রমজান: ইবাদতের বসন্তে শোষণের বিষাদ - আমাদের ইমান কি তবে কেবলই আনুষ্ঠানিকতা?
আকাশে বাঁকা চাঁদ উঠলে বিশ্বজুড়ে মুমিনরা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এক পরম তৃপ্তিতে। মাসটি আত্মশুদ্ধির, মাসটি নিজের গুনাহের পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে পবিত্র করার। যেখানে ইসলামের শিক্ষা হলো নিজের অন্ন অন্যকে বিলিয়ে দেওয়া, সেখানে বাংলাদেশের মাটিতে রমজান মানেই হলো এক পরিকল্পিত অর্থনৈতিক হত্যাকাণ্ড। ৯২ ভাগ মুসলিমের এই দেশে আমরা কপালে সিজদার চিহ্ন নিয়ে, মুখে তসবিহ নিয়ে হাসিমুখে নিজেরই ভাইয়ের গলার ওপর শোষণের ছুরি চালাচ্ছি।
১. আত্মশুদ্ধি নাকি পকেট শুদ্ধি? (প্রথম ১০ দিন): রমজান এসেছিল আমাদের রিপুগুলোকে ভস্মীভূত করতে; আমাদের শেখাতে যে, ক্ষুধার জ্বালা কতটা যন্ত্রণার। কিন্তু বাংলাদেশের সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা এই মাসকে বেছে নিয়েছে তাদের বছরের সেরা মুনাফা শিকারের মৌসুম হিসেবে। প্রথম ১০ দিন নিত্যপণ্যের বাজারে চলে অমানবিক এক লুণ্ঠন।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: যেখানে আমাদের লজ্জা পাওয়া উচিত - সৌদি আরব ও কাতার: রমজান উপলক্ষে সুপারশপগুলো পণ্যের দাম ৩০% থেকে ৭০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। লন্ডন ও আমেরিকা: অমুসলিম মালিকানাধীন শপগুলোও (টেসকো, ওয়ালমার্ট) রমজান উপলক্ষে বিশেষ ছাড় দেয়। বাংলাদেশ: অথচ আমাদের এখানে রোজা এলে মানুষ ভয়ে কাঁপে যে কাল সকালে চিনির দাম কত হবে! এটি কি একটি মুসলিম দেশের চিত্র হতে পারে?
হৃদয়বিদারক বাস্তবতা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করবেন। (সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯)"। অথচ আমাদের ব্যবসায়ীরা রমজানের শুরুতেই দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে নরক বানিয়ে দেয়। এটি কি আত্মশুদ্ধি, নাকি আত্মার বিসর্জন?
২. স্বপ্নের লাশের ওপর পোশাকের বীভৎস বাণিজ্য (দ্বিতীয় ১০ দিন): দশ রোজা পার হতেই শুরু হয় ঈদের কেনাকাটা। এদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ সারা বছরের জমানো টাকা দিয়ে পরিবারকে একটু নতুন পোশাক দিতে চায়। আর এই পবিত্র আবেগকে পুঁজি করেই চলে দ্বিতীয় ধাপের লুণ্ঠন।
নিষ্ঠুর বাস্তবতা: একটি সাধারণ পোশাকের গায়ে চকচকে লেবেল লাগিয়ে ৩-৪ গুণ বেশি দাম হাঁকানো হয়। ব্যবসায়ীরা ভুলে যান যে, তারা কেবল কাপড় বিক্রি করছেন না, তারা এক একটি পরিবারের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে জুয়া খেলছেন। যে বাবা নিজের ছেঁড়া পাঞ্জাবিটা আরও এক বছর পরার সিদ্ধান্ত নিয়ে মেয়ের জন্য একটা জামা কিনতে গিয়ে শপিং মলের কোণে দাঁড়িয়ে টাকার হিসাব মেলান, তার সেই নীরব কান্নার বিচার কে করবে? রাসূলের (সা.) সতর্কবার্তা: রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত কঠোরভাবে বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।(সহীহ মুসলিম: ১০১)"। আপনি যদি রাসূলের (সা.) দলভুক্তই না হন, তবে এই রোজা-নামাজ দিয়ে কার কাছে মুক্তি চাইছেন?
৩. নাড়ির টানে হাহাকার আর পরিবহন মাফিয়ার থাবা (শেষ ১০ দিন): রমজানের শেষ সময়টুকু যখন ইবাদতে কাটার কথা, তখন আমাদের রাজপথে চলে পৈশাচিক উল্লাস। বাড়ি ফেরার টিকিটের জন্য এক বুক হাহাকার নিয়ে স্টেশনে স্টেশনে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলোকে আমরা কি দেখি না?
বাস্তব চিত্র: পরিবহন মালিকরা যেন যমদূতের মতো মানুষের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেয়। মা-বাবার সাথে ঈদ করতে যাওয়ার ব্যাকুলতাকে জিম্মি করে তারা যখন তিনগুণ ভাড়া আদায় করে, তখন সেই টাকায় কি উৎসবের বরকত থাকে? বিবেকের আদালত: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি মানুষের ওপর দয়া করে না, আল্লাহও তার ওপর দয়া করেন না।(সহীহ বুখারী: ৭৩৭৬)"।
নিজের গুনাহ মাফ নাকি অন্যের দীর্ঘশ্বাস কেনা?: আমরা রাতের অন্ধকারে চোখের জল ফেলে আল্লাহর কাছে মাফ চাই, আর দিনের আলোতে ইফতারের পণ্যে ভেজাল দেই কিংবা দাম বাড়িয়ে দরিদ্রের হাহাকার কিনি। আমাদের হাত আজ সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। আমরা মুখে ইমানদার কিন্তু কাজে পিশাচের চাইতেও অধম হয়ে দাঁড়িয়েছি। একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন: আপনি যে অতি-মুনাফার টাকায় যাকাত দিচ্ছেন বা সদকা করছেন, সেই টাকার প্রতিটি পয়সায় কি অন্য এক ক্ষুধার্ত শিশুর আর্তনাদ লেগে নেই? রাসূল (সা.) অত্যন্ত কঠোরভাবে বলেছেন: "হারাম খেয়ে যে শরীর গঠিত হয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস: ২৭৭২)"। মজুদদারির অভিশাপ: রাসূল (সা.) বলেছেন, "আমদানিকারক রিযিক পায় আর মজুদদার অভিশপ্ত হয়। (ইবনে মাজাহ: ২১৫৩)"। আজ বাংলাদেশের প্রতিটি সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী কি তবে আল্লাহর সেই অভিশাপ মাথায় নিয়ে সেহরি ও ইফতার করছেন?
আমাদের মুক্তি কোথায়?: হে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমাজ, রমজান আপনার ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানোর মাস নয়, এটি আপনার কবরের পুঁজি গোছানোর মাস। আপনি যখন জিনিসের দাম এক টাকা বাড়িয়ে দেন, তখন হয়তো কোনো অভাবী মানুষের ইফতার থেকে একটি খেজুর কমে যায়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বলেছেন: "হে মুমিনগণ, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।(সূরা আন-নিসা: ২৯)"। এই জুলুমের বিচার দুনিয়ার আদালতে না হলেও, সেই মালিকের কাছে হবে যেখানে একটি অণু পরিমাণ কাজেরও হিসাব নেওয়া হবে।
আসুন, আমরা অন্তত একবার মানুষ হই। ইবাদতের এই মাসটিকে সত্যি সত্যি আত্মশুদ্ধির মাস বানাই। অন্যের গলার ছুরি সরিয়ে তার মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য খুঁজি।
এমএসএম / এমএসএম
আশুরা: ইতিহাস, ফজিলত ও শিক্ষার এক মহিমান্বিত দিন
কেনাকাটার ব্যস্ততায়ও ইবাদত
নামাজে সালাম ফেরানোর সঠিক নিয়ম
দোয়া কবুলের জন্য যে নিয়মগুলো মানতে হবে
ইসলামে মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক
সাহাবিরা যেসব খেলাধুলা করতেন
পবিত্র আশুরা ২৬ জুন
নতুন চাঁদ দেখা: অবহেলিত এক গুরুত্বপূর্ণ বিধান
মহররম মাসের অপরিসীম গুরুত্ব
ঈমানের সুরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
মানুষ জান্নাত-জাহান্নামে যাবে যে দুই অঙ্গের কারণে
ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্ববোধের গুরুত্ব