদেশি সব ধরনের পর্যটক এটি ব্যবহার করতে পারছেন।

মানচিত্রটি নিজের মতো সাজাতে রয়েছে ৫টি বিশেষ থিম। পছন্দমতো থিম বেছে নিয়ে নাম ও ছবি যোগ করা যায় এবং নাম না দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেখা থাকবে আমার বাংলাদেশ। চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার পর পিএনজি, জেপিজি কিংবা পিডিএফ ফরম্যাটে মানচিত্রটি ডাউনলোড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা যায়।

এআই যখন স্মার্ট ট্রিপ প্ল্যানার

শুধু অতীতের ভ্রমণ নিবন্ধিত করতেই নয়, ভবিষ্যৎ ভ্রমণের সঠিক দিকনির্দেশক হিসেবেও কাজ করে এই অ্যাপ। ‘ট্রিপ প্ল্যান’ অপশনে যে জেলাগুলো ঘুরতে চান, তা নির্বাচন করলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক মিনিটের মধ্যে তৈরি করে দেয় একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণসূচি।

একসঙ্গে চার-পাঁচটি জেলা নির্বাচন করলেও কোন গন্তব্যে আগে যাওয়া সুবিধাজনক, এরপর কোথায় যাওয়া ভালো, রাতে থাকার হোটেল, গুগল ম্যাপের লোকেশন এবং সম্ভাব্য খরচের বিবরণসহ বিস্তারিত ছক সাজিয়ে দেয় অ্যাপের এআই ট্রিপ প্ল্যানার।

ক্লড কোড ব্যবহারের পাশাপাশি নিজস্ব ডিজাইন দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ দিনের প্রচেষ্টায় পুরো ওয়েব অ্যাপটি দাঁড় করিয়েছেন সাব্বির।

বিজ্ঞাপনমুক্ত সেবা ও জাতীয় পর্যটনের স্বপ্ন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বস্তরের ভ্রমণপিপাসু ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বিপুল সাড়া পেলেও অ্যাপটি থেকে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক লাভ বা বিজ্ঞাপন নেওয়ার পরিকল্পনা নেই তার।

সাব্বির বলেন, ‘অনেকে গুগলের অ্যাড দিয়ে আয় করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু ব্যবহারকারীরা যেন কোনো ধরনের বিরক্তি ছাড়া সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন অভিজ্ঞতা পান, সেটাই আমার মূল অগ্রাধিকার। আমি এখানে কোনো বিজ্ঞাপন দেবো না।’

ভবিষ্যৎ ভাবনা সম্পর্কে সাব্বির জানান, এই উদ্ভাবনী উদ্যোগকে তিনি দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নের কাজে লাগাতে চান। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড বা পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এটি সমন্বিত করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে থাকা সৌন্দর্য তুলে ধরা আরও সহজ ও কার্যকর হবে।

চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও নিয়মিত ভ্রমণকারী মোহাম্মদ আহমেদ মোস্তফা বলেন, ‘পড়ালেখা বা কাজের ফাঁকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাওয়া হয়। ইতোমধ্যে প্রায় ৫২টি জেলায় ঘোরার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত ঠিকঠাক হিসাব রাখা হতো না কতগুলো জেলায় যাওয়া হলো বা কোন জেলাটা বাদ পড়ল। ফেসবুকে ‘আনসিন বাংলাদেশ’ অ্যাপটি দেখে খুব সহজেই নিজের দেখা জেলাগুলো চিহ্নিত করে ফেললাম। এক ক্লিকেই নিজের নামের রঙিন মানচিত্র ডাউনলোড করে শেয়ার করার অনুভূতিটা সত্যিই অন্যরকম।

দেশের ৪৪টিরও বেশি জেলা ভ্রমণ করা আরেক ভ্রমণপ্রেমী ও সংগঠক সাফায়েত রায়হান শিহাব বলেন, ‘আমি নিজেও এখন পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৪টি জেলা ঘুরে দেখেছি। নিজের ভ্রমণ করা জেলাগুলোর হিসাব রাখা এবং এখনো যাওয়া হয়নি এমন জেলাগুলো চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এই ওয়েবসাইটটি বেশ কার্যকর মনে করি। এমন একটি প্ল্যাটফর্ম সেটি সুন্দরভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের সুযোগ করে দিচ্ছে।’

তিনি যোগ করেন, ‘ভালো লাগার বিষয় হলো, নিজের ভ্রমণের একটি সুন্দর ভিজ্যুয়াল তৈরি করে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা যায়। যা গত দুদিন ধরে ভ্রমণপ্রেমী সহ সবার মনে আগ্রহ বাড়িয়ে তুলেছে। এটি শুধু ভ্রমণ করা জেলার হিসাবের প্ল্যাটফর্ম না থেকে সব ভ্রমণকারীর জন্যই একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রাভেল প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যারা নতুন করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ শুরু করতে চান তাদের জন্য একটি চমৎকার মাধ্যম হতে পারে।’

তরুণ এই প্রযুক্তি উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দেশের প্রখ্যাত পর্বতারোহী ডা. বাবর আলী। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিশ্বজয়ের অভিযাত্রার আগে নিজের ৬৪ জেলাকে জানা এবং ভালোবাসাই প্রতিটি ভ্রমণপিপাসুর প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত। সাব্বিরের তৈরি ‘আনসিন বাংলাদেশ’ অ্যাপটি তরুণদের মাঝে দেশ ঘুরে দেখার নতুন এক উদ্দীপনা ছড়িয়ে দিয়েছে। ডিজিটাল ক্যানভাসে স্মৃতি ধরে রাখা এবং এআই-এর সহায়তায় নিখুঁত ট্রিপ প্ল্যান করার এই সুবিধা দেশীয় পর্যটনকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক বোর্ড চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ মাহবুব মোরশেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সাব্বিরের উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তিনি নিজের মেধা ও দায়িত্ব দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। বর্তমান সময়ে তথ্যই হচ্ছে মূল শক্তি। ভ্রমণসংক্রান্ত প্ল্যাটফর্মে যখন যাতায়াত, আবাসন, সম্ভাব্য খরচ, ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া ও স্থানীয় সংস্কৃতির মতো খুঁটিনাটি তথ্য বিস্তারিতভাবে থাকে, তখন ভ্রমণপিপাসুদের পরিকল্পনা করা অনেক সহজ হয়ে যায়। শিক্ষক হিসেবে ওর এই উদ্ভাবনী সফলতার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও বহুল প্রচার কামনা করছি, যেন সাধারণ মানুষ ও পর্যটকেরা এটি থেকে পূর্ণ সুবিধা পেতে পারেন।’

এবিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক (বিপণন, পরিকল্পনা ও জনসংযোগ) আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘তরুণদের এমন প্রযুক্তিভিত্তিক পর্যটন উদ্যোগকে আমরা সবসময় স্বাগত জানাই। উদ্ভাবক যদি আগ্রহ প্রকাশ করে আমাদের কাছে আসেন এবং সুযোগ থাকে, তবে অবশ্যই তাকে আমাদের সঙ্গে ‘অনবোর্ডিং’ (একত্রে যুক্ত) করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য সঠিক তথ্য সরবরাহ কিংবা কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন হলে ট্যুরিজম বোর্ড সাধ্যমতো তা করবে। তরুণদের এ ধরনের নতুন নতুন উদ্যোগকে উৎসাহিত করতেই এ বছর থেকে পর্যটন পুরস্কার দেওয়ার রীতি চালু করা হয়েছে। পর্যটন খাতের অন্য অংশীজনদের পাশাপাশি এ ধরনের উদীয়মান তরুণদেরও আমাদের কার্যক্রমে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।’

aliul / aliul

মেট্রোরেল লাইনে কুকুর, ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন

রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসককে মারধর গ্রহণযোগ্য নয়

ধানমন্ডি লেকের পাশে হবে নজরুল সরোবর : প্রশাসক

ইজতেমার সময় গাজীপুরের স্থানীয় নির্বাচন নয়, সিইসির কাছে আবেদন তাবলীগের

রাজধানীতে এসি বিস্ফোরণে মেকানিকের মৃত্যু

বাংলাদেশকে একটি মানবিক দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই : প্রধানমন্ত্রী

যে অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হলো ‘আনসিন বাংলাদেশ’

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আরও জোরালো আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার আহ্বান

বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নিতে মন্টেনিগ্রোকে অনুরোধ

ধানমন্ডি লেকের উন্নয়নে দুটি প্রকল্প, হবে আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র

‘বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার’ নীতির অর্থ বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়, সার্বভৌমত্ব রক্ষা

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সাময়িকভাবে শ্রম ভিসা বন্ধ করল লাওস

নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া না গেলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে