ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

গরিবের এক বছরের ‘নিঃশ্বাস’ আর ধনকুবেরের মাত্র একদিনের বিলাস!


আন্তর্জাতিক ডেস্ক  photo আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৭-১০-২০২৬ দুপুর ১:৫৪

বিশ্বের ধনকুবেররা পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষের (দরিদ্র) চেয়েও বেশি কার্বন নিঃসরণ করে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফাম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। তাদের বার্ষিক গড় আয় ৪ লাখ ৪২ হাজার ডলার। এই জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত কার্বন নিঃসরণ বিশ্বের দরিদ্রতম ৩৫০ কোটি মানুষের মোট নিঃসরণের চেয়েও বেশি।

এতে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ০.১ শতাংশ মানুষের একজন এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের একজন গড় মানুষের তুলনায় ৪৮ গুণ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) নিঃসরণ করেন।

অক্সফাম আমেরিকার জলবায়ু ন্যায়বিচার বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা র‍্যাচেল কার্লে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অতি ধনীরা কীভাবে অসমানুপাতিক হারে জলবায়ু সংকট সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছেন, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। একই সঙ্গে তারা জলবায়ু সংকটের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের অনেকটাই সুরক্ষিত রাখতে পারেন। এমনকি, যে সংকট তৈরিতে তাদের ভূমিকা রয়েছে, সেই সংকটের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ থেকেও তারা মুনাফা অর্জন করছেন।”

আয়ভিত্তিক কার্বন নিঃসরণের হিসাব করতে অক্সফাম জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণের বিভিন্ন মডেল এবং স্টকহোম এনভায়রনমেন্ট ইনস্টিটিউটের তৈরি ভোগভিত্তিক কার্বন নিঃসরণসংক্রান্ত তথ্যভান্ডার ব্যবহার করেছে।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি মাসে জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে সীমিত রাখতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ ১৮ শতাংশ কমানো প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের একটি বড় অংশের জন্য দায়ী ধনী দেশগুলো। তবে শুধু দেশভেদেই নয়, একই দেশের ধনী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যেও কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে।

এর একটি উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্র। চীনের পর দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ। তবে দেশটির সব মানুষ সমান পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করেন না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী ০.১ শতাংশ মানুষের একজন মাত্র ১১৮.৩ দিনে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করেন, তা দেশটির দরিদ্রতম অর্ধেক মানুষের গত ৩০ বছরের মোট নিঃসরণের চেয়েও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বার্ষিক গড় আয় ২৫ হাজার ৬০০ ডলার। অন্যদিকে, দেশটির সবচেয়ে ধনী ০.১ শতাংশ মানুষের বার্ষিক গড় আয় প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

কার্বন নিঃসরণের অন্যতম উৎস হলো ব্যক্তিগত জেটবিমান বা প্রাইভেট জেট। ২০২৫ সালে এসব বিমানের কারণে ১ কোটি ৬০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসৃত হয়েছে। এই পরিমাণ নিঃসরণ ২০ লাখেরও বেশি বাড়ির এক বছরের জ্বালানি ব্যবহারের সমপরিমাণ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের সব ব্যক্তিগত জেটবিমান মাত্র দুই সেকেন্ডে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে, তা বিশ্বের দরিদ্রতম ৫০ শতাংশ মানুষের একজনের এক বছরের কার্বন নিঃসরণের চেয়েও বেশি। এই জনগোষ্ঠীর একজনের বার্ষিক গড় আয় মাত্র ১ হাজার ৫০০ ডলার।

বিশ্বে ব্যক্তিগত জেটবিমানের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। বিশ্বের মোট ব্যক্তিগত জেটবিমানের ৬৮ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড্ডয়ন করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত জেটবিমানগুলো মোট ৬৫ লাখ ঘণ্টারও বেশি সময় আকাশে উড়েছে।

অক্সফামের উপদেষ্টা র‍্যাচেল কার্লে বলেন, ‘অতি ধনীদের জীবনযাপন ও ভোগের ধরন সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। অতি ধনীরা দূষণকারী শিল্প ও প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে বেশি জড়িত।’

প্রতিবেদনে এমন ২১৭টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেগুলো জলবায়ু বিপর্যয় সৃষ্টি করে, এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি থেকে অথবা বিপর্যয়ের পর পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে ১৮০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে। একই সময়ে তারা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ বিতরণ করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতি ধনীদের বিপুল কার্বন নিঃসরণ জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে এবং এর ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতিও বাড়ছে।

গবেষকরা বিভিন্ন আয়গোষ্ঠীর কার্বন নিঃসরণের প্রভাব নির্ধারণ করতে একাধিক মডেল ব্যবহার করেছেন। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯০ সাল থেকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ২০ শতাংশের জন্য দায়ী বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষ। বিশ্বের মোট জনসংখ্যায় তাদের অংশের তুলনায় এই অবদান ২০ গুণ বেশি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের কার্বন নিঃসরণ একজন গড় মানুষের তুলনায় চরম তাপপ্রবাহের মতো ঘটনা সৃষ্টিতে ৩৪ গুণ বেশি অবদান রেখেছে।

এ ছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের এক বছরের কার্বন নিঃসরণের কারণে ভবিষ্যতে আনুমানিক ১৯ লাখ অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এসব মৃত্যুর অন্যতম কারণ হবে তীব্র তাপপ্রবাহ।

অক্সফামের প্রতিবেদনে একটি বড় বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। জলবায়ু সংকট সৃষ্টিতে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তারাই আবার এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের সবচেয়ে ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখতে পারেন।

অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের মানুষের জলবায়ুজনিত দুর্যোগ ও চরম আবহাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। দুর্যোগের পর নিজেদের জীবন ও সম্পদ পুনর্গঠন করার মতো পর্যাপ্ত অর্থও তাদের অনেকের হাতে থাকে না।

এর বিপরীতে, ধনী ব্যক্তিরা তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় বসবাস করতে পারেন এবং দুর্যোগের সময় নিজেদের সুরক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে পারেন। ব্যক্তিগত অগ্নিনির্বাপণকর্মী নিয়োগ, জেনারেটরের ব্যবস্থা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য তাদের রয়েছে।

ফলে জলবায়ু সংকট সৃষ্টিতে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তারা এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের অনেকটাই রক্ষা করতে পারেন। অথচ এই সংকটের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী দরিদ্র মানুষদেরই প্রায়ই সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হয়।

জলবায়ু সংকটের বোঝা আরও ন্যায্যভাবে বণ্টন করতে অতি ধনীদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে অক্সফাম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত জেটবিমানের ব্যবহারসহ উচ্চমাত্রার কার্বন নিঃসরণ ঘটায়—এমন বিলাসবহুল পণ্য ও কর্মকাণ্ডের ওপর কর আরোপ করা যেতে পারে। এতে এসব পণ্যের অতিরিক্ত ব্যবহার নিরুৎসাহিত হবে এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক মুনাফার ওপর বিশেষ কর আরোপেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।

অক্সফামের মতে, এসব কর থেকে সংগৃহীত অর্থ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপযোগী অবকাঠামো ও ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

র‍্যাচেল কার্লে বলেন, ‘আমরা আশা করি, মানুষ বুঝতে পারবেন যে বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি পৃথিবী ও এর মানুষের সুরক্ষায় কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। দূষণকারীদের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির দায় নিতে হবে।’

aliul / aliul

গরিবের এক বছরের ‘নিঃশ্বাস’ আর ধনকুবেরের মাত্র একদিনের বিলাস!

অনুমতি দিলো পার্লামেন্ট, সৌদিতে সামরিক সহায়তা পাঠাচ্ছে মিসর

ব্রাজিলের নির্বাচন ‘কারচুপিপূর্ণ’, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ : ট্রাম্প

ইসরায়েলে নির্বাচন : রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে নেতানিয়াহু

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম

ফ্রান্স থেকে স্পেন : ইউরোপজুড়ে কেন আন্দোলনে নামছে জেন-জি?

মালয়েশিয়ার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ৪ বাংলাদেশি আটক

সানায় হুথিদের ২ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করল সৌদি জোট

মক্কা জোট : সৌদি, তুরস্ক আর পাকিস্তানের সঙ্গে বৈঠকে বসছে ইরান

ইরানে ফের অভিযানে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র, শুধু ট্রাম্পের অনুমতির অপেক্ষা

ইসরায়েলে মঙ্গলবার নির্বাচন, নির্ধারণ হবে নেতানিয়াহুর ভাগ্য

আবারও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হলেন কট্টর ফিলিস্তিনপন্থি লুলা

ইরানে নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল