ঢাকা রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমল


ডেস্ক রিপোর্ট  photo ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১৮-২-২০২৬ দুপুর ১০:৫৮

রমজান মাস সওয়াব অর্জনের বসন্ত মৌসুম। পরকালের পাথেয় হাসিলের সুবর্ণ সময়। পাপী-তাপীদের পাপমুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ। রমজানের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রমজান- বরকতময় মাস তোমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে। পুরো মাস রোজা পালন আল্লাহ তোমাদের জন্য ফরজ করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়; বন্ধ করে দেওয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। দুষ্ট শয়তানদের এ মাসে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। এ মাসে আল্লাহ কর্তৃক একটি রাত প্রদত্ত হয়েছে, যা হাজার মাস থেকে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে (মহা কল্যাণ থেকে) বঞ্চিত হলো’ (তিরমিজি : ৬৮৩)। রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের এ মাসে গুরুত্বপূর্ণ অনেক আমল রয়েছে।
রোজা পালন : ইসলামের পাঁচ রুকনের অন্যতম রুকন রোজা। আর রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ। সে জন্য রমজানের প্রধান আমল সুন্নাহ মোতাবেক রোজা পালন করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে রোজা রাখে’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। রোজা রাখার ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ইখলাস নিয়ে অর্থাৎ একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রমজানে রোজা পালন করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি : ২০১৪)
অন্য হাদিসে আছে, ‘যে কেউ আল্লাহর রাস্তায় (অর্থাৎ শুধু আল্লাহকে খুশি করার জন্য) এক দিন রোজা পালন করবে, তা দ্বারা আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে ৭০ বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরবর্তী স্থানে রাখবেন।’ (মুসলিম : ২৭৬৭)
জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় : রমজান মাসে ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। অনেকে ফরজ নামাজ আদায়ে উদাসীন থাকেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
কুরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ’ (সুরা নিসা : ১০৩)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘অতএব, সেই নামাজ আদায়কারীদের জন্য দুর্ভোগ, যারা নিজেদের নামাজে অমনোযোগী’ (সুরা আলমাউন : ৪-৫)। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! কোন আমল জান্নাতের অতি নিকটবর্তী? তিনি বললেন, সময়মতো নামাজ আদায় করা।’ (মুসলিম : ২৬৩)
সেহরি খাওয়া : রোজা পালনে সেহরি খাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেহরি খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে। অনেকে সেহরি খেতে চান না, অনেকে আবার রাতের শুরুর অংশে খেয়েই শুয়ে পড়েন। এটি সুন্নাহ পরিপন্থী। হাদিসে এসেছে, ‘সেহরি হলো বরকতময় খাবার। তাই কখনো সেহরি খাওয়া বাদ দিও না। এক ঢোক পানি পান করে হলেও সেহরি খেয়ে নাও। কেননা সেহরির খাবার গ্রহণকারীকে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর ফেরেশতারা স্মরণ করে থাকেন।’ (মুসনাদ আহমাদ : ১১১০১)
ইফতার করা ও করানো : রোজার পূর্ণ সওয়াব অর্জনের জন্য দ্রুত ইফতার করতে হবে। সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করার বিরাট ফজিলত। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করবে, সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে, খেজুর না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করবে। কেননা পানি হলো অধিক পবিত্র’ (আবু দাউদ : ২৩৫৭)। অন্য হাদিসে হজরত আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দীন বিজয়ী হবে- যে যাবৎ মানুষ দ্রুত ইফতার করবে। কারণ, ইহুদি-নাসারারা তা বিলম্বে করে’ (আবু দাউদ : ২৩৫৫)। অন্যকে ইফতার করানোও একটি বিরাট সওয়াবের কাজ। প্রতিদিন কমপক্ষে একজনকে ইফতার করানোর চেষ্টা করা উচিত। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে, তাদের উভয়ের সওয়াব হতে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না।’ (ইবনে মাজা : ১৭৪৬)
তারাবির নামাজ পড়া : তারাবির নামাজ আদায় রমজান মাসের অন্যতম আমল। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াব হাসিলের আশায় রমজানে কিয়ামু রমজান (সালাতুত তারাবিহ) আদায় করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে’ (বুখারি : ২০০৯)।
তারাবিহর সালাত তার হক আদায় করে অর্থাৎ ধীরস্থিরভাবে আদায় করতে হবে। তারাবি জামায়াতের সঙ্গে আদায় করা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে আছে, ‘যে ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে প্রস্থান করা অবধি সালাত (সালাতুত তারাবিহ) আদায় করবে, তাকে পুরো রাত কিয়ামুল লাইলের সওয়াব দান করা হবে।’ (আবু দাউদ : ১৩৭৭)
ইতিকাফ করা : ইতিকাফ অর্থ অবস্থান করা। অর্থাৎ মানুষদের থেকে পৃথক হয়ে সালাত, সিয়াম, কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া, ইসতিগফার ও অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্যে একাকী কিছু সময় যাপন করা।
এ ইবাদতের এত মর্যাদা যে, প্রত্যেক রমজানে রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশ দিন নিজে এবং তাঁর সাহাবিরা ইতিকাফ করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘প্রত্যেক রমজানেই তিনি শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু জীবনের শেষ রমজানে তিনি ইতিকাফ করেছিলেন বিশ দিন’ (বুখারি : ২০৪৪)। উল্লেখ্য, দশ দিন ইতিকাফ করা সুন্নত।
লাইলাতুল কদর তালাশ : রমজান মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম’ (সুরা কদর : ৪)। রাসুল (সা.) আমাদের শেষ দশ দিন লাইলাতুল কদর তালাশ করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত খোঁজ (বুখারি : ২০২০)। অথচ আমরা সেই দশ দিন ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকি, যা রমজানের আদবের পরিপন্থী।
দান-সদকা করা : পুণ্য অর্জনের মাস রমজান। রোজা-নামাজ ইত্যাদির পাশাপাশি দান-সদকার মাধ্যমেও ফজিলত অর্জন করতে হবে। এ মাসে বেশি বেশি দান-সাদকা করার চেষ্টা করা চাই। এতিম, বিধবা ও গরিব-মিসকিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া চাই।
যাদের ওপর জাকাত ফরজ তার হিসাব করে এ মাসে জাকাত দেওয়া উত্তম। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) এ মাসে বেশি বেশি দান-খয়রাত করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল আর রমজানে তার এ দানশীলতা আরও বেড়ে যেত।’ (বুখারি : ১৯০২)
দোয়া-ইসতিগফার করা : ইবাদতের মাস রমজানে বেশি বেশি আমলের কথা রয়েছে। কিন্তু আমরা অনেকেই ব্যস্ত থাকি দুনিয়াবি কাজে। এটি কাম্য নয়। এ মাসে বেশি বেশি দোয়া-ইসতিগফার করা উচিত। হাদিসে এসেছে, ‘ইফতারের মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।
মুক্তির এ প্রক্রিয়াটি রমজানের প্রতি রাতেই চলতে থাকে’ (আল জামিউস সাগীর : ৩৯৩৩)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘রমজানের প্রতি দিবসে ও রাতে আল্লাহ তায়ালা অনেককে মুক্ত করে দেন। প্রতি রাতে ও দিবসে প্রতি মুসলিমের দোয়া কবুল করা হয়।’ (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব : ১০০২)
তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া : রমজান মাসে নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রমজান ছাড়াও সালাতুত তাহাজ্জুদ পড়ার মধ্যে বিরাট সওয়াব এবং মর্যাদা রয়েছে। রমজানের কারণে এ ফজিলত বহুগুণে বেড়ে যায়।
যেহেতু সেহরি খাওয়ার জন্য উঠতে হয় সে জন্য রমজান মাসে সালাতুত তাহাজ্জুদ আদায় করার বিশেষ সুযোগও রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ অর্থাৎ তাহাজ্জুদের নামাজ।’ (মুসলিম : ২৮১২)

Aminur / Aminur