আত্মহননে গ্রহ, নেপথ্যে মানবজাতি
এই গ্রহের সম্পদ সীমিত, কিন্তু মানুষের লোভ অসীম
“প্রকৃতি মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু মানুষের লোভ মেটানোর ক্ষমতা তার নেই” মহাত্মা গান্ধী।
মানুষের বিলাসিতা এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, নিম্ন শ্রেণির মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোই এখন দায়। মানুষের পদচিহ্ন যেখানে, দূষণ সেখানে কথাটি যথার্থ। গ্রহ তার নির্দিষ্ট গতি ও উপাদানের ছন্দ নিয়ে ৪৫০ কোটি বছর পার করছে। কিন্তু আজ গ্রহ মানুষের চাহিদার প্রেক্ষিতে গতি, উপাদানের ছন্দের জৌলুস হারাচ্ছে। দূষণ আর দূষণ গ্রহময়। সুইডেন সরকার সর্বপ্রথম বিষয়টি উপলব্ধি করে ১৯৬৮সালে ২০ মে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কাছে একটি চিটি পাঠায়। পরবর্তীতে দেশটির রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালে জাতিসংঘে মানব পরিবেশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে ০৫ই জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে যা প্রতি বছর বিশ্বব্যাপি পালিত হয়ে আসছে। উত্তর গোলার্ধে দিবসটি বসন্তে দক্ষিণ গোলার্ধে দিবসটি শরৎ এ পালিত হয়।
প্লাস্টিক দূষণ
গত বছর চুয়াডাঙ্গা সদরের কৃষ্ণপুর গ্রামের মাঠে কৃষকদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য একটি টিউবওয়েল স্থাপন করা হয় যা কৃষকদের ফসলে কীটনাশক প্রয়োগের পানির যোগান হিসেবেও কাজ করে। কিন্তু আশ্চার্যের বিষয়, সেই স্থানে আমি উপস্থিত হয়ে লক্ষ্য করি কীটনাশকের বর্জ্য (প্লাস্টিক বোতল, প্লাস্টিক প্যাকেট, অ্যালমনিয়াম ফয়েল ইত্যাদি) এত ছিল যা পায়ের গোড়ালীর উপর স্তুপ তৈরি করেছে। এখানে দাড়িয়ে বোঝার অপেক্ষা রাখে না যে কি পরিমাণ পরিবেশ দূষণ হয়। একাধারে মানুষ বিষ নাক, মূখ ও ত্বক দ্বারা সরাসরি গ্রহণ করছে ও পরোক্ষভাবে খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করছে। পরিশেষে প্লাস্টিক দ্বারা মাটি দূষণ হচ্ছে।
গ্রিনপিস এর তথ্যমতে, প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন প্লাস্টিক সমুদ্রে গিয়ে মিশছে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০সালের মধ্যে সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের ওজন বেশি হবে।
বনাঞ্চল উজাড়
প্রতি মিনিটে পৃথিবীতে প্রায় ১০টি ফুটবল মাঠের সমান আয়তনের প্রাথমিক বনাঞ্চল ধ্বংস করা হচ্ছে। মূলত মানুষের অধিকাংশ স্থাপনা সবুজ বিনষ্ট করে। বায়ু মণ্ডলের সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড মুক্ত হয়ে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক প্যানেল ((IPCC)) সতর্ক করেছে যে, প্রাক শিল্পায়ন যুগের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যে ১.১ক্কপ বেড়ে গেছে। যদি এটি ১.৫ক্কপ অতিক্রম করে তবে আর্কটিক সাগরে সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং বিশ্বজুড়ে খাদ্য-নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে।
নিশ্চিহ্ন জলাভূমি
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা জলাভূমিকে পৃথিবীর বৃক্ক (Kidneys of the Earth) বলে অবিহিত করে থাকে। রামসার কনভেনশনের তথ্যমতে, বনাঞ্চলের চেয়ে ৩গুন দ্রুতহারে পৃথিবী থেকে জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। ১৯০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে বিশ্বের প্রায় ৬৪% জলাভূমি। জলাভূমি বনাঞ্চলের চেয়ে বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড জমা রাখতে পারে। বাংলাদেশের জলাভূমিগুলো হাজার হাজার প্রাণের বাস্তুতন্ত্র। তারপরেও ক্রমাগত হারাতে বসেছে। আমার দেখা চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার শত-শত বছরের ২২একরের জলাভূমি পদ্মবিল আজ বিলুপ্ত। যেখানে ছিল অসংখ্য বণ্যপ্রাণের খাদ্য, বাসস্থান ও প্রজনন ক্ষেত্র যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। বিশ্বের প্রায় ৪০% প্রজাতি জলাভূমিতে বাস করে বা প্রজনন করে।
ক্ষমতার অপব্যহার
এই গ্রহের প্রভাবশালী দেশগুলো আজ ক্ষমতা বহিপ্রকাশের জন্য পরিবেশ ও মানব বিধ্বংশী অস্ত্র নির্মাণ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন তথ্যমতে যুক্তরাষ্ট্র বছরে শুধুমাত্র পারমাণবিক বোমা রক্ষণাবেক্ষণে ৫১ বিলিয়ন ডলার খরচ করে যা চীন ১২ বিলিয়ন, ভারত-পাকিস্তান ২.৫বিলিয়ন। আবার একটি বোমা তৈরিতে ক্ষেত্রবিশেষে ৭০মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার ২০২৫/২০২৬ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের জন্য ২১৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করে থাকে।
প্রকৃতির রক্ষাকবজ বন্যপ্রাণী বিলুপ্তি
ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড ((WWF)) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৭০ হতে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে বণ্যপ্রাণীর সংখ্য গড়ে ৭৩% হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে স্বাদু পানির বাস্তুসংস্থানে এই হ্রাসের হার সবচেয়ে বেশি প্রায় ৮৫%। বাংলাদেশে নির্দিষ্ট কিছু বন ছাড়া প্রায় সকল স্থানে বণ্যপ্রাণীর আবাসস্থল আজ শূণ্যের কোটায়। আমরা কি শুধুই বণ্যপ্রাণী হারাচ্ছি? না, আমরা জীবনের সেই প্রাকৃতিক শৃংখল ভেঙ্গে ফেলছি যা মানবজাতির বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।
বায়ু, পানি ও শব্দ দূষণে জর্জরিত মানবকুলঃ
বাতাসের ক্ষতিকর সূক্ষ্য কণা ফুসফুস ছাড়িয়ে রক্তে মিশে যাচ্ছে। এতে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, ফুসফুসে ক্যানসার, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুকি বাড়ায়। পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্য, শিল্প কল-কারখানায় রাসায়নিক এবং কৃষিতে ব্যবহৃত কীটনাশক পানিকে বিষাক্ত করছে। ডায়েরিয়া, কলেরা, পানিতে মিশে থাকা ভারি ধাতু (সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম) দীর্ঘ মেয়াদে শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি অকেজো হয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত শব্দের কারণে শরীরে স্ট্রেস হরমোন নিঃসরন বেড়ে যায় যা উচ্চ রক্তচাপের কারণ। ঘুমের ব্যাঘাত, স্মৃতি শক্তি কমে যাওয়া, শ্রবণ শক্তি হ্রাস ইত্যাদি তো আছেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে বায়ু দূষণজনিত কারণে। অথচ বাংলাদেশে বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ ইট ভাটা যার ৬০% অবৈধ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- যে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, সে নিজের ভবিষ্যৎকেই ধ্বংস করে। একটা কথা আমরা বারবারই ভুলে যায়, মানুষ প্রকৃতির অংশ, প্রকৃতির মালিক নয়।
ঘুমানোর আগে যেমন প্রতিদিন নিজের বিছানা পরিচ্ছন্ন করতে হয়। ঠিক তেমনি করে যে এলাকায় ঘুমাচ্ছি বা যে সমাজে থাকছি তার পরিবেশ প্রকৃতি পরিচ্ছন্ন রাখছি কি না তা লক্ষ্য রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। পরিবেশ-প্রকৃতি যেমন গ্রহের বাহিরে নয় ঠিক তেমনই আমি-আপনিও গ্রহে থাকি। সুতরাং, প্রকৃতি পরিবেশ থেকে আমরা যতটুকু সুবিধা নিয়ে থাকি তার প্রকৃতির প্রতি সামান্যতম যত্নবান হতে হবে। ৪৫০ কোটি বছর নয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবেই আসুন আমরা সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গ্রহের আত্মহননের পথকে রোধ করি। নিজে সচেতন হই এবং অপরকেও সচেতন করি।
গ্রহের নিজস্ব যে ছন্দ তা আমরা পতন নয়, রক্ষা করার পণ করি।
মোঃ আহসান হাবিব শিপলু
প্রভাষক (প্রানিবিদ্যা)
বড় সলুয়া নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ, তিতুদহ, চুয়াডাঙ্গা।
ও
সভাপতি
বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ এন্ড নেচার ইনিশিয়েটিভ।
এমএসএম / এমএসএম
সীমান্তে রক্তপাত ও পুশইন আর মুখে বন্ধুত্বের বুলি: এই দ্বিচারিতার শেষ কোথায়?
বিশ্ব খাদ্য দিবস: খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও টেকসই উন্নয়ন
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে ভেঙে গেল আ’লীগের পুরোনো বয়ান
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক
হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য বীমা: কভারেজ সুবিধা ও বীমা বহির্ভূত ব্যয় পরিশোধের দায়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস: পেছনের গল্প এবং শিক্ষক সমাজের না বলা কথা
কিশোর গ্যাং: বাংলাদেশের তারুণ্য কোন পথে?
প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
আমি,আমরা কী পড়াচ্ছি, আর শিক্ষার্থীরা কী শিখছে?
লেখকের কষ্ট
বিশ্বমঞ্চে বাবা-মায়ের পদাঙ্কে তারেক রহমান
Link Copied