ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

স্বাগতম অ্যান্ডি বার্নহাম বিদায় কিয়ার স্টার্মার


রায়হান আহমেদ তপাদার  photo রায়হান আহমেদ তপাদার
প্রকাশিত: ২২-৭-২০২৬ দুপুর ১১:২৯

এক দশকের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহাম। ২০ জুলাই রাজা তৃতীয় চার্লসের আনুষ্ঠানিক আহ্বানের পর নতুন সরকার গঠন করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কিয়ার স্টার্মারের অধ্যায়ের অবসান হলো।জাতীয় নির্বাচনে লেবার পার্টিকে নিরঙ্কুশ বিজয় এনে দেওয়ার প্রায় দুই বছর পর দশ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট ছেড়েছেন স্টার্মার। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র ও লেবার পার্টির নতুন নেতা অ্যান্ডি বার্নহাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন বার্নহাম। এ কারণে তিনি ‘কিং অব দ্য নর্থ’ নামেও পরিচিত। এর আগে লেবার সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে মন্ত্রিসভার দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।১৯৭০ সালে লিভারপুলে জন্ম নেওয়া বার্নহাম চেশায়ারের ওয়ারিংটনের কাছের শান্ত কমিউটার এলাকা কালচেথে বড় হন। তাঁর বাবা ছিলেন বিটি-র একজন প্রকৌশলী এবং মা ছিলেন জিপি রিসেপশনিস্ট। দুজনেই ছিলেন দৃঢ় লেবার সমর্থক, এবং ছোটবেলা থেকেই তাঁর রাজনীতিতে আগ্রহ তৈরি হয়। বার্নহাম বলেছেন, ১৪ বছর বয়সে লেবার পার্টিতে যোগ দেওয়ার অনুপ্রেরণা পান তিনি, বিবিসির টিভি নাটক বয়েজ ফ্রম দ্যা ব্যাকস্টাফ দেখে, যা লিভারপুলের বেকার জীবন নিয়ে নির্মিত।আজীবন এভারটন সমর্থক বার্নহামকে তাঁর বন্ধুরা মনে করেন প্রতিযোগিতামূলক ও খেলাপাগল এক শিশু হিসেবে, যিনি ল্যাঙ্কাশায়ার স্কুলবালকদের ক্রিকেট দলে দ্রুতগতির বোলার ছিলেন। স্কুলে, স্থানীয় রোমান ক্যাথলিক কমপ্রিহেনসিভে, তাঁর ইংরেজি শিক্ষক স্মরণ করেন কীভাবে তিনি মক নির্বাচনে লেবার প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হন। বার্নহাম এবং তাঁর দুই ভাই তাঁদের পরিবারের মধ্যে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, যেখানে অ্যান্ডি কেমব্রিজে ইংরেজি পড়েন। নিজের বই হেড নর্থ-এ বার্নহাম লেখেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে খাপ খাওয়াতে পারেননি এবং নিজেকে একজন ভানকারী বলে মনে হতো।

তবে সংগীতপ্রেমী বার্নহাম, যিনি দ্য স্মিথস এবং দ্য স্টোন রোজেস-এর মতো উত্তরাঞ্চলের ইন্ডি ব্যান্ডের ভক্ত, তিনি বলেন, ম্যানচেস্টারের সংগীতের প্রতি তাঁর ক্রমবর্ধমান আগ্রহ তাঁকে একটি পরিচয় এবং সুবিধা এনে দিয়েছিল। স্নাতক শেষে তিনি সাংবাদিকতায় কাজ শুরু করেন। ট্যাঙ্ক ওয়ার্ল্ড এবং প্যাসেন্জার ওয়ার্ল্ড ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন ট্রেড ম্যাগাজিনে কাজ করেন। বিশের কোঠার শুরুতে তিনি রাজনীতিতে প্রথম সুযোগ পান, ডালউইচ অ্যান্ড ওয়েস্ট নরউডের তৎকালীন এমপি টেসা জোয়েলের গবেষক হিসেবে কাজ করে। পরবর্তীতে ওয়েস্টমিনস্টার রাজনীতির প্রতি তাঁর সমালোচনামূলক মনোভাব থাকা সত্ত্বেও, তিনি দ্রুত এগিয়ে যান। প্রথমে সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্রিস স্মিথের বিশেষ উপদেষ্টা হন, এরপর ২০০১ সালে নিজের শহর গ্রেটার ম্যানচেস্টারের লেই থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ব্লেয়ারের অধীনে জুনিয়র মন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু করে, পরে গর্ডন ব্রাউনের আমলে অর্থমন্ত্রী, পরে সংস্কৃতিমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন। সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রীড়ামন্ত্রী থাকার সময় ১৯৮৯ সালের হিলসবোরো দুর্ঘটনার ২০তম বার্ষিকীর স্মরণসভায় তিনি প্রতিবাদের মুখে পড়েন। সে দুর্ঘটনায় ৯৭ জন লিভারপুল সমর্থক নিহত হয়েছিলেন।এই ঘটনার পর তিনি ক্যাবিনেটে বিষয়টি উত্থাপন করেন, যা ওই ঘটনা নিয়ে দ্বিতীয় দফার তদন্ত শুরুর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ২০১৪ সালে অ্যানফিল্ড স্টেডিয়ামে হিলসবোরো দুর্ঘটনার ২৫তম বার্ষিকীতে তিনি বক্তৃতা দেন। ২০১০ সালে, সাধারণ নির্বাচনে লেবারের পরাজয়ের পর গর্ডন ব্রাউন পদত্যাগ করলে বার্নহাম দলের নেতা হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে চতুর্থ হন।২০১৫ সালে আবার চেষ্টা করেন, এবার জেরেমি করবিনের কাছে পরাজিত হন।সমালোচকেরা এমন একজন ব্যক্তি বলে অভিহিত করেছেন, যার মতামত সফলতার সুযোগ বাড়াতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বদলে যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে গণভোটে তিনি রিমেইন সমর্থক ছিলেন এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছার কথা বলেছেন।

তবে তিনি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে এ বিষয়ে যুক্তি থাকলেও মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের সময় তিনি এটি প্রচার করবেন না-কারণ এলাকাটি ব্রেক্সিটের পক্ষে শক্তভাবে ভোট দিয়েছিল।তিনি করবিনের ছায়া মন্ত্রিসভায় ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন, যদিও তাঁকে দলের ব্লেয়ারপন্থী মধ্য-ডানপন্থী হিসেবে দেখা হতো। সময়ের সঙ্গে তাঁর অবস্থান বাম দিকে সরে যায়, তিনি পানি ও জ্বালানি খাত রাষ্ট্রায়ত্ত করার পক্ষে অবস্থান নেন। ২০১৬ সালে করবিনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পদত্যাগ না করে, ২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টরের প্রথম মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে তিনি পদ ছাড়েন। তিনি ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং ২০২১ সালে আরও বড় ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হন। বি নেটওয়ার্ক এবং লকডাউন জট মেয়র হিসেবে তিনি অঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রশংসা পান। তাঁর নেতৃত্বে গ্রেটার ম্যানচেস্টর লন্ডনের বাইরে প্রথম এলাকা হিসেবে বাস সার্ভিস আবার জননিয়ন্ত্রণে আনে এবং বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থা একীভূত করে বি নেটওয়ার্ক নামে পরিচালনা শুরু করে। তিনি ২০২০ সালের মধ্যে রাস্তায় ঘুমানো মানুষের সমস্যা শেষ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন-যদিও লক্ষ্য পূরণ হয়নি। কোভিড মহামারির সময় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে উত্তর ইংল্যান্ডকে অবজ্ঞার সঙ্গে আচরণ করার অভিযোগ তুলে তাঁর পরিচিতি আরও বাড়ে। এই অবস্থান থেকেই তিনি 'কিং অব দি নর্থ' উপাধি পান। বার্নহাম বি নেটওয়ার্ককে তাঁর অন্যতম সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ২০২৫ সালের শরতে পার্টি সম্মেলনের সময়, তিনি নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেওয়ার ইঙ্গিত দেন। তবে সরকারের ওপর বন্ড মার্কেটের-এর প্রভাব রয়েছে এমন মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েন। জানুয়ারিতে ওয়েস্টমিনস্টারে তার আবার ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয় যখন গ্রেটার ম্যানচেস্টরের এমপি অ্যান্ড্রু গুইন পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে লেবারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাঁকে সেই উপনির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেয়। মে মাসে পরিস্থিতি বদলে যায়। 

তখন ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসে নির্বাচনে লেবার খারাপ ফল করে এবং রিফর্ম পার্টির উত্থান দেখা যায়। স্যার কিয়ের স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে চাপ বাড়তে থাকে, কিছু এমপি নেতৃত্বের পরিবর্তনের দাবি তোলেন এবং মন্ত্রীরা পদত্যাগ করতে শুরু করেন। জশ সাইমন্স মেকারফিল্ডের এমপি পদ ছেড়ে দেন, যাতে বার্নহাম সংসদে ফিরতে পারেন। এরপর বার্নহামকে ওই আসনের লেবার প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয় এবং পরের মাসে তিনি পুনরায় ওয়েস্টমিনস্টারে ফেরেন। অ্যান্ডি বার্নহাম এর আগে লেবার পার্টির নেতা হওয়ার চেষ্টা করেছেন; দুবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুবারই ব্যর্থ হয়েছেন। তবে এবারে সাফল্য এসেছে, কারণ স্যার কিয়ের স্টারমারের পদত্যাগ এবং মেকারফিল্ডের নতুন এমপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর অনেক লেবার এমপি তাঁর পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছেন, যা বার্নহামের জন্য প্রধানমন্ত্রীত্বের পথ তৈরি করছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বার্নহামের সামনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক-দুই ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের আগেই ট্রাম্প তাকে অত্যন্ত উদারপন্থী বলে মন্তব্য করেছিলেন। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। সাম্প্রতিক সময়ে লেবার পার্টির জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। একদিকে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি রিফর্ম ইউকে সমর্থন বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে গ্রিন পার্টি প্রগতিশীল ভোটারদের নিজেদের দিকে টানছে। বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক ও কিয়ার স্টার্মারের পর দায়িত্ব নেওয়া বার্নহ্যামের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। বিশ্লেষকদের মতে, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারলেই পূর্বসূরিদের তুলনায় দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টিকে থাকতে পারবেন বলে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন। অনেক অনেক শুভকামনা রইলো নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের প্রতি।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে

Aminur / Aminur

স্বাগতম অ্যান্ডি বার্নহাম বিদায় কিয়ার স্টার্মার

রথযাত্রা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি

অপরিকল্পিত নগরায়ণে ডুবছে চট্টগ্রাম, জনসচেতনতা ছাড়া উত্তরণ সম্ভব নয়

বাধ্যতামূলক বাংলা কিউআর : স্মার্ট ইকোনমির আড়ালে ‘ডিজিটাল দাসত্ব’ ও নজরদারির এক নীল নকশা

সামাজিক অবক্ষয়রোধে নান্দনিক দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ অপরিহার্য

কর্মচারী নিয়োগে একাডেমিক সনদের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিৎ

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন অপরিহার্য

পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ

ব্রেক্সিট পরবর্তি ব্রিটিশ রাজনীতি এবং স্টারমারের বিদায়

পর্নোগ্রাফি আসক্তি: ডিজিটাল যুগের নীরব মহামারি

কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন

বাবা: স্মৃতির আকাশে এক চিরস্থায়ী নক্ষত্র

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬: যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ