শবে বরাতেও ক্ষমা নেই যাদের
ইসলামের ইতিহাসে কিছু রাত এমন রয়েছে যেগুলো আল্লাহ তায়ালার বিশেষ করুণা, অনুগ্রহ ও ক্ষমা লাভের অপূর্ব সুযোগ নিয়ে আসে। শবে বরাত তেমনই এক মহিমান্বিত রজনি।
একে হাদিসের ভাষায় বলা হয়েছে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, রিজিক বৃদ্ধি করেন এবং আকাশ ও জমিনে রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। কিন্তু কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, এই মহামূল্যবান রাতেও কিছু শ্রেণির মানুষ এমন রয়েছে, যাদের দিকে আল্লাহ তায়ালা রহমতের দৃষ্টিতে তাকান না, যাদের জন্য ক্ষমার দরজা খোলা হয় না। তারা এমন কিছু পাপকর্মে লিপ্ত থাকে, যা আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা থেকে তাদের বঞ্চিত রাখে। তবে যদি তারা তওবা করে এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চায়, তা হলে তিনি তাদেরও ক্ষমা করবেন।
এমন কয়েকজন দুর্ভাগা হলো
মুশরিক : যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শরিক সাব্যস্ত করে অর্থাৎ শিরকে লিপ্ত থাকে, তার জন্য ক্ষমার দরজা বন্ধ থাকে। শিরক এমন এক মারাত্মক অপরাধ, যা ক্ষমা না করার ঘোষণা আল্লাহ তায়ালা নিজেই দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সঙ্গে শিরক করে। আর এরচেয়ে কম অপরাধ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করল, সে এক গুরুতর পাপে লিপ্ত হলো’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৪৮)। অতএব শিরকের ওপর অবিচল অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি শবে বরাতের ক্ষমা থেকেও বঞ্চিত হবে।
মুশাহিন (বিদ্বেষ পোষণকারী) : মুশাহিন এমন ব্যক্তি যার অন্তর হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতায় পরিপূর্ণ। দ্বীনি কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই অন্যের প্রতি শত্রুতা লালন করা মারাত্মক অপরাধ। ইমাম আওজায়ি (রহ.) বলেন, সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারীও মুশাহিনের অন্তর্ভুক্ত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পারস্পরিক বিদ্বেষে লিপ্ত দুই ব্যক্তি একে অপরের সঙ্গে মীমাংসা না করা পর্যন্ত তাদের ক্ষমা স্থগিত থাকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৫)
হত্যাকারী : ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করা ইসলামে ভয়াবহতম অপরাধগুলোর একটি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ অপরাধকে কুফরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মুসলমানকে গালি দেওয়া পাপ, আর তাকে হত্যা করা কুফরি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭০৭৬)
হত্যা সেই সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহের অন্তর্ভুক্ত, যা মানুষকে সর্বনাশের দিকে নিয়ে যায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা ধ্বংসকারী সাতটি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেগুলো কী? তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা, জাদু করা, আল্লাহ তায়ালা যে প্রাণ হত্যা করতে নিষেধ করেছেন অন্যায়ভাবে তা হত্যা করা, সুদের লেনদেন করা, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, যুদ্ধের দিন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা ও সতীসাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৭৬৬)
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী : রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ এবং আল্লাহর অভিসম্পাতের কারণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, অতঃপর তাদের বধির ও দৃষ্টিহীন করেন’ (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত : ২২-২৩)। হজরত জুবায়ের ইবনে মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৪)। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর কোনো আমল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হয় না, ফলে শবে বরাতসহ অন্য ফজিলতপূর্ণ রাতেও তারা ক্ষমার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রতি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আদম সন্তানের আমল আল্লাহর দরবারে উপস্থাপন করা হয়। তখন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর আমল গ্রহণ করা হয় না।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৬১)
টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী : পুরুষদের জন্য অহংকারের উদ্দেশ্যে টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে রাখা শরিয়তে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অহংকারবশত কাপড় ঝুলিয়ে হাঁটে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে দৃষ্টি দেবেন না’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬৬৫)। অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘পুরুষের টাখনুর নিচের যে অংশ কাপড় দ্বারা আবৃত থাকবে তা জাহান্নামে যাবে’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৫৩৩১)।
এ ছাড়া পিতামাতার অবাধ্য সন্তান, ব্যভিচারে লিপ্ত ব্যক্তি ও নেশাগ্রস্ত লোকেরাও শবে বরাতের ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হবে। তবে আল্লাহ তায়ালার রহমত অপরিসীম। কেউ যদি আন্তরিক অনুশোচনার সঙ্গে তওবা করে, পাপ পরিত্যাগ করে এবং ভবিষ্যতে আর পাপের পথে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করে, তা হলে আল্লাহ তায়ালা তাকেও ক্ষমা করবেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গুনাহগুলো নেকিতে পরিবর্তন করে দেন।’ (সুরা ফুরকান : ৭০)
Aminur / Aminur
পার্থিব কামনায় ক্ষতি হয় আখেরাতের
সন্তান জন্মের পর শোকর ও সন্তুষ্টি
পাপ পরিহারের গুরুত্ব
শবে বরাতে রোজা রাখবেন যেভাবে
শবে বরাতেও ক্ষমা নেই যাদের
রবের করুণা অর্জনের প্রেরণা
জ্ঞান ও সভ্যতার চিরন্তন দর্শন
ইসলামের দৃষ্টিতে ক্রয়-বিক্রয়ের লভ্যাংশ
সাহাবিদের ব্যবসায়িক সাফল্যের রহস্য
কুরআন শরিফের অনন্য বৈশিষ্ট্য
মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব
পুরুষের পোশাকের বিধান