জাতীয় সংকটে আস্থার ঠিকানা জিয়া পরিবার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা, জাতীয় পরিচয়ের নির্মাণ, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম এবং বারবার সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় একটি বাস্তব সত্য পরিস্ফুটিত, রাষ্ট্র যখনই কোনো গভীর সংকটের মুখে পড়েছে, দেশের মানুষ বারবার নিজেদের ভরসা রেখেছে জাতীয়তাবাদী শক্তির ওপর; আস্থা রেখেছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন, গণতন্ত্রের মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রাম এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশনায়ক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার মহান অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলেও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনের কাজটি ছিল অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। সেই পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে দ্রুতই যুক্ত হয়েছিল প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি। ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে দুর্নীতির বিস্তার ও অনিয়মের অভিযোগ যেমন জনমনে গভীর হতাশা তৈরি করেছিল, তেমনি তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সশস্ত্র রাজনীতি ও সংঘাতের পথ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকার বিতর্ক ছাপিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামো এক চরম সংকটের মুখে পড়ে, যার পরিণতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন।
এরপর বাংলাদেশ প্রবেশ করে এক চরম অনিশ্চিত ও দিকনির্দেশহীন অধ্যায়ে। অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার সংঘাতে রাষ্ট্র যখন গভীর সংকটে, ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জাতীয় নেতৃত্বে আসেন মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক, স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর রাজনৈতিক উত্থানকে কেবল একজন সেনাপ্রধানের ক্ষমতা দখল হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি বড় অংশকে অস্বীকার করা হবে। তিনি এমন এক সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন যখন প্রয়োজন ছিল স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। রাষ্ট্র পরিচালনায় উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি বিপ্লব এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে জনশক্তি রপ্তানির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি দেশের অর্থনীতিকে নতুন গতিশীলতা দান করেন।
পাশাপাশি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এবং সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশকে এক অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কেবল কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, বরং তা ছিল দেশের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও সংস্কৃতির রূপরেখা। বহুদলীয় রাজনীতির প্রবর্তন এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার পথ তৈরি করেন। ১৯৮১ সালে তাঁর নির্মম হত্যাকান্ডে জাতীয় রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হয়।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদাতের অল্প কদিন পরই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতাগ্রহণ গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে সংকুচিত করলেও থেমে থাকেনি জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ছাত্র-জনতার দীর্ঘ লড়াই এবং নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং দেশে নির্বাচনী গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জনগণ বিএনপির ওপর আস্থা রেখে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন এবং দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করেন, যা গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের মূল ভিত্তি ছিল প্রতিকূলতার মাঝেও তাঁর আপসহীন অবস্থান। শহীদ জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর দলের কঠিন সময়ে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে সংগঠিত রাখেন। দীর্ঘ কারাবাস, মিথ্যা মামলা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েও তিনি গণমানুষের অধিকারের লড়াই থেকে কখনো সরে দাঁড়াননি। তাঁর শাসনামলে শিক্ষা ও নারী অগ্রগতির ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও শিক্ষার প্রসারে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি প্রকল্প চালু করা হয়। এছাড়া অ্যাসিড সন্ত্রাস দমন আইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে তিনি নারীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে নতুন শতাব্দীর শুরুতে তাঁর নেতৃত্বেই বিএনপি পুনরায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারে বিভিন্ন যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এরপরের দু দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘ সংঘাত, নির্বাচন-বিরোধী প্রোপাগান্ডা, জরুরি অবস্থা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের খোলামেলা হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপির কাছে এই সময়টি ছিল ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের কাল, অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের তরফ থেকে এর ভিন্ন মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে এই দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মাঝেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসেন গণতন্ত্রের বরপুত্র তারেক রহমান। রাজনৈতিক মামলা, প্রতিনিয়ত তথ্যসন্ত্রাসের শিকার হওয়া, কারাবাস ও বিদেশে অবস্থানের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠন এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দেশনায়ক তারেক রহমানের দক্ষ নেতৃত্বে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর জনগণের এই রায় কেবল একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং এটি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর আস্থার প্রকাশ। তাঁর পরিশীলিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং জনকল্যাণমুখী জীবনযাপন আজ তরুণ প্রজন্মসহ সর্বস্তরের মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। একটি রাজনৈতিক দলের আদর্শ কেবল অতীতের স্মৃতির ওপর বেঁচে থাকে না; তা টিকে থাকে বর্তমানের সংকট ও মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে। বর্তমান সরকারের সামনে অর্থনীতিকে গতিশীল করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার শক্তি নিহিত রয়েছে এই আস্থায় যে, সংকট ও পরিবর্তনের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে দেশের মানুষ সঠিক নেতৃত্ব বেছে নিয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেমন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আত্মনির্ভরতার ভিত্তি গড়েছিলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনি আজকের দিনে তারেক রহমানের সামনে দায়িত্ব হলো একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র নির্মাণ করা।
আজ সর্বজন স্বীকৃত, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এ দেশের মানুষের হৃদস্পন্দন এবং কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক অধিকারের প্রতিটি বাস্তব প্রশ্নের কার্যকর সমাধানের অনন্য চালিকাশক্তি। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়া পরিবারের তিনটি নাম কেবল তিনজন ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং এটি এ দেশের মানুষের মুক্তি, সার্বভৌমত্ব, অগ্রগতি তথা জাতীয়তাবাদের প্রতীক। রাজনীতিতে কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নন, কিন্তু জাতীয় সংকটের মুহূর্তে বিএনপি, তথা জিয়া পরিবার বারবার জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। এই আদর্শ দীর্ঘ ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংগ্রাম ও রাষ্ট্রচিন্তার প্রতীক। তাই, জাতীয়তাবাদী আদর্শ সর্বদাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক বিরাট আস্থার জায়গা। জনগণের সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত করার মাঝেই আগামী দিনের সাফল্যের ইতিহাস রচিত হবে।
লেখক: ড. সাবিনা ইয়াসমিন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, কেন্দ্রীয় কমিটি
এমএসএম / এমএসএম
জাতীয় সংকটে আস্থার ঠিকানা জিয়া পরিবার
বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলা: শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়া
ইস্টার্ন রিফাইনারি: ৮ হাজার কোটি থেকে ৩৫ হাজার কোটি—দেড় যুগের অপেক্ষার মূল্য আর কত?
১৪ লাখের বেতন বাড়বে, ১৭ কোটি মানুষের কী হবে?
দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও অধিকার আদায়ের আলোকবর্তিকা: বীরউত্তম মেজর জেনারেল সি আর দত্ত
শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আমন্ত্রণ: সম্প্রীতির নতুন সুরে ঢাকা–দিল্লির ভূ-কৌশলগত সমীকরণ
জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি
শিক্ষানীতির বড় ঘাটতি হচ্ছে ব্যবস্থাপনা
বেগম খালেদা জিয়া : সাহস, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি
স্মরণে গোলাম সারওয়ার: আদর্শ সাংবাদিকতার এক অনির্বাণ শিখা