আত্মত্যাগ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ঈদুল আজহা
বিশ্বজুড়ে সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন উৎসব আছে। উৎসব জাতিগত ঐক্যের চেতনা সৃষ্টি করে। উৎসবের দিনগুলোও যেকোনো জাতির স্বাতন্ত্র্য ও পৃথক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও প্রতীক। একটি জাতির স্বতন্ত্র পরিচয় সত্তা নির্মাণ করতে, তাদের মধ্যে ঐক্যবোধ, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের চেতনা জাগ্রত করতে সম্মিলিত আনন্দ ও উদযাপন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঈদ শব্দটিতে জড়িয়ে আছে এক অপূর্ব আনন্দ শিহরণ। শব্দটি নিমেষেই পরিবেশের আবহ বদলে দেয়। সব অভাব অনটন দুঃখ বেদনা সরিয়ে অদৃশ্য এক আনন্দ অনুভবে মন ভরিয়ে দেয়। মুসলিম জীবনাচারে ঈদ পেছনে ফেলে আসা আত্মীয় পরিজনের সাথে মিলিত হওয়ার আনন্দে উদ্বেল করে তোলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। আত্মীয় পরিজন,শৈশবের বন্ধু, সবার সাথে ঈদ আনন্দকে ভাগ করে নেয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা সবাইকে ঘরমুখী ও শেকড়মুখী করে তোলে। নাড়ির অচ্ছেদ্য টান- যেন প্রাণ ফিরে পায়-ঈদ এলেই। প্রবাসের দুঃখ বেদনা যন্ত্রণা সব পেছনে ফেলে তাই তো মানুষ অনেক কষ্ট করে হলেও ছুটে যায় আপন জনের মাঝে। পথের অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট আমলে না নিয়েই সবাই ফিরতে চায় ফেলে আসা শত সহস্র স্মৃতিবিজড়িত শৈশবের পরিবেশে, আত্মীয় পরিজন এবং বন্ধুদের মাঝে। এ এক অপার্থিব আনন্দক্ষণ। হাজার বছর ধরে চলে আসা এক ধারাবাহিকতা। মুসলিম জীবনাচারের সাংস্কৃতিক ধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ ঈদ এবং ঈদ আনন্দ। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ধারাবাহিকতায় এখনো ঈদের ছুটি, ঈদযাত্রার সরলীকরণ করা যায়নি, বিশেষ করে আমাদের দেশে। প্রতি বছরই পুনঃপৌনিকভাবে একটা সমস্যা এই আনন্দকে প্রায়ই বিষাদে পরিণত করে। তা হচ্ছে ঈদের ছুটি বিন্যাস। অথচ মুসলিম জীবনে অসীম গুরুত্ব আর তাৎপর্যময় উৎসব ঈদুল আজহা। আত্মত্যাগ ও ধৈর্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দিন।
ঈদ উৎসবটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পবিত্র ধর্মীয় অনুভূতি ইসলামে ধর্ম আর জীবন আঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িয়ে আছে। সুতরাং মুসলিম জীবনে ঈদ কেবল বিলাসিতা কিংবা স্রেফ আনন্দ উপভোগেরই নাম নয়। এতে জড়িয়ে আছে কর্তব্যবোধ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ব বোধের বৈশিষ্ট্য।সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্প্রীতির ভাবটা এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামের দৃষ্টিতে জীবন আর ধর্ম একই সূত্রে গাঁথা। তাই ঈদ শুধু আনন্দের উৎস নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্তব্যবোধ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের বৈশিষ্ট্য। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্প্রীতির ভাবটাই এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ঈদ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভোলার জন্য, মানুষের মধ্যে প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হওয়ার জন্য পরম মিলনের বাণী নিয়ে আসে। ঈদুল আজহায় যে কোরবানি দেওয়া হয়, তার মাধ্যমে মানুষের মনের পরীক্ষা হয়, কারণ কোরবানির রক্ত-গোশত কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না; শুধু দেখা হয় মানুষের হৃদয়। এই ঈদে আছে সাম্যের বাণী, সহানুভূতিশীল হৃদয়ের পরিচয়। তাই পরোপকার ও ত্যাগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় মানুষের মন। এটাই ঈদের শিক্ষা ও সার্থকতা। কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং ইসলামী নিদর্শন ও অন্যতম ঐতিহ্য। ত্যাগ, তিতিক্ষা ও প্রিয় বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করাই হলো কোরবানির তাৎপর্য। বস্তুত কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা আমাদের কাছে আত্মশুদ্ধি, আত্মতৃপ্তি ও আত্মত্যাগের এক সুমহান বার্তা নিয়ে প্রতিবছর উপস্থিত হয়। ঈদুল আজহার শিক্ষায় উজ্জীবিত হলে আমরা সব পাপ, বঞ্চনা, সামাজিক অনাচার, রিপুর তাড়না ও শয়তানের প্রবঞ্চনা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হব। তাই ঈদুল আজহার পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশুশক্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপুকেই কোরবানি দিতে হয়। আর হালাল অর্থে অর্জিত পশু কোরবানির মাধ্যমে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়।
মানবসভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস এটাই সাক্ষ্য দেয় যে, পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোন না কোনভাবে আল্লাহর দরবারে নিজেদের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করে। এটাই মানুষের চিরন্তন স্বভাব।আমাদের ওপর যে কোরবানির নিয়ম নির্ধারিত হয়েছে, তা মূলত হজরত ইবরাহিম (আ:) কর্তৃক শিশুপুত্র ইসমাইল (আ:)-কে আল্লাহর রাহে কোরবানি দেয়ার অনুসরণে সুন্নাতে ইব্রাহীম হিসেবে চালু হয়েছে। মক্কা নগরীর জনমানবহীন ‘মিনা’ প্রান্তরে আল্লাহর দুই আত্মনিবেদিত বান্দা ইবরাহিম ও ইসমাইল আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তুলনাহীন ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, বর্ষপরম্পরায় তারই স্মৃতিচারণ হচ্ছে ‘ঈদুল আজহা’ বা কোরবানির ঈদ। হজরত ইবরাহিম (আ:) আল্লাহর নির্দেশে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু পুত্র ইসমাইলকে তার উদ্দেশ্যে কোরবানি করতে প্রস্তুত ছিলেন, ঈদুল আজহার দিন মুসলমানরাও তেমনি পশু কোরবানির মাধ্যমে নিজেদের প্রিয়তম জানমাল আল্লাহর পথে কোরবানি করার সাক্ষ্য প্রদান করেন। হজরত ইবরাহিম (আ:)-এর সেই মহত্ত্ব ও মাকবুল কোরবানিকে শাশ্বত রূপদানের জন্যই আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসুল (সা:) এই দিনে মুসলমানদেরকে ঈদুল আজহা উপহার দিয়েছেন এবং কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই কোরবানি হলো চিত্তশুদ্ধির এবং পবিত্রতার মাধ্যম। এটি সামাজিক রীতি হলেও আল্লাহর জন্যই এ রীতি প্রবর্তিত হয়েছে। তিনিই একমাত্র বিধাতা প্রতি মুহূর্তেই যার করুণা লাভের জন্য মানুষ প্রত্যাশী। আমাদের বিত্ত, সংসার এবং সমাজ তাঁর উদ্দেশেই নিবেদিত এবং কোরবানি হচ্ছে সেই নিবেদনের একটি প্রতীক। কোরবানির মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর জন্য তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতে রাজি আছে কি-না সেটিই পরীক্ষার বিষয়। কোরবানি আমাদেরকে সেই পরীক্ষার কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। ইবরাহিম (আ:)-এর কাছে আল্লাহর পরীক্ষাও ছিল তাই।
আমাদের এখন আর পুত্র কোরবানি দেয়ার মতো কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় না। একটি হালাল পশু কোরবানি করেই আমরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি। ঈমানের এসব কঠিন পরীক্ষায় যারা যত বেশি নম্বর অর্জন করতে পারেন, তারাই হন তত বড় খোদাপ্রেমিক ও ততই সফল মানুষ এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে ততই সফল। ঈদের প্রকৃত আধ্যাত্মিক আনন্দ তারা ঠিক ততটাই উপভোগ করতে পারেন যতটা তারা এ জাতীয় পরীক্ষায় সফল হন। কোরবানির পশুর রক্ত মাটি স্পর্শ করার আগেই আল্লাহর কাছে তার সওয়াব গ্রাহ্য হয়ে যায়। আল্লাহর কাছে কোরবানির সওয়াব গ্রাহ্য হওয়ার তাৎপর্য হচ্ছে, যে অকুণ্ঠ ঈমান আর ত্যাগের মহিমায় উদ্দীপ্ত হয়ে ইবরাহিম (আ:) স্বীয় প্রাণাধিক পুত্রের স্কন্ধে ছুরি উত্তোলিত করেছিলেন, কোরবানির পশুর গলায় ছুরি দেয়ার সময়ে কোরবানিদাতার হৃদয়তন্ত্রী সেই ঈমান ও ত্যাগের সুরে অনুরণিত হতে হবে। কোরবানিদাতার হৃদয়তন্ত্রী যদি সেই ঈমান ও ত্যাগের সুরে অনুরণিত না হয়ে ওঠে, তাদের দেহ আর মনের পরতে পরতে যদি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের আকুল আগ্রহ উদ্বেলিত না হয়, তাহলে তাদের এই কোরবানির উৎসব পর্বেই পর্যবসিত হবে। মূলত কোরবানি হচ্ছে একটি প্রতীকী ব্যাপার। আল্লাহর জন্য বান্দার আত্মত্যাগের একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। কোরবানি থেকে শিক্ষা নিয়ে সারা বছরই আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় নিজ সম্পদ অন্য মানুষের কল্যাণে ত্যাগের মনোভাব গড়ে উঠলে বুঝতে হবে কোরবানি সার্থক হয়েছে, কোরবানির ঈদ সার্থক হয়েছে। নতুবা এটি নামমাত্র একটি ভোগবাদী অনুষ্ঠানই থেকে যাবে চিরকাল। কোরবানি কোনো লোক দেখানো বা গোশত খাওয়ার উৎসব নয়। কোরবানিতে যদি আল্লাহভীতি ও মনের একাগ্রতা না থাকে, তাহলে এই সুবর্ণ সুযোগ বিফল মনোরথ ছাড়া আর কিছুই হবে না।
ঈদুল আজহার চিরায়ত শিক্ষা মানুষ মহান আল্লাহর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবে,এই শিক্ষাই ইবরাহিম (আ:) আমাদের জন্য রেখে গেছেন। সুতরাং কোরবানির মাধ্যমে প্রতিটি মুসলিম পরিবারের আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করাই হবে একমাত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। ঈদ যেমনি আনন্দের বার্তা দিচ্ছে ঠিক তেমনিভাবে শিক্ষা দিচ্ছে মহান আল্লাহর আদেশ নিষেধ পালনের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করার। নিজের মাঝে থাকা পশুত্ব ও অমানবিক মন মানসিকতা বিসর্জন দেওয়ার। বার্তা দিচ্ছে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর। সুপথ দেখাচ্ছে ন্যায় নীতি আর নিষ্ঠার পথে চলার। শিক্ষা দিচ্ছে সুন্দর ও পবিত্র মনের অধিকারী হওয়ার। তাই আসুন ঈদুল আযহার প্রকৃত মহত্ত্ব ও তাৎপর্য নিজে লালন করতে শিখি। অসুন্দর ও কলুষিত হৃদয় পবিত্র করার লক্ষ্যে ঈদুল আজহায় শিক্ষা গ্রহণ করি। তাই ঈদুল আজহার পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশুশক্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপুকেই কোরবানি দিতে হয়। আর হালাল অর্থে অর্জিত পশু কোরবানির মাধ্যমে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়। আমরা চাই ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সব অনিশ্চয়তা-শঙ্কা দূর হোক। হিংসা, হানাহানি ও বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে একসঙ্গে এক কাতারে পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দে শামিল হয়ে সবার মধ্যে সাম্য ও সহমর্মিতার মনোভাব জাগিয়ে তুলি। মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে আমাদের প্রার্থনা হোক-জগতের সব মানুষের সুখ, শান্তি সমৃদ্ধি। পৃথিবী সর্বপ্রকারের হিংসা বিদ্বেষ ও হানাহানি মুক্ত হোক! সন্ত্রাসের বিভীষিকা দূর হোক! আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে বন্ধন দৃঢ়তর হোক! আগামী দিনগুলো সুন্দর ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হোক হাসিখুশি ও ঈদের আনন্দে ভরে উঠুক প্রতিটি প্রাণ। সবাইকে ঈদুর আজহার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। ঈদ মোবারক।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে
Aminur / Aminur
অসাধু কসাইদের প্রতারণা ও আমাদের অজ্ঞতা: সতেজতার আড়ালে অনিরাপদ মাংস
আত্মত্যাগ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ঈদুল আজহা
পাহাড়ে শান্তির পথপ্রদর্শক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান
বিদ্যুৎ বিল কমানো জরুরি , সরকার উদ্যোগ নিবে এটাই সকলের প্রত্যাশা
আসন্ন ঈদ-উল-আজহায় ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনারোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
যেখানে হারায় আলো, সেখানে জন্মায় স্বপ্ন
শিক্ষাক্রমে মাধ্যমিক স্তরে কৃষি শিক্ষা পুনরায় বাধ্যতামূলক করা হোক
লবণ কমাই, জীবন বাঁচাই: বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৬
সংস্কার আর জনকল্যাণে তারেক রহমানের ১০০ দিনের দোরগোড়ায় নতুন বাংলাদেশ
জাতীয় সংসদে দরুদ ও সালামের ধ্বনি: ঈমান, আদর্শ ও জাতীয় চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত!
শিশু কিশোরদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া
মুক্ত গণমাধ্যম দিবস: বাংলাদেশে কারাবন্দি সাংবাদিকতা ও স্বাধীনতার সংকট