ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬: যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ


মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম photo মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১৯-৬-২০২৬ দুপুর ১:১২

আজ ২০ জুন, বিশ্ব শরণার্থী দিবস। বিশ্বের কোটি কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্দশা, সংগ্রাম ও আশার গল্প স্মরণ করার দিন এটি। যুদ্ধ, সংঘাত, রাজনৈতিক নিপীড়ন, জাতিগত সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ের কারণে যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশের আন্তর্জাতিক উপলক্ষও বটে। ২০২৬ সালের বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রতিপাদ্য “Until Everyone Is Safe” (যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ) একটি গভীর মানবিক ও নৈতিক বার্তা বহন করে। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR) বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিতে চায় যে নিরাপত্তা কখনো একক বা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়; এটি সবার জন্য নিশ্চিত না হলে কারও জন্যই পূর্ণাঙ্গ নয়।

বিশ্ব আজ এক অভূতপূর্ব বাস্তুচ্যুতি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধন ও সহিংসতার শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট।ইউক্রেন যুদ্ধ, সুদান সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গৃহযুদ্ধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে লাখো মানুষ প্রতিনিয়ত নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘরছাড়া হচ্ছে। তারা শুধু বাসস্থান হারায় না; হারায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সুযোগ।

এবারের বিশ্ব শরণার্থী দিবস বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে, কারণ ১৯৫১ সালের জেনেভা শরণার্থী কনভেনশনের ৭৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে এটি পালিত হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে গৃহীত এই কনভেনশন আন্তর্জাতিক শরণার্থী সুরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে। বর্তমানে বিশ্বের ১৪৯টি দেশ এই কনভেনশন ও এর সংশ্লিষ্ট প্রোটোকলে স্বাক্ষর করেছে। কনভেনশনের মূল লক্ষ্য হলো যে মানুষ নিজ দেশে নিপীড়নের শিকার হয়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা, অধিকার এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা। ৭৫ বছর পরও এই কনভেনশনের প্রাসঙ্গিকতা কমেনি; বরং বৈশ্বিক বাস্তবতায় এটি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।

“Until Everyone Is Safe” থিমটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে। পৃথিবীর কোথাও যদি মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, নিপীড়নের শিকার হয় বা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়ায়, তাহলে মানবসভ্যতার সামগ্রিক নিরাপত্তাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। শরণার্থীদের প্রতি বৈষম্য, ঘৃণা বা উদাসীনতা কেবল মানবিক মূল্যবোধকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই শরণার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কেবল দয়া বা সহানুভূতির বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক দায়িত্ব ও নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো Refugee Week-এর সহযোগী প্রতিপাদ্য “Courage” (সাহস)। বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে এই শব্দটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যারা যুদ্ধের ভয়াবহতা, নির্যাতন কিংবা অনিশ্চয়তার মধ্যেও বেঁচে থাকার জন্য নতুন জীবন শুরু করেন, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সাহসের প্রতীক। নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি, নতুন পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার। একই সঙ্গে আশ্রয়দানকারী দেশ ও সম্প্রদায়ের মানবিক সহমর্মিতাও সাহসিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

বাংলাদেশের জন্যও বিশ্ব শরণার্থী দিবসের তাৎপর্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশংসা অর্জন করলেও এই সংকটের ভার বহন করা কোনো একক দেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। তাই শরণার্থী সমস্যার টেকসই সমাধানে বৈশ্বিক সহযোগিতা, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ অপরিহার্য।

বর্তমান বিশ্বে শরণার্থী সুরক্ষা শুধু আশ্রয় প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মদক্ষতা উন্নয়ন এবং পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শরণার্থী সৃষ্টির মূল কারণ সংঘাত, বৈষম্য, নিপীড়ন এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া বাস্তুচ্যুতির এই ক্রমবর্ধমান সংকট থামানো সম্ভব নয়।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শরণার্থীরা কোনো পরিসংখ্যান নয়; তারা আমাদেরই মতো স্বপ্ন, আশা এবং মর্যাদার অধিকারী মানুষ। তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা মানবতার প্রতি আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য তাই শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি একটি বৈশ্বিক আহ্বান যতক্ষণ না পৃথিবীর প্রতিটি বাস্তুচ্যুত মানুষ নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক জীবন লাভ করছে, ততক্ষণ আমাদের দায়িত্ব শেষ নয়। সত্যিকার অর্থে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলতে হলে নিশ্চিত করতে হবে যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ, ততক্ষণ কেউই পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম

লেখক ও কলামিস্ট

এমএসএম / এমএসএম

সীমান্তে রক্তপাত ও পুশইন আর মুখে বন্ধুত্বের বুলি: এই দ্বিচারিতার শেষ কোথায়?

বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও টেকসই উন্নয়ন

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়

​বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা

কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?

লেখকের কষ্ট

বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান