ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

ব্রেক্সিট পরবর্তি ব্রিটিশ রাজনীতি এবং স্টারমারের বিদায়


রায়হান আহমেদ তপাদার  photo রায়হান আহমেদ তপাদার
প্রকাশিত: ২৫-৬-২০২৬ দুপুর ১১:২৭

কয়েক বছরের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার পর যুক্তরাজ্যে বাস্তবমুখী চিন্তাভাবনা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারেন, এমন নেতা হিসেবে একসময় সমাদৃত হয়েছিলেন কিয়ার স্টারমার। কিন্ত যখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়লেন, তখন দেখা গেল, যে নির্দিষ্ট আদর্শের অভাব তাঁকে ক্ষমতায় এনেছিল, সেটাই তাঁর পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল।২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে মাত্র এক দশকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা ছাড়তে বা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বেশি নেতৃত্ব পরিবর্তনের নজির দেখা যায়নি। ব্রিটেনের রাজনীতির এই অস্থিরতার সূচনা হয় ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের ফলাফলকে কেন্দ্র করে। এর পর থেকে প্রায় প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীই কোনো না কোনো রাজনৈতিক সংকট, দলীয় বিদ্রোহ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় কিংবা নির্বাচনী ব্যর্থতার কারণে বিদায় নিয়েছেন। এই ধারার শুরু হয় ২০১৬ সালের ১৩ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। তিনি ২০১০ সালের ১১ মে প্রধানমন্ত্রী হন এবং টানা ৬ বছর ২ মাস ২ দিন দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ব্রেক্সিট গণভোটে ভোটাররা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায় দেন। গণভোটের ফল প্রকাশের পরদিনই ক্যামেরন ঘোষণা দেন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের জন্য নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন। ডেভিড ক্যামেরনের উত্তরসূরি হিসেবে ২০১৬ সালের ১৩ জুলাই দায়িত্ব নেন থেরেসা মে। তিনি ছিলেন যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই পদত্যাগের আগপর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন ৩ বছর ১১ দিন।ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে করা থেরেসার চুক্তি তিনবার যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে প্রত্যাখ্যাত হয়। দলীয় বিদ্রোহ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিদায় নিতে হয়। ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন আলোচিত রাজনীতিবিদ বরিস জনসন। ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া শেষ করা এবং একই বছরের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তা বেশি দিন টেকেনি। কোভিড লকডাউনের সময় ডাউনিং স্ট্রিটে পার্টি আয়োজন নিয়ে ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারি, একের পর এক মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং নিজ দলের পার্লামেন্ট সদস্যদের (এমপি) আস্থা হারানোর ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব ছাড়ার আগপর্যন্ত তিনি ৩ বছর ১ মাস ১৩ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। বরিস জনসনের উত্তরসূরি হিসেবে ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেন লিজ ট্রাস। কিন্তু তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব স্থায়ী হয় মাত্র ৪৯ দিন। ক্ষমতায় এসে তিনি কর কমানো ও ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে তথাকথিত মিনি বাজেট ঘোষণা করেন। ফলে আর্থিক বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, পাউন্ডের মূল্য রেকর্ড হারে পড়ে যায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত নিজ দলের সমর্থন হারিয়ে ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর তিনি পদত্যাগ করেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাক ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি দায়িত্বে ছিলেন ১ বছর ৮ মাস ১০ দিন। ট্রাস সরকারের পর অর্থনীতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করলেও মূল্যস্ফীতি, অভিবাসন, এনএইচএস সংকট এবং জীবন যাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত থাকে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির ঐতিহাসিক পরাজয়ের পর তিনি দায়িত্ব ছাড়েন। এই পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীর সবাই কনজারভেটিভ পার্টির ছিলেন। ব্রেক্সিট উদ্যোগের শুরু হয়েছিল কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সময়।২০২৪ সালের ৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী হন কিয়ার স্টারমার। এর আগে ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল থেকে তিনি লেবার পার্টির নেতা ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রায় ১ বছর ১১ মাস দায়িত্ব পালন করেন। 
২০২৪ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এলেও সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে হতাশাজনক ফলাফল, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট, সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং দলীয় অসন্তোষ তাঁর অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। অবশেষে ২২ জুন সোমবার স্থানীয় সময় সকালে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দেওয়া এক বক্তব্যে স্টারমার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণা দেন।ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেতৃত্ব পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। তবে এত দ্রুত ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের নজির বিরল। ১৯৭৯ সালের ৪ মে মার্গারেট থ্যাচার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০১৬ সালের ১৩ জুলাই ডেভিড ক্যামেরনের বিদায় পর্যন্ত প্রায় ৩৭ বছরে যুক্তরাজ্যে মাত্র পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। এই কজন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ছিলেন জন মেজর, টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউন। প্রায় চার দশকে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ব্রেক্সিট-পরবর্তী মাত্র এক দশকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী বিদায় নিয়েছেন। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) কারণে মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৮ শতাংশ কমে গেছে বলে ধারণা করা হয়। উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধিও বেশ শ্লথ। ঋণের বোঝাও ধীরে ধীরে বেড়েছে। এর ফলে গ্রুপ অব সেভেনের (জি-৭) সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেনের সরকারি বন্ডের সুদহার এখন সর্বোচ্চ। এই জোটের দেশগুলোর মধ্যে শিল্প খাতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যয়ও এখন ব্রিটেনে। দেশটির নির্বাচনব্যবস্থায়ও ফাটল দেখা দিচ্ছে। ব্রিটেনের নির্বাচনব্যবস্থা মূলত ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ পদ্ধতির। রাজনীতিতে দুটি প্রধান দল থাকলেই এই পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো কাজ করে। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টিই ছিল সেই প্রধান দুই শক্তি।
২০১০ সালে ডেভিড ক্যামেরনের পর ১৫ বছরে যুক্তরাজ্যে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে তিনজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তিত হয়েছিল। কিন্তু এই দুই দল আধিপত্য হারানোয় যুক্তরাজ্যের রাজনীতি এখন বহুমাত্রিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ইংল্যান্ডে এটি এখন পাঁচমুখী লড়াই। আর স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে তা রূপ নিয়েছে ছয়মুখী লড়াইয়ে। ঐতিহ্যবাহী দল দুটিকে এখন বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপন্থী লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, অতি প্রগতিশীল গ্রিনস এবং কট্টর ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে। পাশাপাশি স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্বাধীনতার পক্ষের জাতীয়তাবাদী দলগুলোও মাঠে আছে। এদের উত্থান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ভাঙনের কারণ হতে পারে। ১৭০৭ সাল থেকে স্কটল্যান্ড এবং ১৫৩৬ সাল থেকে ওয়েলস যুক্তরাজ্যের অংশ।এ রকম পাহাড়সম সমস্যার মুখে ব্রিটেনে অনেকেই এখন হতাশায় ভুগছেন। তাঁরা মনে করেন, দেশে এখন একটি ভালো সরকার গঠন করা প্রায় অসম্ভব। এই স্রোতের বিপরীতে যেকোনো নেতার পক্ষেই টিকে থাকা কঠিন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমন হতাশা আসলে স্টারমারের ব্যর্থতাকেই আড়াল করে। শুধু স্টারমার নন, তাঁর আগের অনুজ্জ্বল পূর্বসূরিদেরও দায়মুক্ত করে দেয়। ব্রিটেন কোনোভাবেই শাসন-অযোগ্য নয়। তবে সাম্প্রতিক কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী দেশটিকে শাসন-অযোগ্য করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। এই পরিসংখ্যানই ব্রিটিশ রাজনীতির বর্তমান অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন।ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্য এখনো তার নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য খুঁজে পায়নি। ব্রেক্সিট, কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, অভিবাসন সংকট, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন-সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি চাপের মধ্যে পড়ছেন। 
আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে ধৈর্য কমে যাওয়া। আগে একজন প্রধানমন্ত্রীকে ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার জন্য দীর্ঘ সময় দেওয়া হতো। এখন জনসমর্থন কমলেই, নির্বাচনে খারাপ ফল এলেই বা দলীয় এমপিদের আস্থা হারালেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি উঠছে। ফলে যুক্তরাজ্য এখন এমন এক রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে নির্বাচনে জেতা যতটা কঠিন, ক্ষমতায় টিকে থাকাটা তার চেয়ে আরও বেশি কঠিন। কিয়ার স্টারমারের বিদায়ের পর যুক্তরাজ্য এখন এক দশকের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রীর অপেক্ষায়। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহামের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও, তিনি বা পরবর্তী যিনিই দায়িত্ব গ্রহণ করুন না কেন, তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিকে আবার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনা।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে

Aminur / Aminur

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন অপরিহার্য

পবিত্র আশুরার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ

ব্রেক্সিট পরবর্তি ব্রিটিশ রাজনীতি এবং স্টারমারের বিদায়

পর্নোগ্রাফি আসক্তি: ডিজিটাল যুগের নীরব মহামারি

কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন

বাবা: স্মৃতির আকাশে এক চিরস্থায়ী নক্ষত্র

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬: যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ

বাসযোগ্য নগর গড়তে ঢাকা’র ওপর চাপ কমান

বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা ও জেন-জি’র সমর্থন: আবেগ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক নতুন মেলবন্ধন

কৃষক মরছে কীটনাশকে

এই গ্রহের সম্পদ সীমিত, কিন্তু মানুষের লোভ অসীম

তিন মাসে নৌপরিবহনে অবকাঠামো, ডিজিটাল রূপান্তর ও জনসেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ অপরিহার্য