তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক দর্শন: উসকানির জবাবে পেশিশক্তি নয়, ধৈর্য ও শৃঙ্খলা!
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, পাল্টা সংঘাত, প্রতিশোধ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। বহু সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার চেয়ে তাকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা গণতান্ত্রিক asপ্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছে এবং রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় অস্থিরতার মুখোমুখি করেছে। ফলে আজকের বাংলাদেশে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে-গণতন্ত্র কি সংঘর্ষের মাধ্যমে শক্তিশালী হবে, নাকি সহনশীলতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে?
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, তিনি বিরোধী রাজনীতিকে দমন নয়, বরং সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মোকাবিলা করার একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। যদি এই দর্শন ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
ক্ষমতাসীন দলের প্রকৃত শক্তি কখনোই কেবল তার সাংগঠনিক বিস্তার বা কর্মীসংখ্যা নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় আত্মবিশ্বাস, আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার সক্ষমতাই একটি সরকারের প্রকৃত শক্তির পরিচয় বহন করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সরকার সমালোচনাকে ভয় পায় না এবং প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করে, সেই সরকারই দীর্ঘমেয়াদে অধিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে।
আজকের ডিজিটাল যুগে রাজনীতি আর শুধুমাত্র জনসভা, মিছিল কিংবা সংসদের বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি মোবাইল ফোনে ধারণ করা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও মুহূর্তেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাজনৈতিক সহিংসতার একটি মাত্র ঘটনা বহু মাসের রাজনৈতিক অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে। তাই বিরোধী পক্ষের উসকানি থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের প্রতিক্রিয়া হতে হবে পরিমিত, বিচক্ষণ এবং সম্পূর্ণ আইনের কাঠামোর মধ্যে।
এখানেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না সম্প্রতি এক আলোচনায় মন্তব্য করেন যে, ক্ষমতাসীন দলের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিরোধী দলের বক্তব্য নয়; বরং নিজেদের কর্মীদের সংযত রাখা। তাঁর মতে, বিরোধী পক্ষের উসকানির জবাবে যদি ক্ষমতাসীন দলের কোনো কর্মী বা সমর্থক পেশিশক্তি প্রয়োগ করেন, তাহলে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকারই। তাঁর ভাষায়, একটি সহিংস ঘটনার দৃশ্য কিংবা একজন আহত রাজনৈতিক কর্মীর ছবি মুহূর্তেই জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই তিনি রাজনৈতিক ধৈর্য, আত্মসংযম এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
মাহমুদুর রহমান মান্না আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থাকা কোনো দল যখন সরকারে আসে, তখন তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় ক্ষমতার ব্যবহার নয়, বরং ক্ষমতার সংযম প্রদর্শন। এই পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ একটি পরিণত গণতন্ত্রে সরকার তার শক্তি প্রমাণ করে প্রতিপক্ষকে দমন করে নয়; বরং সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক শাসন এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে।
যদি বাংলাদেশের রাজনীতি সত্যিই একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে চায়, তাহলে সরকার, বিরোধী দল এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান-সবার জন্যই ধৈর্য, শৃঙ্খলা, সংলাপ এবং গণতান্ত্রিক সহনশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। সেই অর্থে মাহমুদুর রহমান মান্নার এই পর্যবেক্ষণ শুধু একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
যে দল দীর্ঘদিন বিরোধী অবস্থানে থেকে আন্দোলন করেছে, সরকারে এসে সেই দলকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। বিরোধী অবস্থানের ভাষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ভাষা এক নয়। ক্ষমতাসীন দলের প্রতিটি নেতা-কর্মীকে বুঝতে হবে যে রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনগণের অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব।
চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, স্থানীয় প্রভাব বিস্তার কিংবা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ-তা সত্য হোক কিংবা অতিরঞ্জিত—ক্ষমতাসীন দলের জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর। এসব অভিযোগের সর্বোত্তম জবাব রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দৃশ্যমান সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা। জনগণ শেষ পর্যন্ত বক্তব্য নয়, দৃশ্যমান সুশাসন ও কার্যকর পদক্ষেপকেই মূল্যায়ন করে।
একজন রাজনৈতিক কর্মী যদি প্রতিপক্ষের উসকানিতে আবেগতাড়িত হয়ে সহিংসতার পথ বেছে নেন, তাহলে তিনি হয়তো সাময়িকভাবে নিজেকে বিজয়ী ভাবতে পারেন; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তিনি নিজের দলের রাজনৈতিক ক্ষতিই ডেকে আনেন। বিপরীতে, উসকানির মুখেও সংযম, ধৈর্য এবং আইনের প্রতি আস্থা একটি পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে।
তবে এই দায়িত্ব একতরফা নয়। বিরোধী দলেরও সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে। সরকারকে কঠোর সমালোচনা করা, সংসদে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনা করা বিরোধী দলের বৈধ অধিকার। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সংঘাতে রূপ দেওয়া কিংবা উদ্দেশ্যমূলক উসকানির মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক সংঘাতের মূল্য দিয়েছে। তাই নতুন প্রজন্ম একটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রত্যাশা করে-যেখানে সরকার পরিবর্তন মানেই প্রতিশোধ নয়, বিরোধিতা মানেই শত্রুতা নয় এবং মতপার্থক্য মানেই সহিংসতা নয়।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি সরকার বাস্তবে বিরোধী দলকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী ও সংসদীয় কমিটিতে কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করে এবং সংসদীয় প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে, তাহলে সেটি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এমন উদ্যোগ রাজনৈতিক আস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এবং জবাবদিহিমূলক শাসনকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিজেদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা। সুবিধাবাদ, প্রভাবের অপব্যবহার, অতিরিক্ত তোষণনির্ভর রাজনীতি কিংবা দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহার-এসবের বিরুদ্ধে যদি আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করা না হয়, তাহলে সরকারের অর্জনও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। জনগণ রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং জবাবদিহিকে বেশি মূল্যায়ন করে।
একটি সফল সরকারের পরিচয় বিরোধী দলকে দুর্বল করার মধ্যে নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার মধ্যে। যে সরকার সমালোচনা শুনতে পারে, আইনকে সমানভাবে প্রয়োগ করতে পারে এবং নিজের দলের অনিয়মের বিরুদ্ধেও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, তার প্রতি জনগণের আস্থা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।
যদি আগামী বছরগুলোতে সরকার সুশাসন, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং জনকল্যাণমূলক নীতিকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়, তাহলে তার ইতিবাচক প্রভাব ভবিষ্যতের নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হতে পারে। তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবসময় জনগণের হাতেই থাকে, এবং ভোটই সেই রায়ের একমাত্র বৈধ মাধ্যম।
সবশেষে প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে নীতিনিষ্ঠ, সহনশীল এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-উসকানির জবাবে আরেকটি উসকানি নয়, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পেশিশক্তি নয়; বরং ধৈর্য, শৃঙ্খলা, আইনের শাসন এবং জনগণের আস্থাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারলেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার প্রকৃত পরিপক্বতার দিকে এগিয়ে যায়।
বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতি কোন পথে এগোবে-সংঘাতের পথে, নাকি সহনশীল গণতন্ত্রের পথে-তার উত্তর নির্ভর করবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, দলীয় শৃঙ্খলা এবং সর্বোপরি জনগণের বিচক্ষণ রায়ের ওপর।
লেখক:
মোহাম্মদ আনোয়ার
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক, গবেষক ও কলামিস্ট
এমএসএম / এমএসএম
তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক দর্শন: উসকানির জবাবে পেশিশক্তি নয়, ধৈর্য ও শৃঙ্খলা!
টেকসই উন্নয়নের জন্য সুশাসন, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য
গুরু পূর্ণিমা: ঐতিহ্য, ইতিহাস ও গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাহাত্ম্য
ঢাকা শহরের বর্জ্যজনিত দুর্ভোগ প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন
স্বাগতম অ্যান্ডি বার্নহাম বিদায় কিয়ার স্টার্মার
রথযাত্রা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি
অপরিকল্পিত নগরায়ণে ডুবছে চট্টগ্রাম, জনসচেতনতা ছাড়া উত্তরণ সম্ভব নয়
বাধ্যতামূলক বাংলা কিউআর : স্মার্ট ইকোনমির আড়ালে ‘ডিজিটাল দাসত্ব’ ও নজরদারির এক নীল নকশা
সামাজিক অবক্ষয়রোধে নান্দনিক দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ অপরিহার্য
কর্মচারী নিয়োগে একাডেমিক সনদের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিৎ
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন অপরিহার্য
পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ