জেলা প্রশাসক কি কোনো রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত প্রতিনিধি, নাকি জনগণের প্রশাসক?
একটি জেলার কয়েকটি ইউনিয়নকে নিয়ে নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। বিষয়টি নিছক কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অভিলাষের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, উন্নয়ন, নাগরিক সেবা এবং স্থানীয় জনগণের ভবিষ্যৎ।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অথচ অভিযোগ উঠেছে, সেই চিঠি প্রায় এক মাস ধরে গোপন করে রাখা হয়েছে। বিষয়টি সামনে আসার পর জেলা প্রশাসকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় ওলামা ঐক্য পরিষদসহ অনেকেই। সংগঠনটি এ ঘটনায় জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, একটি এলাকার প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পরও জেলা প্রশাসক কেন তা সংশ্লিষ্ট মহল কিংবা জনগণের সামনে আনলেন না? তিনি কি বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, নাকি কোনো বিশেষ মহলকে খুশি রাখতে গিয়ে দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতার পথ এড়িয়ে গেছেন?
জেলা প্রশাসক কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা নন। তিনি কোনো সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নন। তিনি প্রজাতন্ত্রের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তাঁর পদ, ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা এবং বেতন-ভাতা-- সবকিছুর উৎস জনগণের অর্থ। রাষ্ট্র তাঁকে নিয়োগ দিয়েছে জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে নয়।
তাহলে একজন জেলা প্রশাসক কীভাবে ভুলে যান, তাঁর প্রথম এবং প্রধান দায়বদ্ধতা জনগণের প্রতি?
একটি নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাব কোনো ব্যক্তির একক সম্পত্তি নয়। কোনো রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধি এ ধরনের প্রস্তাব দিতে পারেন। সেটি তাঁর রাজনৈতিক উদ্যোগ কিংবা এলাকার উন্নয়নসংক্রান্ত চিন্তার অংশ হতে পারে। কিন্তু প্রস্তাবটি একবার সরকারি প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করলে সেটি আর কেবল কোনো নেতার ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। তখন এর সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের স্বার্থ।
মন্ত্রণালয় যখন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠায়, তখন সেটি যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্ব। চিঠিতে কী নির্দেশনা রয়েছে, কত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে, কোন কোন বিষয় যাচাই করতে হবে-- এসব নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিন্তু চিঠি পাওয়ার পর সেটি দীর্ঘ সময় অগ্রসর না করা কিংবা অযৌক্তিকভাবে গোপন রাখার অভিযোগ উঠলে তার ব্যাখ্যা জেলা প্রশাসককেই দিতে হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। সরকারি প্রতিটি চিঠি জনসমক্ষে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক নয়। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কিছু গোপনীয়তা থাকতে পারে। কিন্তু জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি প্রস্তাবের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর সেটি নিয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কেন বিলম্ব হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় প্রশাসনের রয়েছে। গোপনীয়তার অজুহাতে জনস্বার্থকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ নাগরিকদের সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষিত তথ্য পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, আইনে নির্ধারিত ব্যতিক্রম সাপেক্ষে। ফলে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা প্রক্রিয়া জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত হলে সেটি সম্পর্কে নাগরিকদের জানার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ।
একজন জেলা প্রশাসককে মনে রাখতে হবে, তাঁর দায়িত্ব শুধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ পালন কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা নয়। তাঁকে একই সঙ্গে আইনের শাসন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, কোনো রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির উদ্যোগে একটি জনপদের উন্নয়নসংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও সেটির পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দেওয়ার অধিকার সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের রয়েছে। একটি উপজেলা গঠিত হলে কারা উপকৃত হবেন, প্রশাসনিক সুবিধা কতটা বাড়বে, কোন ইউনিয়নগুলো যুক্ত হবে, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা কী, এসব বিষয় যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। জনগণের মতামত ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ যেমন অনুচিত, তেমনি প্রক্রিয়াটিই আড়াল করে রাখাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
জেলা প্রশাসক যদি সত্যিই কোনো একজন নেতাকে সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে বিষয়টি এক মাস আটকে রাখেন, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, এটি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।
এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু ওলামা ঐক্য পরিষদ কিংবা নতুন উপজেলা গঠনের দাবিতে সোচ্চার ব্যক্তিদের জন্য নয়, পুরো জেলার মানুষের জানার অধিকার রয়েছে।
একজন জেলা প্রশাসকের চেয়ার কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা নয়। এটি জনগণের আস্থা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রতীক। এই চেয়ারে বসে কেউ যদি মনে করেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট রাখাই তাঁর প্রধান কাজ, তাহলে তিনি তাঁর দায়িত্বের মৌলিক জায়গাটিই ভুলে যাচ্ছেন।
জনগণের টাকায় বেতন পাওয়া একজন সরকারি কর্মকর্তার কাছে জনগণের প্রশ্নের জবাব চাওয়াটা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি নাগরিক অধিকার। আর সেই জবাব দেওয়াটাও তাঁর ব্যক্তিগত সদিচ্ছার বিষয় নয়, এটি সরকারি দায়িত্ব ও জবাবদিহির অংশ।
নতুন উপজেলা হবে কি হবে না, সেটি নির্ধারণ করবে সরকার। প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া, জনসংখ্যা, আয়তন, যোগাযোগব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত আসবে। কিন্তু একটি এলাকার মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না।
জেলা প্রশাসকের কাছে তাই দাবি, তিনি যেন অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার তথ্য প্রকাশ করেন। কোনো অনিয়ম বা ইচ্ছাকৃত গাফিলতি হয়ে থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা হোক।
কারণ, জেলা প্রশাসক কোনো রাজনৈতিক নেতার প্রশাসক নন, তিনি জেলার সব মানুষের প্রশাসক। তাঁর আনুগত্য কোনো ব্যক্তির প্রতি নয়, সংবিধান, আইন এবং প্রজাতন্ত্রের প্রতি। জনগণের স্বার্থকে পাশ কাটিয়ে কারও ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সেই আচরণের জবাবদিহি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসনের চেয়ারে বসে জনগণের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রশাসনকে জনগণের কাছেই জবাবদিহি করতে হবে।
এমএসএম / এমএসএম
টেকনাফে সিএনজি অটোরিকশাসহ সাড়ে তিন কোটি টাকার ৭০ হাজার ইয়াবা জব্দ
চাঁদপুরে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে দেশীয় অস্ত্রসহ দুইজন গ্রেপ্তার
সাভারে শ্রমিক অসন্তোষ: ২৬৪ পোশাক কারখানায় ছুটি
সাভারে শ্রমিক অসন্তোষ: ২৬৪ পোশাক কারখানায় ছুটি
সিলেটে পৃথক অভিযানে দুই আসামি গ্রেপ্তার
পত্নীতলায় জাতীয় যুব দিবস পালিত
ধামরাইয়ে বাক্প্রতিবন্ধীর বসতবাড়িতে দুর্বৃত্তদের আগুন
চন্দনাইশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি
নেত্রকোণায় সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল এর উদ্যোগে সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধন
চৌগাছায় গাছি সমাবেশ ও খেজুরের চারা বিতরণ: কৃষকদের সুবিধার্থে নির্মিত হবে মিনি কোল্ড স্টোরেজ
ধুনটে বিস্ফোরক মামলায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সজিব গ্রেপ্তার
রাজশাহীতে মানিক পশারীর জানাজা-দাফনে বাধার প্রতিবাদে মুক্তিযোদ্ধাদের মানববন্ধন