টেকসই উন্নয়নের জন্য সুশাসন, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য
টেকসই উন্নয়ন আজ শুধু একটি উন্নয়নমূলক ধারণা নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের জন্য প্রতিটি দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় সুশাসনের অভাব, জবাবদিহিতার দুর্বলতা এবং দুর্নীতির বিস্তার। কোনো রাষ্ট্রে উন্নয়নের জন্য যত অর্থই বরাদ্দ করা হোক না কেন, যদি সেই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত না হয়, যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা না থাকে এবং জনগণের কাছে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হয়, তবে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না।
সুশাসন বলতে এমন একটি রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকে, প্রশাসন স্বচ্ছ ও দক্ষ হয়, মানবাধিকার রক্ষা করা হয়, জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জনগণের কল্যাণে কাজ করে। সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং জবাবদিহিতা। একটি দেশে যখন সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় সহজে পৌঁছে যায়, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হয়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় এবং নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা গড়ে ওঠে।
জবাবদিহিতা হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম হলে তার দায় নির্ধারণ করতে হবে, সরকারি অর্থের অপচয় হলে তার হিসাব দিতে হবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহিতা না থাকলে দুর্নীতি ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় এবং জনগণের আস্থা নষ্ট হয়।
দুর্নীতি শুধু অর্থ আত্মসাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়োগে অনিয়ম, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার কারসাজি, কর ফাঁকি এবং সরকারি সম্পদের অপচয়ও দুর্নীতির অংশ। দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, নিম্নমানের কাজ হয় এবং জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। একটি সেতু, হাসপাতাল, বিদ্যালয় কিংবা সড়ক নির্মাণে যদি দুর্নীতি হয়, তাহলে শুধু অর্থের অপচয়ই ঘটে না, মানুষের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে উন্নয়নের প্রতিটি স্তরে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কঠোর তদারকি এবং কাজ শেষে স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয়, নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন সেবা, ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-টেন্ডারিং এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম কমানো সম্ভব হয়েছে। ডিজিটাল সেবার ফলে নাগরিক ও কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ কমে যাওয়ায় ঘুষ ও হয়রানির সুযোগও অনেকাংশে হ্রাস পায়। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি নৈতিকতা, সততা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
টেকসই উন্নয়নের জন্য দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দুর্নীতি উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবার তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর ব্যবহার জনগণকে সরকারি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন করে এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুশাসন কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। নাগরিক, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমসহ সমাজের প্রতিটি অংশকে সততা ও নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। কারণ দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার জন্য কেবল কঠোর আইন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তোলা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, যেসব রাষ্ট্র সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছে, তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেও দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। সিঙ্গাপুর, ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড কিংবা ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে দুর্নীতির মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। কারণ সেখানে আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দক্ষ সরকারি সেবা এবং জবাবদিহিতার শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট হয় যে, টেকসই উন্নয়নের জন্য কেবল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, সুশাসনের ভিত্তিও সমানভাবে অপরিহার্য।
বাংলাদেশও উন্নয়নের ধারায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যোগাযোগ অবকাঠামো, ডিজিটাল সেবা এবং সামাজিক সূচকে দেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এই অর্জন ধরে রাখতে হলে উন্নয়নের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নিতে হবে। কোনো প্রকল্পের অর্থ অপচয়, নিম্নমানের কাজ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার শুধু বর্তমানের ক্ষতিই করে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের পথও সংকুচিত করে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও দায়িত্ব পালনে মেধা, সততা ও দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা অযোগ্যতার কারণে রাষ্ট্রযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়
এমএসএম / এমএসএম
টেকসই উন্নয়নের জন্য সুশাসন, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য
গুরু পূর্ণিমা: ঐতিহ্য, ইতিহাস ও গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাহাত্ম্য
ঢাকা শহরের বর্জ্যজনিত দুর্ভোগ প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন
স্বাগতম অ্যান্ডি বার্নহাম বিদায় কিয়ার স্টার্মার
রথযাত্রা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি
অপরিকল্পিত নগরায়ণে ডুবছে চট্টগ্রাম, জনসচেতনতা ছাড়া উত্তরণ সম্ভব নয়
বাধ্যতামূলক বাংলা কিউআর : স্মার্ট ইকোনমির আড়ালে ‘ডিজিটাল দাসত্ব’ ও নজরদারির এক নীল নকশা
সামাজিক অবক্ষয়রোধে নান্দনিক দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ অপরিহার্য
কর্মচারী নিয়োগে একাডেমিক সনদের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিৎ
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন অপরিহার্য
পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ
ব্রেক্সিট পরবর্তি ব্রিটিশ রাজনীতি এবং স্টারমারের বিদায়