ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

কর্মচারী নিয়োগে একাডেমিক সনদের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিৎ


এসএম পিন্টু photo এসএম পিন্টু
প্রকাশিত: ২৭-৬-২০২৬ দুপুর ১:২

 বর্তমান সময়ে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। যে পদগুলো মূলত শ্রমনির্ভর, মাঠভিত্তিক এবং বাস্তব অভিজ্ঞতানির্ভর, সেসব পদেও অনেক সময় উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এসব পদে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি চাকরিতে যোগদান করেন না, আবার কেউ কেউ যোগদান করলেও অল্প সময়ের মধ্যে চাকরি ছেড়ে চলে যান। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনবল সংকটের মুখোমুখি হতে হয় এবং সেবার মান ব্যাহত হয়। তাই লেবার বা শ্রমিক পদে একাডেমিক যোগ্যতার চেয়ে কাজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও আগ্রহকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
লেবার পদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শারীরিক পরিশ্রম, ধৈর্য, কর্মদক্ষতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা। একজন শ্রমিককে প্রায়ই প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে হয়। ভারী মালামাল বহন, যন্ত্রপাতি পরিচালনায় সহায়তা, নির্মাণকাজ, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা অন্যান্য শ্রমঘন কাজ সম্পাদনের জন্য বইয়ের জ্ঞান অপেক্ষা বাস্তব দক্ষতা বেশি প্রয়োজন হয়। একজন অভিজ্ঞ শ্রমিক বহু বছর কাজ করতে করতে যে দক্ষতা অর্জন করেন, তা অনেক সময় একাডেমিক সনদধারী একজন শিক্ষিত নতুন কর্মীর পক্ষে স্বল্প সময়ে অর্জন করা সম্ভব হয় না।
বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানে লেবার পদে এসএসসি, এইচএসসি এমনকি স্নাতক ডিগ্রিধারীরাও আবেদন করেন। এর অন্যতম কারণ হলো দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ শিক্ষিত প্রার্থী লেবার পদকে দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে দেখেন না। তারা ভালো চাকরির সুযোগ পেলেই বর্তমান কর্মস্থল ত্যাগ করেন। ফলে প্রতিষ্ঠানকে বারবার নতুন জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ঝামেলায় পড়তে হয়। এতে সময়, অর্থ এবং প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
সম্প্রতি এক তথ্যে দেখা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী (খালাসি, ওয়েম্যান, পোর্টার) নিয়োগের ক্ষেত্রে ৮ম শ্রেণি পাস হলেই চলতো, লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হতো না, ভাইবাতে দেখা হতো শারীরিক পরিশ্রম করার দক্ষতা আছে কি না। সেই হিসেবে কর্মচারী নিয়োগে তেমন জটিলতা ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এই পদে নিয়োগে এসএসসি পাস বাধ্যতামূলক করার কারণে অনেক শিক্ষিত লোকেরা আবেদন করেছে। লিখিত পরীক্ষায় পাস করে চাকরিও পাচ্ছে কিন্তু যোগদান করার পর অনেকেই চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন, কেউ কেউ বেটার সুযোগ পেয়ে যোগদান করছে না। ফলে শূন্য পদ পূরণ করা মুশকিল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ২০২২ সালে সহকারী স্টেশন মাস্টারকে (এএসএম) পদে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের কাছ থেকে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে ৫৮৭ জনকে চুড়ান্ত নিয়োগ দিলেও যোগদান করেছে মাত্র ৩৫২ জন, যোগদান করেননি ২২৫ জন। আবার যোগ দিয়েও চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন আরো ১৬২ জন। এছাড়া ২০২৫ সালে ৩৫৩ জন সহকারী লোকো মাস্টারের (এএলএম) বিপরীতে যোগ দিয়ে চাকরি ছেড়েছে ৪৫ জন। শুধু এগুলোই নয়, এমন অমিল রেল ছাড়াও অন্যান্য সরকারি দপ্তরেও দেখা গেছে। যেখানে অফিস সহকারী, ইলেক্ট্রিশিয়ান, পিয়ন, মালি, ক্লিনারসহ বিভিন্ন পদে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে একাডেমিক সনদকে গুরুত্ব দিয়ে জনবল শূন্যতা পূরণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব নিয়োগে বাস্তবতা বিবেচনা করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা দরকার।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় যে শ্রমিক বা নিম্নপদের কর্মচারী নিয়োগের পর দীর্ঘদিন পদ খালি থাকে। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যোগদান না করায় অথবা অল্পদিনের মধ্যে চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় কাক্সিক্ষত জনবল পাওয়া যায় না। এতে প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়, যা তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে যারা দীর্ঘদিন ধরে শ্রমভিত্তিক কাজের সঙ্গে যুক্ত, তারা সাধারণত এ ধরনের পেশার বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন থাকেন। তারা জানেন কাজের ধরন, পরিবেশ এবং চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে। ফলে চাকরিতে যোগদানের পর তাদের মধ্যে দায়িত্ব পালনের আগ্রহ ও স্থায়িত্ব বেশি দেখা যায়। একজন অভিজ্ঞ শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা অনেক সময় নতুন শিক্ষিত কর্মীর চেয়ে বেশি হতে পারে।
বিভিন্ন উন্নত দেশেও শ্রমনির্ভর পেশায় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। নির্মাণ, পরিবহন, কারিগরি সহায়তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিল্পখাতের বহু পদে একাডেমিক সনদের পাশাপাশি বা তার চেয়েও বেশি মূল্য দেওয়া হয় বাস্তব কাজের দক্ষতাকে। কারণ নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হলো কাজটি দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা। শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষিত হওয়া মানেই যে একজন ব্যক্তি সেই কাজের জন্য উপযুক্ত হবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে শিক্ষা অপ্রয়োজনীয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি, শৃঙ্খলা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কিন্তু প্রতিটি পদের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ভিন্ন। একজন প্রকৌশলীর জন্য যে ধরনের শিক্ষা প্রয়োজন, একজন শ্রমিকের জন্য তা অপরিহার্য নাও হতে পারে। তাই নিয়োগ নীতিতে পদের প্রকৃতি অনুযায়ী যোগ্যতা নির্ধারণ করা উচিত।
শ্রমিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিলে বেশ কয়েকটি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। প্রথমত, কর্মীদের চাকরিতে স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণ ব্যয় কমবে। তৃতীয়ত, কাজের গতি ও মান উন্নত হবে। চতুর্থত, প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার জনবল সংকটে পড়বে না। পঞ্চমত, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমভিত্তিক কাজে নিয়োজিত দক্ষ কর্মীরা তাদের প্রাপ্য মূল্যায়ন পাবেন।
বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নিয়োগনীতি। যেখানে শ্রমিক পদে অতিরিক্ত একাডেমিক যোগ্যতার পরিবর্তে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, শারীরিক সক্ষমতা এবং কাজের প্রতি আগ্রহকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রয়োজনে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে প্রকৃত দক্ষ কর্মীদের নির্বাচন করা সম্ভব হয়।
সবশেষে বলা যায়, শ্রমিক পদে সফলতার প্রধান শর্ত হলো কাজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। শুধুমাত্র একাডেমিক সনদ দিয়ে একজন দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা যায় না। বাস্তব অভিজ্ঞতা, কর্মনিষ্ঠা এবং দায়িত্ববোধই একজন শ্রমিককে প্রকৃত অর্থে যোগ্য করে তোলে। তাই লেবার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত অভিজ্ঞতা ও বাস্তব কর্মদক্ষতাকে। তাই কিছু পদে নিয়োগের জন্য একাডেমিক শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা উচিৎ। আবার এসএসসির নিচে যাদের যোগ্যতা তাদের লিখিত পরীক্ষা বাতিল করে শুধুমাত্র কাজের দক্ষতা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট বিবেচনা করে নিয়োগবিধি সংশোধন করা গেলে দক্ষ জনবল তৈরি করা সম্ভব। আবার অধিক শিক্ষিত কেউ আবেদন করলেও তাদের নিয়োগ না দেওয়াই শ্রেয়। আর তথ্য গোপন করে কেউ নিয়োগ পেলেও যাতে পরবর্তীতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে সেই বিধান রাখা উচিৎ।
লেখক: কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন। 

এমএসএম / এমএসএম

কর্মচারী নিয়োগে একাডেমিক সনদের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিৎ

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন অপরিহার্য

পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ

ব্রেক্সিট পরবর্তি ব্রিটিশ রাজনীতি এবং স্টারমারের বিদায়

পর্নোগ্রাফি আসক্তি: ডিজিটাল যুগের নীরব মহামারি

কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন

বাবা: স্মৃতির আকাশে এক চিরস্থায়ী নক্ষত্র

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬: যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ

বাসযোগ্য নগর গড়তে ঢাকা’র ওপর চাপ কমান

বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা ও জেন-জি’র সমর্থন: আবেগ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক নতুন মেলবন্ধন

কৃষক মরছে কীটনাশকে

এই গ্রহের সম্পদ সীমিত, কিন্তু মানুষের লোভ অসীম

তিন মাসে নৌপরিবহনে অবকাঠামো, ডিজিটাল রূপান্তর ও জনসেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি