ঘুষ, দালাল ও হয়রানি: জনগণের রাষ্ট্রে জনগণই সবচেয়ে অসহায়!
রাষ্ট্রীয় সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তি এখন বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের নিত্যসঙ্গী। বাংলাদেশ সচিবালয় থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ বিভাগ, ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, থানা, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়, এসি ল্যান্ড অফিস, পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ এবং আদালত- প্রায় প্রতিটি সরকারি দপ্তরেই সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; বরং একটি গভীর ও দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট।
নির্ধারিত ফি ও নিয়ম মেনেও অনেক ক্ষেত্রে সেবা পাওয়া যায় না। ফাইল আটকে থাকে, একই কাগজ বারবার চাওয়া হয়, এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘোরানো হয়। বহু ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা বলছে, অনানুষ্ঠানিক অর্থ ছাড়া অধিকাংশ কাজই এগোয় না। ফলে সরকারি দপ্তর মানেই মানুষের কাছে ভয়, অনিশ্চয়তা, সময়ক্ষেপণ এবং আর্থিক ক্ষতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থানাকেন্দ্রিক সেবায়। নাগরিকদের বড় একটি অংশের অভিযোগ, অর্থ ছাড়া সাধারণ ডায়েরি বা মামলা গ্রহণ করা হয় না। আবার অর্থের বিনিময়ে মিথ্যা মামলা দায়ের, নিরীহ মানুষকে আসামি করা এবং দীর্ঘদিন হয়রানির ঘটনাও ঘটছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে প্রভাবশালী মহল ও অপরাধচক্র। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান থেকেই মানুষের মধ্যে ভয় ও অনাস্থা তৈরি হচ্ছে, যা একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ভূমি সংক্রান্ত দপ্তরগুলোতেও একই বাস্তবতা বিরাজ করছে। সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় ও এসি ল্যান্ড অফিসে দলিল রেজিস্ট্রেশন, নামজারি কিংবা খতিয়ান সংশোধনের মতো মৌলিক সেবাগুলো কার্যত দালালনির্ভর হয়ে পড়েছে। ঘুষ না দিলে মাসের পর মাস ফাইল পড়ে থাকার অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু কার্যকর সমাধান এখনও দৃশ্যমান নয়।
পরিবহন ও পাসপোর্ট সেবায় দালালচক্রের প্রভাব জনভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা যানবাহন সংক্রান্ত কাজে নির্ধারিত সময় ও ফি মেনেও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ নিয়মিতই শোনা যাচ্ছে।
আদালত ব্যবস্থাও এই সংকটের বাইরে নয়। বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীলতা সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে আরও সংকুচিত করছে। ফলে ন্যায়বিচার অনেকের কাছে অধিকার নয়, বরং সামর্থ্যের বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।
এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি সরকারি প্রশাসনের দুর্বলতা নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। সরকারি কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “মানুষ শুধু বাংলাদেশ সচিবালয় নয়, প্রায় সব সরকারি দপ্তরের প্রতিই ক্ষুব্ধ। আমাদের আমলাতন্ত্র এমন এক কঠিন কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, যা জনগণের বুকে পাথরের মতো চেপে বসে আছে। এখানে মানবিক দায়িত্ববোধের ঘাটতি স্পষ্ট। কর্মকর্তারা অফিসে আসেন, বসেন, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার দিকে তেমন নজর দেন না।”
তার এই বক্তব্য প্রশাসনিক স্থবিরতা ও দায়িত্ববোধের সংকটকে প্রকাশ্যে স্বীকার করার একটি বিরল দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে তিনি আমলাতন্ত্রের দায়িত্বহীনতা ও মানবিকতার অভাবের বিষয়টি স্বীকার করে সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকে যায়-এই বক্তব্যের পর বাস্তবে কী পরিবর্তন আসছে?
কারণ কেবল বক্তব্য বা আশ্বাসে মানুষের হারানো আস্থা ফিরে আসে না। প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ও কার্যকর সংস্কার। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা, দালালচক্রের শিকড় উপড়ে ফেলা এবং একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা- যেখানে সাধারণ মানুষ ভয় নয়, আস্থার সঙ্গে অভিযোগ জানাতে পারবে এবং ন্যায়বিচার পাবে।
আজ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা চায় ঘুষ ছাড়া সেবা, ভয় ছাড়া থানা, হয়রানি ছাড়া আদালত। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের এই ন্যূনতম অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে জনআস্থার সংকট আরও গভীর হবে- এ বাস্তবতা অস্বীকার করার আর কোনো সুযোগ নেই।
এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা ৫১টি রাজনৈতিক দল ও ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে প্রশ্ন- আপনারা কি সত্যিই ঘুষমুক্ত রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিত করবেন? থানা, ভূমি অফিস, আদালত ও প্রশাসনকে কি দালালমুক্ত করা হবে? নাকি নির্বাচন শেষে জনগণ আবারও প্রতিশ্রুতির ভিড়ে হারিয়ে যাবে? জনগণ এবার শুধু স্লোগান নয়, স্পষ্ট অঙ্গীকার এবং বাস্তব পদক্ষেপের উত্তর চায়।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক
এমএসএম / এমএসএম
হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা: ২.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য ঝুঁকিতে, বাংলাদেশের সামনে নতুন সতর্কবার্তা
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব
নতুন সংসদ, নতুন সাংসদ: প্রস্তুতির রাজনীতিতে বিএনপির নতুন অধ্যায়
দক্ষ জাতি গঠনের নতুন দিগন্ত: ১৭ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক জাতীয় প্রশিক্ষণ কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে?
‘ইরান-ইসরাইলের যুদ্ধে আমরা পক্ষভুক্ত নই’- ইরানের হামলা নিয়ে ইউএইর অবস্থান: একটি ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ
ট্যাক্স না বাড়িয়ে ঘুষ কমান, রাজস্ব বাড়বে
ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা, হুমকিতে বিশ্বনিরাপত্তা
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, পতন অনিবার্য
৬ মাসের সময়সীমা বনাম ৬০ দিনের ধৈর্য: শাসন, সংকট ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে
দুর্নীতি-চাঁদাবাজি কখনোই বন্ধ হবে না—কারণ রাষ্ট্র নয়, রাজনীতিই তার আশ্রয়
পতাকাহীন গাড়ি, সাইরেনহীন পথ: বাংলার ধূলোমাখা পথে এক নিঃসঙ্গ কর্মবীর তারেক রহমানের পদধ্বনি