বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, বিদ্যুৎ নেই: বাংলাদেশের লোডশেডিং সংকটের আসল কারণ কোথায়?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগস্টের মাঝামাঝি এসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সরকার শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
১৩ আগস্ট ২০২৬-এর পরিস্থিতিতে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—দেশে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও বাংলাদেশ কেন বারবার লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা কিংবা স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতার হিসাবে পাওয়া যাবে না। বর্তমান সংকট বুঝতে হলে একই সঙ্গে দেখতে হবে জ্বালানি সরবরাহ, দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি, আমদানিকৃত এলএনজি, কয়লা ও তরল জ্বালানির প্রাপ্যতা, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক দায় ও বকেয়া, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থার সামগ্রিক দক্ষতা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (BPDB) জুন ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৭,৫১৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক সক্ষমতা ১২,১৯৪ মেগাওয়াট বা ৪৪.৩২ শতাংশ, কয়লাভিত্তিক ৬,৬০৪ মেগাওয়াট বা ২৪ শতাংশ এবং HFO-ভিত্তিক ৬,৪৪২ মেগাওয়াট বা ২৩.৪১ শতাংশ। একই হিসাবে আমদানিকৃত বিদ্যুতের সক্ষমতা ১,১৬০ মেগাওয়াট, সৌরবিদ্যুৎ ৫৩৫ মেগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুৎ প্রায় ৬০ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সমস্যা এখন শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বা স্থাপিত সক্ষমতার ঘাটতি নয়। বড় প্রশ্ন হলো—এই সক্ষমতার কতটুকু প্রয়োজনের সময় বাস্তবে উৎপাদনে আনা যাচ্ছে?
স্থাপিত সক্ষমতা আর নির্ভরযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা এক বিষয় নয়।
পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা বা তরল জ্বালানি না থাকলে একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব নয়। একইভাবে রক্ষণাবেক্ষণ, যান্ত্রিক ত্রুটি, সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা কিংবা অর্থের অভাবে জ্বালানি সংগ্রহ করতে না পারলেও কাগজে থাকা মেগাওয়াট বাস্তবে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয় না।
এ কারণেই বিদ্যুৎ খাতের প্রকৃত সক্ষমতা বিচার করতে হলে শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে তা নয়; বরং প্রয়োজনের সময় কত মেগাওয়াট নির্ভরযোগ্যভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে—সেটিই হওয়া উচিত মূল সূচক।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি পর্যায়ে পৌঁছানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য লোডশেডিংয়ের খবর এসেছে। পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, এটি শুধু গরমের কারণে সাময়িকভাবে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সমস্যা নয়; বরং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাও এর মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে।
গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহই বড় তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় একক জ্বালানি এখনো গ্যাস। BPDB-এর হিসাবে মোট স্থাপিত সক্ষমতার ৪৪ শতাংশের বেশি গ্যাসভিত্তিক। ফলে গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তার প্রভাব পড়া অবশ্যম্ভাবী।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ প্রায় ২.৭ বিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে প্রায় ১.১ বিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক ব্যবধান রয়েছে।
এই সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আবার আমদানিকৃত LNG থেকে আসে। অর্থাৎ বাংলাদেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা এখন আন্তর্জাতিক LNG বাজার, বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা এবং আমদানি অবকাঠামোর কার্যক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন পর্যাপ্ত হারে বাড়ছে না, অন্যদিকে বিদ্যুৎ, শিল্প, সার কারখানা ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। ফলে LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক LNG মূল্য বেড়ে গেলে, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ তৈরি হলে কিংবা FSRU বা LNG টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব দ্রুত জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে এসে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে LNG অবকাঠামোর একটি অংশে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার পর গ্যাস সরবরাহে চাপ বেড়েছে এবং এর প্রভাব বিদ্যুৎ ও শিল্প—উভয় খাতেই পড়েছে।
এখানে শিক্ষা অত্যন্ত পরিষ্কার—জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।
বিদ্যুতের সংকটের সঙ্গে অর্থের সংকটও জড়িত
বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সক্ষমতা।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি কিনতে হয়, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা পরিশোধ করতে হয় এবং আমদানিকৃত বিদ্যুৎ, LNG, কয়লা ও তেলের মূল্য বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়।
ফলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অঙ্কের বকেয়া তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ে।
এই আর্থিক চক্রটি খুব সহজ—অর্থের ঘাটতি হলে জ্বালানি কেনা কঠিন হয়; জ্বালানি না থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চলে না; আর বিদ্যুৎকেন্দ্র না চললে স্থাপিত হাজার হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বাস্তব সুফল পাওয়া যায় না।
তাই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু প্রকৌশলগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সামষ্টিক অর্থনীতির বিষয়।
নতুন কেন্দ্রের আগে বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিকে না ছুটে বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
BPDB-এর জুন ২০২৬-এর হিসাবে স্থাপিত সক্ষমতা ২৭,৫১৫ মেগাওয়াট, অথচ derated বা কার্যকর সক্ষমতা প্রায় ২৬,৩৬৪ মেগাওয়াট। বাস্তবে জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে এরও পুরোটা একই সময়ে উৎপাদনে পাওয়া যায় না।
যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানির অভাব, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা পরিচালনগত কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না, সেগুলোর সমস্যা কেন্দ্রভিত্তিকভাবে চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করতে হবে।
একই সঙ্গে কোন কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কত খরচ হচ্ছে, কোন কেন্দ্র বেশি দক্ষ এবং কোন কেন্দ্রকে আগে চালানো অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক—তার ভিত্তিতে একটি স্বচ্ছ Merit Order Dispatch ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
লক্ষ্য হওয়া উচিত—কম খরচে সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে
দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের বিকল্প নেই।
স্থলভাগে নতুন অনুসন্ধান, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এবং বঙ্গোপসাগরে অফশোর অনুসন্ধান—তিনটিই একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
বাংলাদেশ যদি নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে পারে, তাহলে LNG আমদানির ওপর চাপ কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন কমবে এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে তুলনামূলক স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে।
তবে শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভর করেও ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাস সীমিত এবং আমদানিকৃত জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজার, ভূরাজনীতি, পরিবহন ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।
তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি বৈচিত্র্যময় ও ভারসাম্যপূর্ণ Energy Mix।
সৌরবিদ্যুৎ: সম্ভাবনা আছে, কিন্তু পথ অনেক বাকি
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভূমিকা দ্রুত বাড়ানো জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের জুলাই ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের Scaling Up Renewable Energy Project-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে ৩৩৮ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জাতীয় গ্রিডে মোট বিদ্যুৎ সরবরাহে নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ এখনো প্রায় ১.৫ শতাংশ।
অর্থাৎ সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু বর্তমান অবদান এখনো খুবই সীমিত।
বাংলাদেশের মতো ভূমিসংকটপূর্ণ দেশে তাই শুধু বড় জমিনির্ভর সৌর প্রকল্প নয়, Rooftop Solar-কে জাতীয় কর্মসূচির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
সরকারি ভবন, গার্মেন্টস ও শিল্পকারখানা, গুদাম, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, শপিংমল এবং বড় বাণিজ্যিক ভবনের অব্যবহৃত ছাদ ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে Floating Solar + BESS হতে পারে নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশে বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উপযোগী অব্যবহৃত জমির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাই ভূমিনির্ভর সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিস্তৃত নদী, জলাশয়, হাওর, খাল-বিল এবং উপযোগী জলাধারকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে আধুনিক Floating Solar Power Plant গড়ে তোলার সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে এ ক্ষেত্রে পরিবেশ, নৌপথ, মৎস্যসম্পদ, পানির ব্যবহার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। সব নদী বা জলাশয় নয়—কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করেই প্রকল্প নিতে হবে।
নির্বাচিত জলাশয়ে Floating Solar + Battery Energy Storage System (BESS) সমন্বিত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে সীমিত ভূমির ওপর চাপ না বাড়িয়েই উল্লেখযোগ্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব।
দিনের সৌরবিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে সন্ধ্যার পিক আওয়ার কিংবা জরুরি সময়ে গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক পিকিং বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতাও ধীরে ধীরে হ্রাস করা সম্ভব হবে।
সুতরাং Solar + BESS শুধু একটি নতুন প্রযুক্তি নয়; এটি ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ সরবরাহের বড় ধরনের বিঘ্ন মোকাবিলায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে।
Private-Sector Investment + Uniform Tariff + One-Stop Service
এই বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারকে প্রতিটি প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করতে হবে—এমন নয়।
বরং দেশি-বিদেশি বেসরকারি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক, বিনিয়োগবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিকাঠামো তৈরি করে Floating Solar, Rooftop Solar এবং BESS প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
একই ধরনের ও সমপর্যায়ের প্রকল্পের জন্য স্বচ্ছ, পূর্বনির্ধারিত এবং সমতাভিত্তিক Uniform Tariff Framework অথবা প্রতিযোগিতামূলক benchmark tariff methodology থাকলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়বে, প্রকল্প মূল্যায়ন সহজ হবে এবং ট্যারিফ নির্ধারণে অস্বচ্ছতা ও দীর্ঘসূত্রতা কমানো সম্ভব হবে।
এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সরকার একটি কার্যকর “Renewable Energy One-Stop Service” চালু করতে পারে।
একজন উদ্যোক্তাকে যাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়, সেজন্য প্রকল্প নিবন্ধন, জমি বা উপযুক্ত জলাশয় ব্যবহারের অনুমতি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, গ্রিড সংযোগ, Power Purchase Agreement (PPA), ট্যারিফ অনুমোদন, বিনিয়োগ নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি অনুমোদন একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বিশেষ প্রকল্পে স্বচ্ছ DPM Framework বিবেচনা করা যেতে পারে
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত সক্ষমতা সংযোজন প্রয়োজন হলে বিশেষায়িত, উদ্ভাবনী, technology-specific কিংবা জরুরি জাতীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, সরকারি ক্রয়বিধি ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন অনুসরণ করে Direct Procurement Method (DPM) Framework-এর উপযুক্ত ব্যবহার বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে DPM মানেই প্রতিযোগিতা, মূল্য যাচাই বা জবাবদিহি বাদ দেওয়া নয়।
বরং DPM-এর আওতায় কোনো renewable energy প্রকল্প নেওয়া হলে তার প্রযুক্তিগত যোগ্যতা, benchmark tariff, প্রকল্প ব্যয়, বিনিয়োগকারীর আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা, নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নের সামর্থ্য, payment security এবং value for money স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে যাচাই করা জরুরি।
একটি কার্যকর Private-Sector Investment + Uniform Tariff Framework + Renewable Energy One-Stop Service + প্রয়োজনে আইনসম্মত ও স্বচ্ছ DPM Framework তৈরি করা গেলে সরকারকে প্রতিটি প্রকল্পে সরাসরি মূলধন বিনিয়োগ না করেও দেশি-বিদেশি অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে।
এর সঙ্গে ব্যাংকযোগ্য PPA, নির্ভরযোগ্য payment security এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে Floating Solar + BESS-সহ বৃহৎ নবায়নযোগ্য প্রকল্প বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তার একটি নতুন স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।
আধুনিক জাতীয় গ্রিড ছাড়া সমাধান অসম্পূর্ণ
শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে।
সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা, সাবস্টেশনের সক্ষমতা কিংবা গ্রিডের কারিগরি দুর্বলতার কারণে উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো অঞ্চলে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
তাই নতুন সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশনের পাশাপাশি আধুনিক Grid Management System, automation, smart metering এবং ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ renewable energy ও battery storage গ্রহণের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
চাহিদা ব্যবস্থাপনাও সমাধানের অংশ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আরেকটি বড় পরিবর্তন প্রয়োজন—Demand-Side Management।
সব গ্রাহককে একই সময়ে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হবে—এমন নয়। বড় শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের অফ-পিক সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে।
Time-of-Use Tariff কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
তবে শিল্প খাতে এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সময় উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা, রপ্তানি সময়সূচি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য দোকানপাট, মার্কেট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার মতো ব্যবস্থা জরুরি পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এটিকে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ নীতির বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না।
দোকান বন্ধ রেখে একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। স্থায়ী সমাধান হলো উৎপাদন, জ্বালানি, সঞ্চালন, চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক কাঠামোর সমন্বিত সংস্কার।
আর্থিক শৃঙ্খলা ও বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জন্য প্রয়োজনীয়, কোনটি তুলনামূলকভাবে অদক্ষ, কোন চুক্তির আর্থিক দায় বেশি, কোথায় ক্যাপাসিটি পেমেন্ট যুক্তিসঙ্গত এবং কোথায় চুক্তি বা নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন—এসব বিষয়ে নিয়মিত, স্বাধীন ও স্বচ্ছ পর্যালোচনা থাকা দরকার।
একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য bankable PPA, payment security, নীতির ধারাবাহিকতা এবং স্বচ্ছ প্রকল্প অনুমোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ বিনিয়োগকারী শুধু একটি ভালো প্রকল্প খোঁজেন না; তিনি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তাও চান।
প্রয়োজন ৫ বছরের জাতীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি স্থিতিশীলতা পরিকল্পনা
বাংলাদেশের সামনে এখন বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে একটি সমন্বিত ৫ বছরের National Power & Energy Stability Plan গ্রহণের সময় এসেছে।
প্রথম ৬ থেকে ১২ মাসে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া—গ্যাস ও LNG-এর নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানি সংকটে কম উৎপাদনে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল করা, প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ দ্রুত শেষ করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ বকেয়া পরিশোধে বাস্তবসম্মত আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
পরবর্তী দুই বছরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, জাতীয় সঞ্চালন অবকাঠামো শক্তিশালী করা, Rooftop Solar সম্প্রসারণ, উপযুক্ত স্থানে Floating Solar প্রকল্প শুরু এবং প্রতিযোগিতামূলক বড় নবায়নযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সময়ে Battery Energy Storage System (BESS)-এর পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করে ফলাফলের ভিত্তিতে ধীরে ধীরে বড় আকারে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। শিল্পকারখানাকে নিজস্ব Solar + Storage স্থাপনে সহজ অর্থায়ন, কর সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য আরও শক্তিশালী করতে হবে। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানির সুযোগ অর্থনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার মূলনীতি হতে হবে বৈচিত্র্য। কোনো একটি দেশ, একটি জ্বালানি, একটি সরবরাহকারী কিংবা একটি প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করা উচিত নয়।
২৭,৫১৫ মেগাওয়াট নয়—নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎই হোক সাফল্যের মাপকাঠি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দক্ষতা, মূল্য, নির্ভরযোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধান শুধু ‘আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র’ নির্মাণের মধ্যে নেই।
২৭,৫১৫ মেগাওয়াট স্থাপিত সক্ষমতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রয়োজনের মুহূর্তে বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি থাকবে, কেন্দ্র চালানোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকবে, জাতীয় গ্রিড সেই বিদ্যুৎ বহন করতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত শিল্প ও সাধারণ মানুষের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছাবে।
আজকের লোডশেডিং তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি সাময়িক বিদ্যুৎ সংকট নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো পরিকল্পনা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
এই সংকটকে সুযোগে পরিণত করতে হবে।
আগামী দিনের বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে উঠতে হবে পাঁচটি মূল স্তম্ভের ওপর—দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও উৎপাদন, নবায়নযোগ্য শক্তি, শক্তি সঞ্চয়, আধুনিক জাতীয় গ্রিড এবং আর্থিক শৃঙ্খলা।
এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে বেসরকারি বিনিয়োগ, স্বচ্ছ ট্যারিফ কাঠামো, দ্রুত One-Stop Service এবং জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী আইনসম্মত ও জবাবদিহিমূলক DPM Framework।
কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন শুধু আমরা কত হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করেছি, তার ওপর নির্ভর করবে না।
প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে—কতটা নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই বিদ্যুৎ আমরা দেশের জনগণ, শিল্প ও অর্থনীতির কাছে পৌঁছে দিতে পারছি তার ওপর।
লেখক পরিচিতি:
মোহাম্মদ আনোয়ার
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক, গবেষক ও কলামিস্ট।
এমএসএম / এমএসএম
বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, বিদ্যুৎ নেই: বাংলাদেশের লোডশেডিং সংকটের আসল কারণ কোথায়?
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দেশের স্বার্থে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে
সমুদ্রের সম্পদ থেকে শিল্পায়ন: মাতারবাড়ী–মীরসরাই করিডোরে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত
হজ প্যাকেজ ২০২৭: সাশ্রয়ী ও প্রবাসীবান্ধব হজ
রাষ্ট্র ও নাগরিকের যৌথ উদ্যোগেই দেশ এগিয়ে যায়
তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক দর্শন: উসকানির জবাবে পেশিশক্তি নয়, ধৈর্য ও শৃঙ্খলা!
টেকসই উন্নয়নের জন্য সুশাসন, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য
গুরু পূর্ণিমা: ঐতিহ্য, ইতিহাস ও গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাহাত্ম্য
ঢাকা শহরের বর্জ্যজনিত দুর্ভোগ প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন
স্বাগতম অ্যান্ডি বার্নহাম বিদায় কিয়ার স্টার্মার
রথযাত্রা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি
অপরিকল্পিত নগরায়ণে ডুবছে চট্টগ্রাম, জনসচেতনতা ছাড়া উত্তরণ সম্ভব নয়