পে-স্কেল:
১৪ লাখের বেতন বাড়বে, ১৭ কোটি মানুষের কী হবে?
একটি রাষ্ট্রের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি রাষ্ট্রের দর্শনেরও প্রতিফলন। সরকার কোথায় কত টাকা খরচ করছে, সেটি দেখলেই বোঝা যায়-রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কোন শ্রেণিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে নতুন পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা চলছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮,০০০ টাকা থেকে ১,৬০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ ৬৪ হাজার। তাদের বেতন-ভাতা ও পেনশনসহ সরকারের বার্ষিক ব্যয় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি। এখানে মূল প্রশ্ন হলো-রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার কোথায় হবে? বাংলাদেশের শ্রমবাজারের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী দেশে প্রায় ৭ কোটি ১৭ লাখ মানুষ কর্মরত। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে যুক্ত, যা মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় অংশ কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, গৃহকর্মী, নির্মাণশ্রমি
পে-স্কেলের টাকা আসবে কোথা থেকে?
সরকারের কাছে আলাদা কোনো টাকা নেই-সরকারের টাকা মূলত জনগণের টাকা। কর, ভ্যাট, শুল্ক, রাষ্ট্রীয় আয় এবং ঋণের মাধ্যমে সরকার অর্থ সংগ্রহ করে। সুতরাং সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো মানে রাষ্ট্রের নিয়মিত ব্যয় বৃদ্ধি। এই ব্যয় যদি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে তা অর্থনীতির জন্য সমস্যা নয়। সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে তাদের ভোগ বাড়বে, বাজারে চাহিদা বাড়বে এবং কিছুটা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়তে পারে। কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন বেতন বাড়ে অথচ উৎপাদন বাড়ে না। একটি সহজ উদাহরণ—ধরা যাক, একটি পরিবারে আয় বাড়ল ২০ শতাংশ, কিন্তু পরিবারের আয় করার সক্ষমতা বাড়ল না। তখন যদি সেই পরিবার ধার করে বাড়তি খরচ করে, একসময় ঋণের বোঝা বাড়ে।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা একই। সরকারি বেতন বাড়ানো হলো, কিন্তু রাজস্ব আয় বাড়ল না; উৎপাদনশীলতা বাড়ল না; করের ভিত্তি বাড়ল না; সরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ল না। তাহলে বাড়তি অর্থ কোথা থেকে আসবে? শেষ পর্যন্ত হয় কর বাড়াতে হবে, নয়তো ঋণ নিতে হবে, অথবা অন্য খাতের ব্যয় সংকুচিত করতে হবে।
পে-স্কেল কি দুর্নীতি কমাবে?
পে-স্কেলের পক্ষে সবচেয়ে প্রচলিত যুক্তিগুলোর একটি হলো, বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে। এ যুক্তির কিছু ভিত্তি আছে। খুব কম বেতন পেলে একজন কর্মচারীর জীবনযাত্রা কঠিন হতে পারে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা যায় না। কারণ দুর্নীতির সঙ্গে শুধু বেতনের সম্পর্ক নেই। এর সঙ্গে যুক্ত আছে ক্ষমতা, জবাবদিহি, শাস্তির নিশ্চয়তা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রভাব, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের সুযোগ। কোনো কর্মকর্তার বেতন ৫০ হাজার টাকা থেকে ৮০ হাজার টাকা হলো বলেই তিনি ঘুষ নেওয়া বন্ধ করবেন, এমন নিশ্চয়তা অর্থনীতিতে নেই। বরং দুর্নীতি কমানোর কার্যকর সূত্র হওয়া উচিত: ন্যায্য বেতন + কঠোর জবাবদিহি + সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব + নিশ্চিত শাস্তি + ডিজিটাল সেবা + রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কমানো। এই পাঁচ-ছয়টি ব্যবস্থা ছাড়া শুধু বেতন বাড়ানো অনেকটা তালা না লাগিয়ে পাহারাদারের বেতন বাড়ানোর মতো।
সবচেয়ে বড় সমস্যা বেকারত্ব নয়, মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব
বাংলাদেশে বেকারত্বের সরকারি হার ২০২৪ সালে ৩.৬৬ শতাংশ ছিল। কিন্তু এই সংখ্যাটি দিয়ে দেশের শ্রমবাজারের পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না। কারণ একজন মানুষ কোনোভাবে কাজ করছেন মানেই তিনি অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ, এমন নয়। যে মানুষটি দিনে কয়েক ঘণ্টা কাজ করেন, কিন্তু পর্যাপ্ত আয় করেন না, তিনিও কর্মরত হিসেবে গণ্য হতে পারেন। যে শিক্ষিত তরুণ নিজের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ না পেয়ে সামান্য আয়ের কাজে যুক্ত হয়েছেন, তিনিও কর্মরত। তাই বাংলাদেশের প্রকৃত সমস্যা শুধু 'বেকার কত' নয়। প্রশ্ন হলো:কতজন মানুষ উৎপাদনশীল, নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানে আছেন? এই জায়গায় বাংলাদেশ এখনো দুর্বল।
রাষ্ট্রের চাকরি কি রাষ্ট্রের মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্ন।রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী রাষ্ট্রের সেবক। কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। অতএব সরকারি কর্মচারীদের ভালো রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু তাদের ভালো রাখতে গিয়ে যদি রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে মূল্যস্ফীতি, অতিরিক্ত কর, ঋণের বোঝা কিংবা কম উন্নয়ন ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সেই নীতি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। একটি দেশের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়ে, শ্রমিকের মজুরি বাড়ে, বেসরকারি চাকরির সুযোগ বাড়ে, উদ্যোক্তা তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। শুধু একটি শ্রেণির আয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা যায় না।
পে-স্কেল হওয়া উচিত, তবে শর্তসাপেক্ষে-
আমার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ হলো, সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন দেওয়া উচিত। কিন্তু নতুন পে-স্কেলকে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ করতে হবে। প্রথমত, পে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিপরীতে সরকারের স্থায়ী রাজস্ব পরিকল্পনা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন যুক্ত করা দরকার।তৃতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিশ্চিত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প ব্যয়ে অপচয় কমাতে হবে। পঞ্চমত, অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। ষষ্ঠত, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে।সপ্তমত, তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরিকে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতির প্রধান অগ্রাধিকার করতে হবে।
শেষ কথা:
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়, তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষ। কৃষক থেকে শ্রমিক, শিক্ষক থেকে উদ্যোক্তা, রিকশাচালক থেকে প্রকৌশলী, সরকারি কর্মচারী থেকে বেসরকারি চাকরিজীবী, সবার সম্মিলিত শ্রমেই রাষ্ট্রের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে।তাই পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, "সরকারি কর্মচারীরা কত টাকা পাবেন?" প্রশ্ন হওয়া উচিত: "এই বেতন বাড়ানোর পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কী পাবে?" যদি সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ে, কিন্তু কৃষকের আয় না বাড়ে; শ্রমিকের মজুরি না বাড়ে; বেসরকারি চাকরি না বাড়ে; তরুণদের কর্মসংস্থান না হয়; দুর্নীতি না কমে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তেই থাকে, তাহলে সেটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সংস্কার নয়। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করার পাশাপাশি যদি রাষ্ট্র উৎপাদন বাড়ায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, করের আওতা বাড়ায়, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়াতে পারে, তাহলে পে-স্কেল অর্থনীতির জন্য বোঝা নয়, বরং মানবসম্পদে বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে। রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ধারিত হবে সরকারি কর্মচারীর বেতন দিয়ে নয়।রাষ্ট্র কতজন মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পেরেছে, সেটিই হবে উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য নয়।রাষ্ট্র মানুষের জন্য।
এমএসএম / এমএসএম
ইস্টার্ন রিফাইনারি: ৮ হাজার কোটি থেকে ৩৫ হাজার কোটি—দেড় যুগের অপেক্ষার মূল্য আর কত?
১৪ লাখের বেতন বাড়বে, ১৭ কোটি মানুষের কী হবে?
দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও অধিকার আদায়ের আলোকবর্তিকা: বীরউত্তম মেজর জেনারেল সি আর দত্ত
শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আমন্ত্রণ: সম্প্রীতির নতুন সুরে ঢাকা–দিল্লির ভূ-কৌশলগত সমীকরণ
জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি
শিক্ষানীতির বড় ঘাটতি হচ্ছে ব্যবস্থাপনা
বেগম খালেদা জিয়া : সাহস, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি
স্মরণে গোলাম সারওয়ার: আদর্শ সাংবাদিকতার এক অনির্বাণ শিখা
বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, বিদ্যুৎ নেই: বাংলাদেশের লোডশেডিং সংকটের আসল কারণ কোথায়?
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দেশের স্বার্থে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে