ঢাকা শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

পে-স্কেল:

১৪ লাখের বেতন বাড়বে, ১৭ কোটি মানুষের কী হবে?


নজরুল ইসলাম photo নজরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ২৯-৮-২০২৬ দুপুর ১:৩

একটি রাষ্ট্রের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়এটি রাষ্ট্রের দর্শনেরও প্রতিফলন। সরকার কোথায় কত টাকা খরচ করছেসেটি দেখলেই বোঝা যায়-রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কোন শ্রেণিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে নতুন পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা চলছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮,০০০ টাকা থেকে ১,৬০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ ৬৪ হাজার। তাদের বেতন-ভাতা ও পেনশনসহ সরকারের বার্ষিক ব্যয় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি। এখানে মূল প্রশ্ন হলো-রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার কোথায় হবেবাংলাদেশের শ্রমবাজারের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী দেশে প্রায় ৭ কোটি ১৭ লাখ মানুষ কর্মরত। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে যুক্তযা মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় অংশ কৃষকশ্রমিকক্ষুদ্র ব্যবসায়ীপরিবহন শ্রমিকগৃহকর্মীনির্মাণশ্রমিক কিংবা স্বনিয়োজিত মানুষ। তাদের অধিকাংশের চাকরির নিরাপত্তা নেইনিয়মিত ইনক্রিমেন্ট নেইপেনশন নেইঅবসরকালীন নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে সরকারি চাকরিতে রয়েছেন প্রায় ১৪ লাখ ৬৪ হাজার মানুষ। অর্থাৎ বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একদিকে রয়েছে বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাতঅন্যদিকে তুলনামূলক ছোট সরকারি চাকরিজীবী শ্রেণি। এখানে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তারাও রাষ্ট্রের নাগরিক এবং ন্যায্য বেতন পাওয়ার অধিকার তাদেরও আছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যদি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন না দেওয়া হয়তাহলে তার জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। দক্ষ ও সৎ জনবল ধরে রাখার জন্যও ন্যায্য বেতন প্রয়োজন। তবেএকই রাষ্ট্রের একজন দিনমজুর যখন প্রতিদিন কাজের নিশ্চয়তা পান নাএকজন কৃষক যখন উৎপাদন খরচ তুলতে পারেন নাএকজন বেসরকারি চাকরিজীবী যখন চাকরি হারানোর আতঙ্কে থাকেন-তখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে তাদের অবস্থান কোথায়এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

পে-স্কেলের টাকা আসবে কোথা থেকে?

সরকারের কাছে আলাদা কোনো টাকা নেই-সরকারের টাকা মূলত জনগণের টাকা। করভ্যাটশুল্করাষ্ট্রীয় আয় এবং ঋণের মাধ্যমে সরকার অর্থ সংগ্রহ করে। সুতরাং সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো মানে রাষ্ট্রের নিয়মিত ব্যয় বৃদ্ধি। এই ব্যয় যদি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়তাহলে তা অর্থনীতির জন্য সমস্যা নয়। সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে তাদের ভোগ বাড়বেবাজারে চাহিদা বাড়বে এবং কিছুটা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়তে পারে। কিন্তু সমস্যা তখনই হয়যখন বেতন বাড়ে অথচ উৎপাদন বাড়ে না। একটি সহজ উদাহরণধরা যাকএকটি পরিবারে আয় বাড়ল ২০ শতাংশকিন্তু পরিবারের আয় করার সক্ষমতা বাড়ল না। তখন যদি সেই পরিবার ধার করে বাড়তি খরচ করেএকসময় ঋণের বোঝা বাড়ে।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা একই। সরকারি বেতন বাড়ানো হলোকিন্তু রাজস্ব আয় বাড়ল নাউৎপাদনশীলতা বাড়ল নাকরের ভিত্তি বাড়ল নাসরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ল না। তাহলে বাড়তি অর্থ কোথা থেকে আসবেশেষ পর্যন্ত হয় কর বাড়াতে হবেনয়তো ঋণ নিতে হবেঅথবা অন্য খাতের ব্যয় সংকুচিত করতে হবে।

পে-স্কেল কি দুর্নীতি কমাবে?

পে-স্কেলের পক্ষে সবচেয়ে প্রচলিত যুক্তিগুলোর একটি হলোবেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে। এ যুক্তির কিছু ভিত্তি আছে। খুব কম বেতন পেলে একজন কর্মচারীর জীবনযাত্রা কঠিন হতে পারে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলেশুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা যায় না। কারণ দুর্নীতির সঙ্গে শুধু বেতনের সম্পর্ক নেই। এর সঙ্গে যুক্ত আছে ক্ষমতাজবাবদিহিশাস্তির নিশ্চয়তাপ্রশাসনিক সংস্কৃতিরাজনৈতিক প্রভাবসরকারি ক্রয়ব্যবস্থা এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের সুযোগ। কোনো কর্মকর্তার বেতন ৫০ হাজার টাকা থেকে ৮০ হাজার টাকা হলো বলেই তিনি ঘুষ নেওয়া বন্ধ করবেনএমন নিশ্চয়তা অর্থনীতিতে নেই। বরং দুর্নীতি কমানোর কার্যকর সূত্র হওয়া উচিত: ন্যায্য বেতন + কঠোর জবাবদিহি + সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব + নিশ্চিত শাস্তি + ডিজিটাল সেবা + রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কমানো। এই পাঁচ-ছয়টি ব্যবস্থা ছাড়া শুধু বেতন বাড়ানো অনেকটা তালা না লাগিয়ে পাহারাদারের বেতন বাড়ানোর মতো।

সবচেয়ে বড় সমস্যা বেকারত্ব নয়মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব

বাংলাদেশে বেকারত্বের সরকারি হার ২০২৪ সালে ৩.৬৬ শতাংশ ছিল। কিন্তু এই সংখ্যাটি দিয়ে দেশের শ্রমবাজারের পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না। কারণ একজন মানুষ কোনোভাবে কাজ করছেন মানেই তিনি অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদএমন নয়। যে মানুষটি দিনে কয়েক ঘণ্টা কাজ করেনকিন্তু পর্যাপ্ত আয় করেন নাতিনিও কর্মরত হিসেবে গণ্য হতে পারেন। যে শিক্ষিত তরুণ নিজের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ না পেয়ে সামান্য আয়ের কাজে যুক্ত হয়েছেনতিনিও কর্মরত। তাই বাংলাদেশের প্রকৃত সমস্যা শুধু 'বেকার কতনয়। প্রশ্ন হলো:কতজন মানুষ উৎপাদনশীলনিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানে আছেনএই জায়গায় বাংলাদেশ এখনো দুর্বল।

রাষ্ট্রের চাকরি কি রাষ্ট্রের মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্ন।রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী রাষ্ট্রের সেবক। কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। অতএব সরকারি কর্মচারীদের ভালো রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু তাদের ভালো রাখতে গিয়ে যদি রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে মূল্যস্ফীতিঅতিরিক্ত করঋণের বোঝা কিংবা কম উন্নয়ন ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়তাহলে সেই নীতি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। একটি দেশের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়যখন সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়েশ্রমিকের মজুরি বাড়েবেসরকারি চাকরির সুযোগ বাড়েউদ্যোক্তা তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। শুধু একটি শ্রেণির আয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা যায় না।

পে-স্কেল হওয়া উচিততবে শর্তসাপেক্ষে-

আমার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ হলোসরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন দেওয়া উচিত। কিন্তু নতুন পে-স্কেলকে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ করতে হবে। প্রথমতপে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিপরীতে সরকারের স্থায়ী রাজস্ব পরিকল্পনা থাকতে হবে। দ্বিতীয়তসরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন যুক্ত করা দরকার।তৃতীয়তদুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিশ্চিত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থতসরকারি ক্রয় ও প্রকল্প ব্যয়ে অপচয় কমাতে হবে। পঞ্চমতঅনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। ষষ্ঠতবেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে।সপ্তমততরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরিকে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতির প্রধান অগ্রাধিকার করতে হবে।

শেষ কথা:

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষ কৃষক থেকে শ্রমিকশিক্ষক থেকে উদ্যোক্তারিকশাচালক থেকে প্রকৌশলীসরকারি কর্মচারী থেকে বেসরকারি চাকরিজীবীসবার সম্মিলিত শ্রমেই রাষ্ট্রের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে।তাই পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, "সরকারি কর্মচারীরা কত টাকা পাবেন?" প্রশ্ন হওয়া উচিত: "এই বেতন বাড়ানোর পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কী পাবে?" যদি সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়েকিন্তু কৃষকের আয় না বাড়েশ্রমিকের মজুরি না বাড়েবেসরকারি চাকরি না বাড়েতরুণদের কর্মসংস্থান না হয়দুর্নীতি না কমে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তেই থাকেতাহলে সেটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সংস্কার নয়। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করার পাশাপাশি যদি রাষ্ট্র উৎপাদন বাড়ায়কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেকরের আওতা বাড়ায়দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়াতে পারেতাহলে পে-স্কেল অর্থনীতির জন্য বোঝা নয়বরং মানবসম্পদে বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে। রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ধারিত হবে সরকারি কর্মচারীর বেতন দিয়ে নয়।রাষ্ট্র কতজন মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পেরেছেসেটিই হবে উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য নয়।রাষ্ট্র মানুষের জন্য।

এমএসএম / এমএসএম

ইস্টার্ন রিফাইনারি: ৮ হাজার কোটি থেকে ৩৫ হাজার কোটি—দেড় যুগের অপেক্ষার মূল্য আর কত?

১৪ লাখের বেতন বাড়বে, ১৭ কোটি মানুষের কী হবে?

দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও অধিকার আদায়ের আলোকবর্তিকা: বীরউত্তম মেজর জেনারেল সি আর দত্ত

শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আমন্ত্রণ: সম্প্রীতির নতুন সুরে ঢাকা–দিল্লির ভূ-কৌশলগত সমীকরণ

জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি

শিক্ষানীতির বড় ঘাটতি হচ্ছে ব্যবস্থাপনা

বেগম খালেদা জিয়া : সাহস, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি

স্মরণে গোলাম সারওয়ার: আদর্শ সাংবাদিকতার এক অনির্বাণ শিখা

বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, বিদ্যুৎ নেই: বাংলাদেশের লোডশেডিং সংকটের আসল কারণ কোথায়?

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দেশের স্বার্থে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে

সমুদ্রের সম্পদ থেকে শিল্পায়ন: মাতারবাড়ী–মীরসরাই করিডোরে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত