সরকারি হাজীদের অব্যয়িত অর্থ ফেরত: স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারি মাধ্যমে নিরাপদ হজ
সম্প্রতি ২০২৬ সালের হজের সরকারি মাধ্যমের হাজীদের অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হতে প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত টাকা ফেরতের বিষয়টি দেশবাসীকে অবহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি কোনো সেবামূল্যের অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেয়ার নজির নেই। শুধু হজ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেই এরূপ দৃষ্টান্ত রয়েছে। সরকার প্রাথমিকভাবে প্যাকেজভিত্তিক যে খরচ ধার্য করে থাকে প্রকৃত খরচ তার চেয়ে কম হলে উদ্বৃত্ত টাকা হাজীদের ফেরত দেওয়া হয়। পৃথিবীর আরো কিছু দেশেও হজ প্যাকেজের অব্যয়িত টাকা হাজীদের ফেরত দেওয়ার এরূপ নজির রয়েছে।
২০২৬ সালে সরকারি মাধ্যমে হজ প্যাকেজ-১ (বিশেষ), হজ প্যাকেজ-২ ও হজ প্যাকেজ-৩ নামে মোট তিনটি প্যাকেজ ছিল। এই তিনটি প্যাকেজের হাজীরদের প্রত্যেকেই টাকা ফেরত পেয়েছেন। শুধু ২৩ জন হাজীর চিকিৎসা ব্যয় তাদের স্বাস্থ্যবিমার অর্থের চেয়ে বেশি হওয়ায় তারা কোনো অর্থ ফেরত পাননি।
হজ প্যাকেজ-১ (বিশেষ) এর হাজীদেরকে হোটেল বুল্লরা আল দুররাতে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই হোটেলে অবস্থানকারী পূর্ণ প্যাকেজের হাজীরা প্রত্যেকে ৩৮ হাজার ৬৯৭ টাকা ৩২ পয়সা এবং শর্ট প্যাকেজের হাজীরা প্রত্যেকে ৪৬ হাজার ৮৮৮ টাকা ৪০ পয়সা ফেরত পেয়েছেন। এই হোটেলের দুই সিটের আপগ্রেডেশনের হাজীরা প্রত্যেকে এক লক্ষ ৬৪ হাজার ১৯০ টাকা ৫৬ পয়সা এবং যে সকল হাজীরা দুই সিটের আপগ্রেডেশন ও শর্ট প্যাকেজে হজ পালন করেছেন তারা প্রত্যেকে এক লক্ষ ৮০ হাজার ৫৭২ টাকা ৭১ পয়সা ফেরত পেয়েছেন। তিন সিটের আপগ্রেডেশনের হাজীরা প্রত্যেকে এক লক্ষ ১৮ হাজার ৭২ টাকা ৮২ পয়সা এবং যে সকল হাজীরা তিন সিটের আপগ্রেডেশন ও শর্ট প্যাকেজে হজ পালন করেছেন তাদের প্রত্যেককে এক লক্ষ ৩১ হাজার ৭৩৫ টাকা ৫৩ পয়সা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
হজ প্যাকেজ-২ এর হজযাত্রীদেরকে তিনটি পৃথক হোটেলে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। হোটেল লুলুয়াত আল তাওহীদে অবস্থানকারী সাধারণ প্যাকেজের হাজীরা প্রত্যেকে ২,৫০৫ টাকা, শর্ট প্যাকেজের হাজীরা ৮,৭৩০ টাকা, দুই সিটের আপগ্রেডেশনের হাজীরা ৬২,৩৩১ টাকা, দুই সিটের আপগ্রেডেশনের শর্ট প্যাকেজের হাজীদের প্রত্যেকে ৭৮,৭১৩ টাকা, তিন সিটের আপগ্রেডেশনের হাজীদের প্রত্যেককে তিন হাজার ২৮৭ টাকা এবং তিন সিটের আপগ্রেডেশনের শর্ট প্যাকেজের হাজীদের প্রত্যেককে আট হাজার ৪৩১ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। তিন নম্বর হোটেল রাওদাত আল শুরুকে অবস্থানকারী সাধারণ প্যাকেজের প্রতিজন হাজী তিন হাজার ৯৭৯ টাকা, শর্ট প্যাকেজের প্রতিজন হাজী ১২ হাজার ১৭০ টাকা, দুই সিটের আপগ্রেডেশনের প্রতিজন হাজী চার হাজার ৩৭৬ টাকা এবং তিন সিটের আপগ্রেডেশনের প্রতিজন হাজী ৪৪ হাজার ১১৯ টাকা ফেরত পেয়েছেন। চার নম্বর হোটেল মানার আল শুরুকে অবস্থানকারী প্রতিজন হাজী সাত হাজার ৪১৪ টাকা, দুই সিটের আপগ্রেডেশনের প্রতিজন হাজী পাঁচ হাজার ৬৭৫ টাকা এবং তিন সিটের আপগ্রেডেশনের প্রতিজন হাজীকে ছয় হাজার ২৪৯ টাকা ফেরত পেয়েছেন।
সাধারণ হজ প্যাকেজ-৩ এর হাজীদেরকে ৫ নম্বর বাড়ি তথা হোটেল নাম্বার ওয়ানে রাখা হয়। এই বাড়িতে পূর্ণ প্যাকেজের হাজীরা প্রত্যেকে তিন হাজার ৭১৮ টাকা ফেরত পাবেন। এই প্যাকেজে শর্ট কিংবা আপগ্রেডেশেন কোনো ব্যবস্থা ছিলো না।
২০২৬ সালে সরকারি মাধ্যমে ৪,৩৪১জন হাজীকে চার কোটি ৮৭ লক্ষ ২৩ হাজার ১৪ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। হজ প্যাকেজে বাড়িভাড়ার জন্য যে পরিমাণ টাকা ধার্য করা হয়েছিল তার চেয়ে কিছু কম মূল্যে বাড়ি ভাড়া পাওয়া এবং সার্ভিস চার্জও কিছুটা কমানো সম্ভব হওয়ায় এই টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। অব্যয়িত এই টাকা প্রাপ্যতা অনুসারে হাজীদের ব্যাংক একাউন্টে বিইএফটিএন (BEFTN) এর মাধ্যমে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
হাজীরা আল্লাহর মেহমান। সে দৃষ্টিকোণ থেকেই সরকার হাজীদের সেবা করে থাকে। সরকার হজ প্যাকেজে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি অনুসারে হাজীদের সকল সেবা নিশ্চিত করে থাকে। প্রতিশ্রুতি অনুসারে আবাসন, হজ গাইড সরবরাহ, বাড়ি বা হোটেলে সার্বক্ষণিক দক্ষ হজকর্মীর পদায়নের পাশাপাশি সকাল ৮ টা হতে রাত ১২ টা পর্যন্ত ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সকল হজযাত্রীর সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, ২৪ ঘন্টা তথ্যসেবা, হারিয়ে যাওয়া কিংবা ভুল কোনো হোটেল বা বাড়িতে নামানো হাজীদের লাগেজ পুনরুদ্ধার এবং হারিয়ে যাওয়া হাজী অনুসন্ধানের কাজ ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়ে থাকে। সরকার মক্কা ও মদিনায় পবিত্র ও ঐতিহাসিক স্থানসমূহ এবং বিভিন্ন হাসপাতালে সুদক্ষ হজকর্মী নিযুক্ত করে থাকে। এ সকল স্থানসমূহে নিয়োজিত হজকর্মীরা হাজীদের পথনির্দেশ ও চিকিৎসা সেবা পেতে সহায়তা দিয়ে থাকেন। এছাড়া, হজযাত্রীদের সেবা সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের অভিযোগ বা অনুযোগ নিষ্পত্তি এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হাজীদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের বিষয়টি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় দক্ষতার সাথে সম্পাদন করে থাকে। বিদেশের মাটিতে এরূপ সেবা যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকে হজযাত্রীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্বস্তিদায়ক।
সরকারি মাধ্যমে হজের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। হজযাত্রীদের নিকট থেকে কোনো বাড়তি টাকা নেওয়া হয়না। হজের সকল আনুষ্ঠানিকতা প্রতিপালনে হাজীদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রতিশ্রুত সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাজীদের অর্থের আমানতদারীও রক্ষা করে সরকার। হজ শেষে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে যদি কোনো টাকা অব্যয়িত থাকে সেই টাকা হাজীদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী ফেরত দেওয়া হয়। হজ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যবসায়িক কোনো উদ্দেশ্য নেই, হাজীদের সেবা প্রদানই সরকারের একমাত্র ব্রত।
সুষ্ঠু ও সাবলীল হজ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রী বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রী যত বৃদ্ধি পাবে, হজ ব্যবস্থাপনা তত উন্নত হবে, হজ ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং হজযাত্রীদের প্রতারিত হওয়ার ঘটনা হ্রাস পাবে। অধিকন্তু, সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক সেবা প্রদানের মানসিকতা তৈরি হবে। এর ফলে সার্বিক হজ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
বিশ্বের সর্বাধিক হজযাত্রী প্রেরণকারী দেশ ইন্দোনেশিয়ার ৯০ শতাংশের বেশি হজযাত্রী সরকারি তত্ত্বাবধান ও রাষ্ট্রীয় হজ ফান্ড (BPKH)-এর মাধ্যমে হজ পালন করে থাকেন। ২০২৬ সালে পাকিস্তানের হজযাত্রীদের ৬৬ শতাংশ, ভারতের ৭০ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ার শতভাগ হজযাত্রী সরকারি মাধ্যমে হজব্রত পালন করেছেন। তবে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম হজযাত্রী প্রেরণকারী দেশ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রীর সংখ্যা খুবই নগণ্য। বিগত তিন বছরে বাংলাদেশ থেকে সরকারি মাধ্যমে হজ পালন করেছেন ৭ শতাংশের মতো হাজী।
বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি হজ ব্যবস্থাপনা বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রী প্রতারিত হওয়া কিংবা অন্যকোনো নেতিবাচক ঘটনা ঘটেনি। তারপরও সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রী বাড়ছে না। এর পিছনে যে সকল কারণ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো সরকারি হজ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জনসাধারণের স্বচ্ছ ও পরিপূর্ণ ধারণা না থাকা। সামগ্রিকভাবে সরকারি সেবা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের বদ্ধমূল নেতিবাচক ধারণাও এক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক। এছাড়া, সরকারি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে গ্রাম বা মহল্লা কেন্দ্রিক বেসরকারি হজ এজেন্সির গ্রুপ লিডার বা দালালদের নেতিবাচক প্রচারণাও সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রী বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল নির্ধারণপূর্বক প্রান্তিক পর্যায়ে সরকারি মাধ্যমে হজ বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধির মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হলে এই মাধ্যমে হজযাত্রী বৃদ্ধি সময়ের ব্যাপার মাত্র।
পবিত্র হজের মতো একটি সংবেদনশীল ধর্মীয় বিষয়ে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি পদক্ষেপ। সরকারের এরূপ পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা ও সঠিক তদারকি থাকলে যেকোনো খাতের অনিয়ম দূর করে জনগণের অধিকার সুনিশ্চিত করা সম্ভব। হজের অব্যয়িত অর্থ ফেরতের এই সৎ উদ্যোগ সরকারি মাধ্যমে নিরাপদ হজের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অনন্য দৃষ্টান্ত।
-লেখক সিনিয়র তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর, ঢাকা
এমএসএম / এমএসএম
শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র: মানবপ্রেম, আত্মজাগরণ ও সুন্দর সমাজের স্বপ্ন
সরকারি হাজীদের অব্যয়িত অর্থ ফেরত: স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারি মাধ্যমে নিরাপদ হজ
মিরকাদিমের ধবল গরু: ভবিষ্যতের জিনগত সম্পদ
শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন
নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে এ্যাক্রেডিটেশনের ভূমিকা
কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
৪১ দিন থেকে ৩০ বছর—নতুন সমঝোতার অপেক্ষায় বাংলাদেশ
আজকের তরুণ প্রজন্ম আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ
মহাসাধক বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী: অলৌকিক সাধনা ও বিপন্ন মানুষের পরম আশ্রয়
শুভ জন্মাষ্টমী ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ: সম্প্রীতির আলোয় ঘুচুক অন্ধত্ব
জাতীয় সংকটে আস্থার ঠিকানা জিয়া পরিবার
বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলা: শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়া