ঢাকা বৃহষ্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমতাভিত্তিক শিক্ষা : প্রতিবন্ধী শিশুরা কি অন্তর্ভুক্ত


শরীফা হক photo শরীফা হক
প্রকাশিত: ৪-৬-২০২৬ দুপুর ৩:২৭

বিদ্যালয় পরিদর্শন জেলা প্রশাসকের নিয়মিত কাজ। সম্প্রতি কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে যে চিত্র উঠে এসেছে তা মোটেও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার স্বপ্নের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। পিইডিপি-৩ ও ৪ এর আওতায় অনেক স্কুল নতুন ভবন পেয়েছে, চকচকে শ্রেণিকক্ষও আছে। কিন্তু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর কথা ভেবে সেখানে আলাদা কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। যেন ধরেই নেওয়া হয়েছে, এই স্কুলগুলোর দরজা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্য নয়। এই বাস্তবতা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে, কারণ শিক্ষা তখনই সবার হবে, যখন স্কুলের ইট-পাথরও সবার জন্য প্রস্তুত থাকবে। একটি দেশের উন্নতির মাপকাঠি কেবল জিডিপি, বিনিয়োগ বা অবকাঠামো নয়। একটি দেশ তখনই উন্নত হয়, যখন তার সবচেয়ে দুর্বল শিশুটিও সমান সুযোগ আর অধিকার নিয়ে এগিয়ে যায়। যখন প্রতিবন্ধী শিশুটিও নিঃসংকোচে স্কুলের দরজা ঠেলতে ঢুকতে পারে। এই মানদন্ডে দাঁড়ালে, আমাদের এখনো বহুদূর হাঁটতে হবে।

বিগত এক দশকে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় বড় সাফল্য পেয়েছে। ভর্তির হার বেড়েছে, লিঙ্গসমতা এসেছে, নিরক্ষরতা কমেছে। এত অগ্রগতি সত্ত্বেও ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ (এনএসপিডি) ২০২১’- এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের (৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী) মধ্যে মাত্র ৬৫ শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়। অর্থাৎ বাকী ৩৫% এর বাইরে থেকে যায়। ইউনিসেফ- এর অপর এক সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের অর্ধেকের বেশী স্কুলেই যায় না। আমাদের সংবিধান শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদেও সই করেছে। তবু প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য স্কুলের দরজা এখনো পুরোপুরি খোলেনি। আটকে যাচ্ছে অবকাঠামোর ঘাটতি আর সমাজের পুরোনো কুসংস্কারে। ভাঙা র‌্যাম্প, অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক আর ‘অক্ষম’ তকমার বাধাগুলো পেরিয়ে প্রতিবন্ধী শিশুর পক্ষে স্কুলে টিকে থাকা আজও কঠিন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তানকে ভর্তিচ্ছুক এক অভিভাবক বলছিলেন, তাঁর সন্তানের সেরিব্র্যাল পালসি বিধায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিরুৎসাহিত করেছেন তাকে ভর্তি করতে। তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন একটি শিশু যদি শৈশবেই বুঝতে পারে সমাজ তাকে চায় না, তবে তাঁর সুষ্ঠু বিকাশ কিভাবে সম্ভব হবে? অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কাগজে-কলমে যত সহজ শোনায়, বাস্তবে বিষয়টি তত সহজ নয়। প্রতিবন্ধী শিশুদের শ্রেণিকক্ষে ফেরানোর পথে মূলত তিন ধরনের বাধা কাজ করছে কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানসিক।

কাঠামোগত বাধা: 
অনেক ক্ষেত্রে স্কুলই প্রস্তুত নয়। অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হুইলচেয়ার ওঠার র‌্যাম্প নেই। দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য ব্রেইল বই, শ্রবণযন্ত্র বা সাংকেতিক ভাষায় পারদর্শী শিক্ষকও মেলে না। এর ওপর আছে শ্রেণিকক্ষের অতিরিক্ত ভিড়, ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থীর মাঝে একজন প্রতিবন্ধী শিশুর দিকে আলাদা মনোযোগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। ভবন নতুন হলেও তা যদি শিশুবান্ধব না হয়, তবে ‘অন্তর্ভুক্তি’ শব্দটি তার অর্থ হারায়।

প্রাতিষ্ঠানিক বাধা: 
নীতি আছে, বাস্তবায়ন মন্থর। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার কথা স্পষ্টভাবে বলা আছে। ব্র্যাক, সিডি-র মতো সংস্থা পাইলট প্রকল্পও চালাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষা বাজেটে এ খাতের জন্য বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয়, তদারকিও দুর্বল। ফলে নীতির কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও পর্যাপ্ত বরাদ্দ, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার অভাবে নীতি ও প্রয়োগের ব্যবধান বড় সংকট।

মানসিক বাধা: বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির অচলায়তন  
সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের সমাজে। এখনো এ সমাজে প্রতিবন্ধী শিশুকে ‘অক্ষম’ বা ‘করুণার পাত্র’ হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিশুটিকে শুধু শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে ঠেলে দেয় না, তার আত্মবিশ্বাসও ভেঙে দেয়। যতদিন না সমাজ সংবেদনশীল হবে যে প্রতিবন্ধিতা অক্ষমতা নয়, ভিন্নতা মাত্র, ততদিন পরিবর্তন আসবে না। এই তিন বাধা একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে পুরো চিত্রটা নিরাশার নয়। বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ আছে, সফলতাও আছে। সাভারের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ব্রেইল বই, ভাষা-চিকিৎসক ও সাংকেতিক ভাষার প্রশিক্ষকসহ একটি রিসোর্স রুম চালুর পর মাত্র এক বছরে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দ্বিগুণ হয়েছে। উক্ত স্কুলের শিক্ষকরা মনে করেন বিদ্যালয় প্রস্তুত থাকলে শিশুরাও সফল হয়।

শুধু একটি স্কুল নয়, বেসরকারি উদ্যোগও পথ দেখাচ্ছে। ব্র্যাকের ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রমে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত হাজারো শিশুদের শ্রেণিকক্ষে সহায়ক উপকরণ পৌঁছে দিচ্ছে ও শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট (সিডিডি) কমিউনিটি-ভিত্তিক মডেলের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে ঝরে পড়া শিশুদের আবার স্কুলমুখী করছে। এই ছোট ছোট উদ্যোগ প্রমাণ করে, সদিচ্ছা আর পরিকল্পনা থাকলে অন্তর্ভুক্তিমূলক অসম্ভব নয় শুধু সময়ের দাবি। অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানসম্পন্ন ও সমতাভিত্তিক মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের এখনই কাজ শুরু করতে হবে। উন্নত, শিশু বান্ধব বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তখনই বাস্তব হবে, যখন শিক্ষায় সবার জন্য সমতা নিশ্চিত হবে। প্রতিবন্ধী শিশুকে মূলধারায় আনতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত: শিক্ষকদের প্রস্তুত করতে হবে। প্রাথমিকের প্রত্যেক শিক্ষককে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা ভিন্ন চাহিদার শিশুকে শ্রেণিকক্ষে সামলাতে পারেন।
দ্বিতীয়ত: অবকাঠামো শিশুবান্ধব করতে হবে। নতুন স্কুল ভবন নির্মাণের সময়ই র‌্যাম্প, আলাদা টয়লেট ও রিসোর্স রুমের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি পুরোনো স্কুলগুলো দ্রুত সংস্কার করে প্রবেশগম্য করতে হবে।
তৃতীয়ত: বাজেটে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষা বাজেটে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে। হুইলচেয়ার, ব্রেইল বই, শ্রবণ যন্ত্রের মতো সহায়ক উপকরণ সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরবরাহ করতে হবে।
চতুর্থত: তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। কমিউনিটি রিচ-আউটের মাধ্যমে প্রতিটি ইউনিয়নে প্রতিবন্ধী স্কুলগামী শিশুর তালিকা করতে হবে, যাতে কেউ বাদ না পড়ে। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সুইড স্কুলের সংখ্যা ও মানও বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় কাজটি মানসিকতার। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়িয়ে সমাজের ভুল ধারণা ভাঙতে হবে। প্রতিবন্ধী শিশু বোঝা নয়, সে সম্ভাবনা এই বিশ্বাস জাগ্রত করতে হবে।

এছাড়াও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কোন দয়া নয়, এটি মৌলিক অধিকার। যতদিন একটি শিশুও শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতার কারণে শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকবে, ততদিন ‘শিক্ষা সবার জন্য’ এই প্রতিশ্রুতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সঠিক সুযোগ ও সুরক্ষা পেলে প্রতিবন্ধী শিশুও দেশের সম্পদ হয়ে উঠবে। কাঠামো বদলাতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে, আর সবচেয়ে বেশি বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি । তবেই ‘শিক্ষা সবার জন্য’ কথাটি শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব হবে।

লেখক: জেলা প্রশাসক, টাঙ্গাইল।

এমএসএম / এমএসএম

পর্নোগ্রাফি আসক্তি: ডিজিটাল যুগের নীরব মহামারি

কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন

বাবা: স্মৃতির আকাশে এক চিরস্থায়ী নক্ষত্র

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬: যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ

বাসযোগ্য নগর গড়তে ঢাকা’র ওপর চাপ কমান

বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা ও জেন-জি’র সমর্থন: আবেগ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক নতুন মেলবন্ধন

কৃষক মরছে কীটনাশকে

এই গ্রহের সম্পদ সীমিত, কিন্তু মানুষের লোভ অসীম

তিন মাসে নৌপরিবহনে অবকাঠামো, ডিজিটাল রূপান্তর ও জনসেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ অপরিহার্য

ডিজিটাল যুগে সামাজিক নিরাপত্তা ও নৈতিক সংকট

স্বাস্থ্যখাতের অরাজকতা রোধ করা জরুরী

অদম্য প্রত্যয়, নিরলস সেবা ও নিবিড় মনিটরিংয়ে অনিন্দ্য হজ ব্যবস্থাপনা