ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা ও জেন-জি’র সমর্থন: আবেগ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক নতুন মেলবন্ধন


মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম photo মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১৪-৬-২০২৬ বিকাল ৫:৩৭

পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ হয়তো ফুটবলের কোনো পরাশক্তি নয়, কিন্তু এদেশের মানুষের হৃদস্পন্দনে কান পাতলে যে খেলার ছন্দ সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তা নিশ্চিতভাবেই ফুটবল। যুগে যুগে এই বদ্বীপের ধুলোমাখা প্রান্তর থেকে শুরু করে শহরের কংক্রিটের অলিগলিতে ফুটবল কেবল একটি খেলাই নয়, বরং এক অকৃত্রিম সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। সময়ের পালাবদলে এই চিরায়ত উন্মাদনার সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন প্রজন্মের, বিশেষ করে 'জেনারেশন জেড' বা জেন-জি-এর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাদের হাত ধরে বাংলাদেশের ফুটবল প্রেম এখন কেবল গ্যালারির স্লোগানে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বৈশ্বিক সংস্কৃতির সাথে একাত্ম হয়ে এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে।

ফুটবল উন্মাদনার শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে স্বাধীনতাপূর্ব পরবর্তী বাংলাদেশের দিকে। আশির নব্বইয়ের দশকে আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ মানেই ছিল দেশজুড়ে এক অঘোষিত উৎসব। ঢাকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তিল ধারণের ঠাঁই না থাকা, রেডিওতে ধারাভাষ্য শোনার জন্য চায়ের দোকানে উপচে পড়া ভিড় এসবই ছিল তৎকালীন বাঙালি সংস্কৃতির সাধারণ চিত্র। সেই সময় ফুটবল ছিল সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। পাড়ার মাঠে বিকেল বেলায় কাদা মেখে ফুটবল খেলা থেকে শুরু করে স্থানীয় টুর্নামেন্টগুলোর উত্তেজনা প্রমাণ করে যে, এই খেলাটি ঐতিহাসিকভাবেই আমাদের গ্রামীণ নাগরিক জীবনের সাথে গভীরভাবে মিশে আছে।

ফুটবল নিয়ে বাঙালির আবেগের সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রতি চার বছর অন্তরফিফা বিশ্বকাপের সময়। সারা পৃথিবী যখন একটি সোনালী ট্রফির দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন বাংলাদেশ রূপ নেয় এক অদ্ভুত উৎসবের দেশে। বাড়ির ছাদে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ পতাকা ওড়ানো, দেয়ালজুড়ে প্রিয় দলের খেলোয়াড়দের গ্রাফিতি আঁকা কিংবা চায়ের কাপে ঝড় তোলা তর্কে মেতে ওঠা বিশ্বের খুব কম দেশেই এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনার যে ঐতিহাসিক চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতা, তা যেন লাতিন আমেরিকা পেরিয়ে সবচেয়ে বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে। এই আবেগ কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

নতুন শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম, যাদের আমরা 'জেন-জি' বলে ডাকি, তাদের ফুটবল অভিজ্ঞতা পূর্ববর্তী প্রজন্মের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। প্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেটের কল্যাণে এই প্রজন্মের ফুটবল উন্মাদনা আর কেবল দেশীয় মাঠ বা বিশ্বকাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের কাছে ফুটবল মানে এক বৈশ্বিক সংস্কৃতি। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের প্রভাব তাদের দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। রাত জেগে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বা আর্সেনালের মতো ক্লাবের খেলা দেখা তাদের নৈমিত্তিক রুটিনে পরিণত হয়েছে। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচগুলো তাদের কাছে বিশ্বকাপের মতোই সমান উত্তেজনাপূর্ণ।

আগের প্রজন্মের পেলে-ম্যারাডোনা তর্কের জায়গাটি জেন-জি কাছে অবলীলায় দখল করে নিয়েছে লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ঐতিহাসিক দ্বৈরথ। এই দুই মহাতারকাকে ঘিরে তাদের আবেগ যুক্তিগুলো প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন আঙ্গিকে প্রকাশ পায়।

জেন-জি সমর্থনের ধরনটি অত্যন্ত বিশ্লেষণধর্মী এবং অংশগ্রহণমূলক। তারা কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে খেলা দেখেই ক্ষান্ত হয় না, বরং খেলার প্রতিটি কৌশলগত গভীরে প্রবেশ করতে ভালোবাসে। ফ্যান্টাসি প্রিমিয়ার লিগের মতো গেমগুলোর কল্যাণে ইউরোপের অখ্যাত খেলোয়াড়দের পরিসংখ্যানও তাদের নখদর্পণে থাকে। পাশাপাশি ফিফা বা -ফুটবলের মতো ভিডিও গেমগুলো তাদের ফুটবল জ্ঞানকে করেছে আরও শাণিত সমসাময়িক।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেসবুক গ্রুপ, ডিসকর্ড সার্ভার কিংবা এক্সে ম্যাচ চলাকালীন লাইভ আলোচনা, ট্যাকটিকাল বিশ্লেষণ এবং মিম শেয়ার করা বর্তমান ফুটবল সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। প্রিয় দলের জয়ে উল্লাস প্রকাশ কিংবা প্রতিপক্ষকে নিয়ে মেধাভিত্তিক রসিকতা করার জন্য তারা এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকেই নিজেদের আধুনিক গ্যালারি হিসেবে বেছে নিয়েছে।

অনেকেই আক্ষেপ করেন যে, জেন-জি হয়তো দেশীয় ফুটবল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, সুযোগ এবং সঠিক মঞ্চ পেলে এই প্রজন্মও লাল-সবুজের জন্য গলা ফাটাতে প্রস্তুত। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের ঐতিহাসিক শিরোপা জয় কিংবা কিংস এরেনায় বসুন্ধরা কিংসের ম্যাচে তরুণদের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে, শেকড়ের প্রতি তাদের টান এতটুকুও কমেনি। জামাল ভূঁইয়া, সাবিনা খাতুন বা তহুরা খাতুনদের সাফল্য তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইনেও ঠিক ততটাই জায়গা করে নেয়, যতটা পায় কোনো ইউরোপীয় তারকার গোল।

বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা একটি বহমান নদীর মতো, যা সময়ের সাথে সাথে তার বাঁক পরিবর্তন করেছে, কিন্তু প্রবাহ থামায়নি। আবাহনী-মোহামেডানের সেই সোনালী যুগ থেকে শুরু করে আজকের জেন-জি ডিজিটাল ফ্যানবেস সবকিছুর মূলেই রয়েছে ফুটবলের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা। পুরনো প্রজন্মের রেডিওর ধারাভাষ্য আর নতুন প্রজন্মের স্মার্টফোনের লাইভ স্ট্রিমিং মাধ্যম ভিন্ন হলেও আবেগটা একই সুতোয় গাঁথা। ইতিহাস সংস্কৃতির এই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, তরুণ প্রজন্মের এই বৈশ্বিক বিশ্লেষণধর্মী সমর্থনকে যদি দেশীয় ফুটবলের উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়, তবে বাংলাদেশের ফুটবল আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে। ফুটবল আমাদের রক্তে মিশে আছে, এবং এই জেন-জি হাত ধরেই হয়তো রচিত হবে আগামী দিনের নতুন কোনো ফুটবল রূপকথা।

মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম

লেখক ও কলামিস্ট

এমএসএম / এমএসএম

ঢাকা শহরের বর্জ্যজনিত দুর্ভোগ প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন

স্বাগতম অ্যান্ডি বার্নহাম বিদায় কিয়ার স্টার্মার

রথযাত্রা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি

অপরিকল্পিত নগরায়ণে ডুবছে চট্টগ্রাম, জনসচেতনতা ছাড়া উত্তরণ সম্ভব নয়

বাধ্যতামূলক বাংলা কিউআর : স্মার্ট ইকোনমির আড়ালে ‘ডিজিটাল দাসত্ব’ ও নজরদারির এক নীল নকশা

সামাজিক অবক্ষয়রোধে নান্দনিক দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ অপরিহার্য

কর্মচারী নিয়োগে একাডেমিক সনদের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিৎ

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন অপরিহার্য

পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ

ব্রেক্সিট পরবর্তি ব্রিটিশ রাজনীতি এবং স্টারমারের বিদায়

পর্নোগ্রাফি আসক্তি: ডিজিটাল যুগের নীরব মহামারি

কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন

বাবা: স্মৃতির আকাশে এক চিরস্থায়ী নক্ষত্র