ঢাকা বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

​মহাসাধক লোকনাথ ব্রহ্মচারী: বিপন্ন মানুষের পরম আশ্রয় ও অলৌকিকতার মহাকাব্য


মানিক লাল ঘোষ photo মানিক লাল ঘোষ
প্রকাশিত: ৩-৬-২০২৬ বিকাল ৫:৪৬

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও চেতনার দিগন্তে এক ধ্রুবতারার নাম লোকনাথ ব্রহ্মচারী। আধ্যাত্মিকতার এমন এক উচ্চ শিখরে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন, যেখানে অসীম করুণা আর অলৌকিক শক্তির মিলন ঘটেছিল। আজ কেবল ভারতবর্ষের সীমানায় নয়, পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে যেখানেই সনাতনী ভক্তদের বসতি, সেখানেই আশ্রিত মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে উঠেছে তাঁর মন্দির ও স্মৃতিস্তম্ভ। মহাপুরুষের জীবনের এই পবিত্র আখ্যান কেবল সময়ের ফ্রেমে বন্দি নয়; ১৮ ভাদ্র তাঁর আবির্ভাব এবং ১৯ জ্যৈষ্ঠ তাঁর মহাপ্রয়াণ—এই তিথিগুলো আজ ভক্তকুলের কাছে পরম শ্রদ্ধার স্মারক। বিশেষত তাঁর তিরোধান দিবসটি আজ আর কেবল শোকের দিন নয়, বরং তাঁর অসীম শক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের এক সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। আর্তমানবতার সেবায় উৎসর্গীকৃত সেই মহাপ্রয়াণ তিথিকে কেন্দ্র করে আজ যে আধ্যাত্মিক আবহের সৃষ্টি হয়, তা ভক্তি ও বিশ্বাসে আপ্লুত করে তোলে অগণিত ভক্তের হৃদয়কে।
​বাবা লোকনাথ শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মতিথি জন্মাষ্টমীতে ১৭৩০ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ আগস্ট (১৮ ভাদ্র, ১১৩৭ বঙ্গাব্দ) উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার কচুয়া গ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রামনারায়ণ ঘোষাল এবং মাতা কমলা দেবী। লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জন্মস্থান নিয়ে শিষ্যদের মধ্যে একসময় মতভেদ থাকলেও, পরবর্তীকালে আইনি রায় অনুযায়ী কচুয়া গ্রামকেই তাঁর পবিত্র জন্মভূমি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পিতা রামনারায়ণ ঘোষাল ছিলেন এক গুপ্তসাধক, যার অন্তরে ছিল সন্তানকে ব্রহ্মচারী করার সুপ্ত বাসনা। মা কমলা দেবী লোকনাথের জন্মের পর সানন্দে তাঁকে আধ্যাত্মিক জীবনের পথে চলার অনুমতি দেন। এরপর আচার্য ভগবান চন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের শিষ্যত্ব গ্রহণের মাধ্যমে লোকনাথ ও তাঁর সখা বেণীমাধব চক্রবর্তী অজানার উদ্দেশ্যে গৃহত্যাগ করেন।
​গৃহত্যাগের পর বাংলা ১১৪৮ সনে কালীঘাটের নির্জন অরণ্যে শুরু হয় তাঁদের কঠোর সাধনা। দীর্ঘ ৩০-৪০ বছর নক্ত-ব্রত ও ত্রিরাত্রি, পঞ্চরাত্রির মতো কঠোর নিয়ম পালনের পর তাঁরা হিমালয়ের বরফাবৃত নির্জন স্থানে উপনীত হন। ৫০ বছরেরও অধিক সময়ের হাড়কাঁপানো তপস্যা ও নিরবচ্ছিন্ন সংযমের পর লোকনাথ সমাধির উচ্চতম শিখরে পৌঁছান এবং পরমতত্ত্বের স্বাদ লাভ করেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল ৯০ বছর।
​বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর অলৌকিক ক্ষমতার বহু আখ্যান লোকমুখে কিংবদন্তির মতো প্রচলিত। অন্যের মনের ভাব তিনি অবলীলায় পাঠ করতে পারতেন। বারদীতে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে কিছু ঈর্ষান্বিত ব্যক্তি তাঁকে পরীক্ষা করতে উদ্যত হয়। কামাখ্যা নামের এক অহংকারী সাধক বাবার সিদ্ধি প্রমাণের জন্য তাঁকে ধুতরা ফুল ও বিষাক্ত সাপের বিষ পান করতে দেন। মহাদেবের কৃপায় বাবা লোকনাথ দিব্যি সুস্থ হয়ে ওঠেন, যা দেখে কামাখ্যা ও তাঁর অনুসারীরা লজ্জিত হয়ে বাবার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। আদালতে সাক্ষী হিসেবে দেড়শো বছর বয়সে সুদূর গাছের ডালে পিঁপড়ের সারি দেখার ঘটনা আজও তাঁর অতীন্দ্রিয় দৃষ্টিশক্তির অনন্য নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
​ত্রিপুরা জেলার দাউদকান্দি থেকে শুরু করে বারদী পর্যন্ত তাঁর বিচরণ ছিল বিস্ময়কর। বারদীর জমিদার নাগ মহাশয়ের দানে গড়া এই বারদী আশ্রম আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। ভাওয়াল রাজার বিশেষ অনুমতিতে তোলা বাবার সেই ঐতিহাসিক ছবি আজও প্রতিটি গৃহের পূজাবেদিতে পরম শ্রদ্ধায় পূজিত হয়। জীবনের শেষলগ্নে এক ভক্তের দুরারোগ্য যক্ষ্মার রোগ তিনি নিজ শরীরে গ্রহণ করে তাকে মুক্ত করেন। শারীরিক যন্ত্রণার প্রকোপ বাড়লে তিনি ১৯ জ্যৈষ্ঠ দেহত্যাগের ঘোষণা দেন। অবশেষে ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১৯ জ্যৈষ্ঠ (১ জুন ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ) এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বারদী আশ্রমে তিনি ১৬০ বছর বয়সে মহাসমাধিতে মগ্ন হন।
​প্রত্যেক ভক্তকে পিতৃস্নেহে আগলে রাখা লোকনাথ ব্রহ্মচারী আজও বিপদগ্রস্ত মানুষের পরম আশ্রয়। বিশ্বাসের চরম মুহূর্তে আজও ভক্তরা তাঁকে স্মরণ করেন এবং তাঁর কৃপায় বিপদমুক্ত হন। এই অমোঘ আস্থার কারণেই দিকে দিকে ধ্বনিত হয়— ‘জয় বাবা লোকনাথ’।

​(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক)

এমএসএম / এমএসএম

​মহাসাধক লোকনাথ ব্রহ্মচারী: বিপন্ন মানুষের পরম আশ্রয় ও অলৌকিকতার মহাকাব্য

ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ ও উত্তরণের উপায়

অপরাধ আড়ালের মাধ্যম যেন না হয় ’গণমাধ্যম’

বাংলাদেশের টেকসই কৃষি ও গ্রাম উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান এবং রাষ্ট্রীয় মূল্যায়নের প্রশ্ন

নিরাপদ ট্রেন ভ্রমন নিশ্চিতে সচেষ্ট জিএম সুবক্তগীন

অসাধু কসাইদের প্রতারণা ও আমাদের অজ্ঞতা: সতেজতার আড়ালে অনিরাপদ মাংস

আত্মত্যাগ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ঈদুল আজহা

পাহাড়ে শান্তির পথপ্রদর্শক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

বিদ্যুৎ বিল কমানো জরুরি , সরকার উদ্যোগ নিবে এটাই সকলের প্রত্যাশা

আসন্ন ঈদ-উল-আজহায় ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনারোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

যেখানে হারায় আলো, সেখানে জন্মায় স্বপ্ন

শিক্ষাক্রমে মাধ্যমিক স্তরে কৃষি শিক্ষা পুনরায় বাধ্যতামূলক করা হোক

লবণ কমাই, জীবন বাঁচাই: বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৬