ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ


লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল photo লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
প্রকাশিত: ২৫-৬-২০২৬ দুপুর ১:২২

পবিত্র আশুরা ইসলামের ইতিহাসে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্মরণীয় দিন। আরবি ‘আশারা’ শব্দ থেকে ‘আশুরা’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ দশ। ইসলামি চন্দ্র বছরের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। এই দিনটি শুধু একটি ধর্মীয় দিবস নয়, বরং মানবতা, ন্যায়, ত্যাগ, ধৈর্য, আত্মসংযম এবং সত্য প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মুসলিম উম্মাহর কাছে আশুরার গুরুত্ব বহুমাত্রিক। ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও কারবালার মর্মস্পর্শী ঘটনা আশুরাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

পবিত্র আশুরা আমাদের শুধু অতীতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় না, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য মূল্যবান শিক্ষা প্রদান করে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায়, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য আশুরার শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে যখন অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, হিংসা ও অসহিষ্ণুতা বেড়ে চলেছে, তখন আশুরার আদর্শ মানবজাতির জন্য এক অনন্য পথনির্দেশক।

ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী আশুরার দিনটি বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। মহান আল্লাহ এই দিনে হযরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল করেছিলেন। হযরত নূহ (আ.)-এর নৌকা মহাপ্লাবনের পর নিরাপদে জুদি পর্বতে ভিড়েছিল। হযরত ইবরাহিম (আ.) অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে উদ্ধার লাভ করেছিলেন। হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন এবং ফেরাউন নীল নদে ডুবে ধ্বংস হয়েছিল। এই ঘটনাগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকলে আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই আসে। অন্যদিকে অত্যাচার, অহংকার ও জুলুমের পরিণতি ধ্বংস। ইতিহাসের এই শিক্ষাগুলো আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

৬১ হিজরির ১০ মহররম ইরাকের কারবালা প্রান্তরে সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি ক্ষমতা, সম্পদ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এবং ইসলামের মূল আদর্শ রক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন।

ইয়াজিদের অন্যায় শাসনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর পরিবার ও অল্পসংখ্যক সঙ্গীকে নিয়ে কারবালায় অবস্থান করেন। সেখানে তাঁরা অবরুদ্ধ হন এবং পানির মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন। তবুও তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। অবশেষে ১০ মহররম তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা শাহাদাত বরণ করেন। কারবালার এই ঘটনা শুধু একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতীক। মানব ইতিহাসে এমন আত্মত্যাগ বিরল।

আশুরার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা। ইমাম হোসাইন (রা.) জানতেন যে তাঁর সামনে কঠিন পরিণতি অপেক্ষা করছে, তবুও তিনি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। বর্তমান সমাজে অনেক সময় ব্যক্তিগত স্বার্থ, লোভ বা ভয় মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু আশুরা আমাদের শেখায় যে সত্যের জন্য সংগ্রাম করতে হবে, যদিও সে পথে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। একজন প্রকৃত মানুষ কখনো অন্যায়কে সমর্থন করতে পারে না।

ত্যাগ মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবার যে আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করেছেন, তা ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। আজকের সমাজে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই। কিন্তু আশুরা আমাদের শেখায় যে বৃহত্তর কল্যাণ, ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিতে হয়। পরিবার, সমাজ এবং দেশের উন্নয়নের জন্যও আত্মত্যাগ অপরিহার্য।

ধৈর্য মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। কারবালার ঘটনায় আমরা অসীম ধৈর্য ও সহনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ দেখতে পাই। চরম কষ্ট, তৃষ্ণা, ক্ষুধা এবং বিপদের মধ্যেও ইমাম হোসাইন (রা.) ধৈর্য হারাননি। বর্তমান সময়ে মানুষ সামান্য সমস্যাতেই হতাশ হয়ে পড়ে। অনেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। আশুরা আমাদের শেখায়, জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। ধৈর্যশীল ব্যক্তিই শেষ পর্যন্ত সফল হয়।

পবিত্র আশুরা মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কারবালার ঘটনা আমাদের দয়া, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার, সততা এবং মানবপ্রেমের শিক্ষা দেয়। মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো অন্যের কষ্ট অনুভব করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজে মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করা। বর্তমানে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হলেও মানবিক মূল্যবোধের সংকট ক্রমেই বাড়ছে। তাই আশুরার শিক্ষা অনুসরণ করে মানবিক সমাজ গঠন করা সময়ের দাবি।

আশুরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। অন্যায়কে মেনে নেওয়া বা নীরব থাকা কখনো কাম্য নয়। ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া একজন মুমিনের দায়িত্ব। আজকের সমাজে দুর্নীতি, বৈষম্য, মাদক, সন্ত্রাস, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ নানা অন্যায় বিদ্যমান। এসবের বিরুদ্ধে সামাজিক ও নৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

মহররম মাস এবং আশুরার তাৎপর্য মানুষকে আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির দিকেও আহ্বান জানায়। মানুষের ভেতরে থাকা লোভ, হিংসা, অহংকার ও স্বার্থপরতাকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আত্মশুদ্ধি ছাড়া ব্যক্তি ও সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয়। একজন মানুষ যখন নিজের চরিত্রকে সুন্দর করে গড়ে তোলে, তখন সে সমাজের জন্যও কল্যাণকর হয়ে ওঠে।

আশুরার শিক্ষা সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার দিকেও গুরুত্ব দেয়। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা মতভেদের কারণে বিভেদ সৃষ্টি না করে পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। একটি সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য সম্প্রীতির বিকল্প নেই।

বর্তমান তরুণ সমাজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মাদকাসক্তি, নৈতিক অবক্ষয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা তাদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। আশুরার শিক্ষা তরুণদের নৈতিকতা, সততা, দায়িত্ববোধ এবং আদর্শিক নেতৃত্বের পথে পরিচালিত করতে পারে। তরুণদের উচিত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সাহস, দৃঢ়তা এবং নৈতিক আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না, বরং ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপরও নির্ভরশীল। আশুরা আমাদের শেখায় যে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো সমাজ দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও উন্নতি অর্জন করতে পারে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নাগরিকদের মধ্যেও দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্ব আজ যুদ্ধ, সংঘাত, বৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নৈতিক সংকটে আক্রান্ত। এমন পরিস্থিতিতে আশুরার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সত্য, ন্যায়, মানবিকতা, সহনশীলতা এবং আত্মত্যাগের যে আদর্শ কারবালা আমাদের শিখিয়েছে, তা অনুসরণ করলে একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, সর্বস্তরে এই মূল্যবোধ চর্চা করা প্রয়োজন।

পবিত্র আশুরা কেবল একটি ধর্মীয় স্মরণদিবস নয়, এটি মানবতার এক চিরন্তন শিক্ষা। কারবালার আত্মত্যাগ আমাদের শেখায় যে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে হবে, অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপস করা যাবে না। ধৈর্য, আত্মসংযম, ত্যাগ, সহমর্মিতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চাই আশুরার প্রকৃত শিক্ষা।

আজকের সমাজে যখন নৈতিক অবক্ষয় ও মানবিক সংকট ক্রমেই বাড়ছে, তখন আশুরার আদর্শ ব্যক্তি ও সমাজজীবনে নতুন প্রেরণা জোগাতে পারে। আসুন, আমরা পবিত্র আশুরার শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করি এবং সত্য, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক একটি সুন্দর সমাজ গঠনে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখি। তাহলেই আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হবে এবং মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। 

লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)

এমএসএম / এমএসএম

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন অপরিহার্য

পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ

ব্রেক্সিট পরবর্তি ব্রিটিশ রাজনীতি এবং স্টারমারের বিদায়

পর্নোগ্রাফি আসক্তি: ডিজিটাল যুগের নীরব মহামারি

কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন

বাবা: স্মৃতির আকাশে এক চিরস্থায়ী নক্ষত্র

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬: যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ

বাসযোগ্য নগর গড়তে ঢাকা’র ওপর চাপ কমান

বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা ও জেন-জি’র সমর্থন: আবেগ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক নতুন মেলবন্ধন

কৃষক মরছে কীটনাশকে

এই গ্রহের সম্পদ সীমিত, কিন্তু মানুষের লোভ অসীম

তিন মাসে নৌপরিবহনে অবকাঠামো, ডিজিটাল রূপান্তর ও জনসেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ অপরিহার্য