স্মরণে গোলাম সারওয়ার: আদর্শ সাংবাদিকতার এক অনির্বাণ শিখা
আজ ১৩ আগস্ট, ২০২৬। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের এক নক্ষত্রপুরুষ, আধুনিক সংবাদপত্রের অন্যতম পথিকৃৎ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম সারওয়ারের অষ্টম প্রয়াণ দিবস। এই শোকাবহ দিনে দাঁড়িয়ে যখন তাঁর কর্মময় জীবনের দিকে তাকাই, তখন মনে হয়—একটি মৃত্যু কি আসলেই সব শেষ করে দিতে পারে? গোলাম সারওয়ারের ক্ষেত্রে উত্তরটি স্পষ্টভাবে ‘না’। তিনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষণে যে সাংবাদিকতা চর্চা করে গেছেন, তা আমাদের জন্য আজও অম্লান প্রেরণা হয়ে আছে।
গোলাম সারওয়ার ১৯৪৩ সালের ১ এপ্রিল বরিশাল জেলার বানারীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করা এই কৃতী ব্যক্তিত্ব ১৯৬৩ সালে ছাত্রাবস্থায় ‘পয়গাম’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি দেন। এরপর তিনি দৈনিক সংবাদে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি ‘সংবাদ’-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল সবসময় অটল ও আপসহীন।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে সিনিয়র সহসম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় সেখানে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে দৈনিক যুগান্তর এবং ২০০৫ সালে দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে তিনি নতুন প্রজন্মের সংবাদপত্র শিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্ব ও অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতায় পত্রিকা দুটি দ্রুত পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবেও বারবার দায়িত্ব পালন করেছেন, যা তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে। এছাড়া তিনি প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন।
সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০১৪ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এছাড়াও তিনি ২০১৬ সালে কালচারাল জার্নালিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশ (সিজেএফবি) আজীবন সম্মাননা এবং ২০১৭ সালে আতাউস সামাদ স্মারক ট্রাস্ট আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি লেখালেখিতেও বিশেষ সুনাম অর্জন করেছিলেন। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ছড়াগ্রন্থ ‘রঙিন বেলুন’ এবং প্রবন্ধ সংকলন ‘সম্পাদকের জবানবন্দি’, ‘অমিয় গরল’, ‘আমার যত কথা’ ও ‘স্বপ্ন বেঁচে থাক’।
২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৫ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ আট বছর পর, যখন ডিজিটাল গণমাধ্যমের জোয়ারে সংবাদের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে, তখন গোলাম সারওয়ারের পেশাদারিত্ব, সততা আর নিরবচ্ছিন্ন চর্চার অভাব খুব বেশি অনুভূত হয়। আজকের এই দিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—তাঁর রেখে যাওয়া সাংবাদিকতার যে আদর্শ, তা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব অনুশীলনে ধারণ করা। গোলাম সারওয়ার শুধু একটি নাম নন, তিনি একটি আলোকবর্তিকা। যতদিন বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সত্যের চর্চা থাকবে, ততদিন তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।
(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
এমএসএম / এমএসএম
স্মরণে গোলাম সারওয়ার: আদর্শ সাংবাদিকতার এক অনির্বাণ শিখা
বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, বিদ্যুৎ নেই: বাংলাদেশের লোডশেডিং সংকটের আসল কারণ কোথায়?
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দেশের স্বার্থে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে
সমুদ্রের সম্পদ থেকে শিল্পায়ন: মাতারবাড়ী–মীরসরাই করিডোরে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত
হজ প্যাকেজ ২০২৭: সাশ্রয়ী ও প্রবাসীবান্ধব হজ
রাষ্ট্র ও নাগরিকের যৌথ উদ্যোগেই দেশ এগিয়ে যায়
তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক দর্শন: উসকানির জবাবে পেশিশক্তি নয়, ধৈর্য ও শৃঙ্খলা!
টেকসই উন্নয়নের জন্য সুশাসন, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য
গুরু পূর্ণিমা: ঐতিহ্য, ইতিহাস ও গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাহাত্ম্য
ঢাকা শহরের বর্জ্যজনিত দুর্ভোগ প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন
স্বাগতম অ্যান্ডি বার্নহাম বিদায় কিয়ার স্টার্মার
রথযাত্রা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি