মিরকাদিমের ধবল গরু: ভবিষ্যতের জিনগত সম্পদ
ঈদুল আজহার আগে পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জের কোরবানির হাটে ভিড় তখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি। তবু হাটের এক পাশে মানুষের কৌতূহল চোখে পড়ার মতো। ধবধবে সাদা কয়েকটি গরুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন ক্রেতারা। কেউ শরীরের গঠন দেখছেন, কেউ বয়স আন্দাজ করছেন, কেউবা শুধু তাকিয়ে আছেন মুগ্ধ হয়ে। দূর থেকে মনে হয়, ব্যস্ত হাটের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি জীবন্ত শিল্পকর্ম।
অনেকের কাছে এগুলো কেবল কোরবানির পশু নয়, বরং একটি ঐতিহ্যের অংশ। মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিমের ধবল বা স্থানীয় ভাষায় ‘হাসা’ গরু দীর্ঘদিন ধরে পুরান ঢাকা ও বিক্রমপুর অঞ্চলের বনেদি সংস্কৃতি, কৃষি ঐতিহ্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তবে একসময় আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই দেশীয় জাতটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখে। একই সঙ্গে বিজ্ঞানীদের কাছে এটি বাংলাদেশের অন্যতম মূল্যবান জিনগত সম্পদ।
বাংলাদেশের দেশীয় গবাদিপশুর ভাণ্ডারে কয়েকটি জাত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর মধ্যে রয়েছে রেড চিটাগং ক্যাটল (চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম), পাবনা ক্যাটল (পাবনা ও সিরাজগঞ্জ), নর্থ বেঙ্গল গ্রে (রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর) এবং মুন্সিগঞ্জ ক্যাটল (মুন্সিগঞ্জ ও বিক্রমপুর)। মুন্সিগঞ্জ ক্যাটলই স্থানীয়ভাবে মিরকাদিম বা হাসা গরু নামে পরিচিত। প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং উৎপাদন সম্ভাবনার কারণে এ জাতের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
মিরকাদিম গরুর উৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনামলে মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র। নদীপথে পণ্য পরিবহনের কারণে এখানে গড়ে ওঠে অসংখ্য খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। ফলে গবাদিপশুর খাদ্যের সহজলভ্যতা ছিল উল্লেখযোগ্য। একই সময়ে তৎকালীন জমিদার ও বিত্তশালী ব্যবসায়ীরা ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হরিয়ানা ও সিন্ধি জাতের অধিক দুধ উৎপাদনক্ষম গরু নিয়ে আসেন। এসব গরুর সঙ্গে স্থানীয় দেশি গরুর দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক সংকরায়ণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি জাতের বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীকালে মিরকাদিম বা হাসা গরু হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
মিরকাদিম গরুর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর স্বতন্ত্র শুভ্রতা। গায়ের চামড়া, চোখের পাপড়ি, শিং, নাকের সামনের অংশ, খুর এবং লেজের লোম পর্যন্ত সাদা বা হালকা গোলাপি আভাযুক্ত। শরীরে অন্য কোনো রঙের ছোপ সাধারণত দেখা যায় না। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যই একে দেশের অন্যান্য দেশীয় জাত থেকে আলাদা করেছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণবয়স্ক ষাঁড়ের ওজন সাধারণত ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি এবং গাভীর ওজন ২০০ থেকে ২৫০ কেজির মধ্যে থাকে। বৃহৎ আকারের ষাঁড়ের ওজন ৫০০ থেকে ৭০০ কেজি এবং গাভীর ওজন ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া, মৌসুমি বন্যা, সীমিত খাদ্য এবং স্থানীয় রোগবালাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অভিযোজন এ জাতকে বিশেষ সক্ষমতা দিয়েছে। গবেষকদের মতে, খাদ্য ব্যবহার দক্ষতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সামর্থ্য এ জাতের অন্যতম শক্তি।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) গবেষণায় দেখা গেছে, মিরকাদিম গাভির গড় দৈনিক দুধ উৎপাদন ৩ থেকে ৪ কেজি। একটি দুধ উৎপাদন চক্রে মোট উৎপাদন প্রায় ৬১২ কেজি এবং দুধ উৎপাদনকাল সাধারণত ১৮৭ থেকে ২২০ দিন স্থায়ী হয়। দুধের পুষ্টিমানও উল্লেখযোগ্য। এতে চর্বির পরিমাণ ৫.৯ থেকে ৬.০ শতাংশ, প্রোটিন ৩.২ থেকে ৩.৫ শতাংশ এবং ল্যাকটোজ ৪.৭ থেকে ৪.৯ শতাংশের মধ্যে থাকে। খাদ্য ও পরিচর্যার তারতম্যে এসব উপাদানের পরিমাণ কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। উচ্চ চর্বি ও পুষ্টিমানসম্পন্ন হওয়ায় এ দুধ স্থানীয়ভাবে বেশ সমাদৃত।
প্রজনন দক্ষতার ক্ষেত্রেও এ জাতের গরু উল্লেখযোগ্য। গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, গাভীর প্রথম গরম হওয়ার বয়স সাধারণত ২০ থেকে ২৪ মাস। বয়ঃসন্ধিকাল ও প্রথম বাছুর প্রদানের বয়স ৩.০ থেকে ৩.৫ বছর। গর্ভধারণকাল গড়ে ২৭৯ দিন এবং প্রসবোত্তর পুনরায় গরম হওয়ার সময় ৬০ থেকে ৭০ দিন। পরপর দুটি বাছুর প্রদানের মধ্যবর্তী ব্যবধান সাধারণত ১২ থেকে ১৩ মাস। প্রতি গর্ভধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সেবার সংখ্যা ১.৩ থেকে ১.৫৮, যা ভালো প্রজনন সক্ষমতার নির্দেশক। জন্মের সময় বাছুরের ওজন সাধারণত ১৫ থেকে ২০ কেজি হয় এবং মাঠপর্যায়ে বাছুরের বেঁচে থাকার হারও সন্তোষজনক।
মিরকাদিম গরুর মাংস দীর্ঘদিন ধরেই সুস্বাদু ও কোমল হিসেবে পরিচিত। জিনোম গবেষণা এ ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও তুলে ধরেছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি (এনআইবি) ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো মিরকাদিম গরু, দেশি ভেড়া ও হাঁসের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন করে। গবেষণায় মিরকাদিম গরুর জিনোমের দৈর্ঘ্য ২২৩ কোটি ৪৫ লাখ ৩২ হাজার ৮৫৬ জোড়া নিউক্লিওটাইড শনাক্ত করা হয়। গবেষকেরা জানান, এ জাতের সঙ্গে ভারতের জেবু জাতের গরুর জিনগত মিল রয়েছে। জিনোম বিশ্লেষণে মাংস উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জিন শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মায়োস্ট্যাটিন, ক্যালপাস্টাটিন, আইজিএফ-১, অ্যাডিপোনেকটিন এবং লেপটিন। এসব জিন পেশি বৃদ্ধি, মাংসের কোমলতা, বৃদ্ধি ও বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষকদের মতে, এ বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতে উন্নতমানের দেশীয় মাংস উৎপাদন এবং প্রিমিয়াম বিফ ব্র্যান্ড বিকাশে সহায়ক হতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে বড় সংকট। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, মুন্সিগঞ্জ জেলায় ৬ হাজারের বেশি গরু পালনকারী কৃষক এবং ৮১ হাজার ৮৭৫টি কোরবানিযোগ্য গরু থাকলেও ঐতিহ্যবাহী সাদা গরুর সংখ্যা ছিল মাত্র প্রায় ২০০টি। নগরায়ন, খরা, চারণভূমি সংকোচন এবং পশুখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ জাতের গরু পালন ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। অন্যদিকে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি ও অধিক মাংস উৎপাদনের কারণে ক্রসব্রিড ও বিদেশি জাতের গরুর চাহিদা বাড়ায় দেশীয় সাদা গরু উপেক্ষিত হচ্ছে।
গবেষকেরা বলছে, সবচেয়ে বড় হুমকি এসেছে অনিয়ন্ত্রিত সংকরায়নের মাধ্যমে। বিদেশি ও উচ্চ উৎপাদনশীল জাতের গরুর সঙ্গে দীর্ঘদিনের নির্বিচার সংকরায়ণের ফলে বিশুদ্ধ মিরকাদিম জাতের সংখ্যা দ্রুত কমে গেছে। এর ফলে জিনগত বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জাতটি সংরক্ষণে কাজ করছে। কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার, সাভারে বর্তমানে ৮৪টি বিশুদ্ধ মিরকাদিম গরু সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি গাভী, ১৩টি বকনা, ১৪টি বকনা বাছুর, ৯টি এঁড়ে বাছুর এবং ১১টি ষাঁড় ও এঁড়ে রয়েছে। অন্যদিকে বিএলআরআইতে ৬০টি মিরকাদিম গরু সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২২টি গাভী, ৪টি বকনা, ১০টি বকনা বাছুর, ৮টি এঁড়ে বাছুর, ১৩টি ষাঁড় এবং ৩টি বাড়ন্ত এঁড়ে ষাঁড়। বিশুদ্ধ ষাঁড় থেকে ফ্রোজেন সিমেন উৎপাদন, কৃত্রিম প্রজনন এবং মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।
বিএলআরআই ২০১৪ সাল থেকে এ জাতের সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বৈশিষ্ট্যায়ন ও উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গবেষণা পরিচালনা করছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন মেয়াদে ‘মিরকাদিম গরুর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন গবেষণা’ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘দেশীয় গরুর জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক আরেকটি প্রকল্পও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজিত প্রাণিসম্পদের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উন্নত মাংস উৎপাদন, পুষ্টিমানসম্পন্ন দুধ, ভালো প্রজনন ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা এবং অনন্য জিনগত বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে মিরকাদিম গরু বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতের ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। যথাযথ গবেষণা, বিশুদ্ধ প্রজনন, খামারিদের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে মিরকাদিমের ধবল গরু শুধু অতীতের ঐতিহ্য হিসেবেই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি মূল্যবান জিনগত সম্পদ হিসেবে টিকে থাকবে।
এমএসএম / এমএসএম
শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র: মানবপ্রেম, আত্মজাগরণ ও সুন্দর সমাজের স্বপ্ন
সরকারি হাজীদের অব্যয়িত অর্থ ফেরত: স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারি মাধ্যমে নিরাপদ হজ
মিরকাদিমের ধবল গরু: ভবিষ্যতের জিনগত সম্পদ
শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন
নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে এ্যাক্রেডিটেশনের ভূমিকা
কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
৪১ দিন থেকে ৩০ বছর—নতুন সমঝোতার অপেক্ষায় বাংলাদেশ
আজকের তরুণ প্রজন্ম আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ
মহাসাধক বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী: অলৌকিক সাধনা ও বিপন্ন মানুষের পরম আশ্রয়
শুভ জন্মাষ্টমী ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ: সম্প্রীতির আলোয় ঘুচুক অন্ধত্ব
জাতীয় সংকটে আস্থার ঠিকানা জিয়া পরিবার
বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলা: শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়া