ঢাকা মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬

কবি ফররুখ আহমদের স্মৃতিবিজড়িত বসতভিটা বিলীন হওয়ার পথে, হতাশায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের


মিজানুর রহমান, মাগুরা photo মিজানুর রহমান, মাগুরা
প্রকাশিত: ৭-৪-২০২৬ দুপুর ২:২৩

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রদূত সৈয়দ ফররুখ আহমদ। সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে তিনি মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও মুক্তির কথা উচ্চারণ করেছেন দৃঢ় কণ্ঠে। মুসলিম সমাজের জাগরণ এবং সামগ্রিক মানবমুক্তির আহ্বান তার কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে শক্তিশালীভাবে।, সাত সাগরের মাঝি সিরাজাম মুনীরা,নৌফেল ও হাতেম সহ বহু কালজয়ী গ্রন্থের স্রষ্টা এই কবি জীবদ্দশায় একুশে পদক (১৯৭৭) স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮০) এবং ইসলামী ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৮৪) অর্জন করেন। অথচ বাংলা সাহিত্যের এই বরেণ্য কবির স্মৃতিবিজড়িত বসতবাড়ি আজ বিলীন হওয়ার পথে।

মাগুরা সদরের শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে কবি ফররুখ আহমদের জন্ম। শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে মধুমতি নদীর তীরে অবস্থিত এই গ্রামটির এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯১৮ সালের ১০ জুন জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা সৈয়দ হাতেম আলী ছিলেন একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর এবং মা রওশন আক্তার। বাবার পেশাগত পরিচয়ের কারণে একসময় এই বাড়িটি স্থানীয়ভাবে দারোগার বাড়ি নামে পরিচিত ছিল। সময়ের পরিক্রমায় এখন সেটি পরিচিত ‘কবির বাড়ি’ হিসেবেই।
কবির স্মৃতিকে ধারণ করে রাখতে বাড়ির আশপাশে কয়েকটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও বর্তমানে সেগুলোর অধিকাংশই ধ্বংসের মুখে। সরেজমিনে দেখা যায়, কবির বসতভিটার মাত্র প্রায় ২০ মিটার দূর দিয়ে নির্মিত হচ্ছে রেললাইন। রেললাইনের বিশাল পিলারগুলো ক্রমেই এগিয়ে আসছে কবির বাড়ির দিকে। এতে করে কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলো রেললাইনের নিচে চাপা পড়ে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দূর থেকে ধেয়ে আসবে রেলগাড়ি,এই আশঙ্কায় একদিন হয়তো কবির শতবর্ষী স্মৃতিবাহী এই বাড়িটিকেও জায়গা ছেড়ে দিতে হবে।

শত বছরের বেশি আগে যে টিনের ঘরটিতে কবির জন্ম হয়েছিল, সেই ঘরেই এখনও বসবাস করছেন তার ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মারুফ আহমদ মাক্কু এবং সৈয়দ মোস্তাক আহমদের পরিবারের সদস্যরা। 
পরিবারের সদস্যরা ঘরটিকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে যত্নে ধরে রাখার চেষ্টা করলেও এত বছরেও সরকারি কোনো সংস্কার বা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ঘরের ভেতর ও সামনে ঝুলছে কবির বিভিন্ন ছবি এবং সংরক্ষিত আছে তার কিছু বই ও স্মারক।
দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় টিনের ঘরটি এখন প্রায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি হলেই ছিদ্রযুক্ত টিনের চাল দিয়ে পানি চুঁইয়ে পড়ে মেঝেতে। ঘরের ভেতরের আসবাবপত্রেও মরিচা ধরেছে। জরাজীর্ণ এই ঘরটিই যেন আজ কবির স্মৃতির শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বাড়িতে ঢুকতেই দেখা মেলে কবির ছোট ভাই প্রয়াত সৈয়দ মোস্তাক আহমদের স্ত্রী ৭০ বছর বয়সী ফাতেমা বেগমের। তিনি জানান, কবির আট ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে বর্তমানে দুই ছেলে ও এক মেয়ে জীবিত আছেন এবং তারা সবাই ঢাকায় বসবাস করেন। পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ঢাকায় থাকায় কবির বসতভিটা দেখাশোনার দায়িত্ব এখন মূলত তার ওপরই।
ফাতেমা বেগম বলেন, সরকার কবির বাড়ির উপর দিয়ে রেললাইন নিতে চাইছে। আমরা এটা কোনোভাবেই হতে দেব না। আমাদের দাবি, কবির স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িটি অক্ষত রেখে অন্তত ২০০ মিটার দূর দিয়ে রেললাইন নির্মাণ করা হোক।

কবির ভাতিজি সৈয়দা দিলরুবা অভিযোগ করে বলেন, গত ২৭ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেট সাজ্জাদ হোসেন এসে বাড়ির আশপাশের বিভিন্ন ফলের গাছ ভ্যাকু দিয়ে উপড়ে ফেলেন। তিনি দাবি করেন, কবি যেখানে বসে কবিতা লিখতেন সেই স্থানটিও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাধা দিতে গেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অসদাচরণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সৈয়দা দিলরুবা বলেন, আমরা বাধা দিতে গেলে আমাদের গায়ে পর্যন্ত হাত তোলা হয়। এতে আমরা কয়েকজন আহত হই। এরপর থেকে আমরা আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছি। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। পাশাপাশি সরকারের কাছে আমাদের দাবি কবির বসতভিটা অক্ষত রেখে রেললাইন নির্মাণ করা হোক।

স্থানীয় বাসিন্দারাও কবির বসতভিটা রক্ষার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, কবি ফররুখ আহমদ শুধু এই এলাকার নন, তিনি পুরো দেশের এবং বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। তার স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাক এটা কেউই চান না।
স্থানীয়রা বলেন, এই জায়গাটি সংরক্ষণ করে এখানে একটি স্মৃতি জাদুঘর, পাঠাগার বা পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে দেশ-বিদেশ থেকে দর্শনার্থীরা এসে কবির স্মৃতিচারণ করতে পারতেন।

কবি ফররুখ স্মৃতি পাঠাগারের সভাপতি সৈয়দ রিপন আহমদ বলেন, কবির বাড়িটি রক্ষার দাবিতে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধনসহ জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, কবির বাড়ি রক্ষার প্রশ্নে আমরা একবিন্দুও সরে দাঁড়াব না। যতদিন প্রয়োজন ততদিন আন্দোলন চালিয়ে যাব, যতক্ষণ না কবির বসতভিটা সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে কবির ছেলে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা সৈয়দ ওয়াহিদুজ্জামান বাচ্চু বলেন, সরকার চাইলে এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে সংরক্ষণ করে এখানে পাঠাগার, জাদুঘর কিংবা পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে। এতে নতুন প্রজন্ম কবির জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।
তিনি বলেন, কবির স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়ি ধ্বংস করার পরিকল্পনা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারের কাছে আমাদের একটাই আবেদন বাড়িটি অক্ষত রেখে এমনভাবে উন্নয়ন করা হোক, যাতে এটি নতুন প্রজন্মের জন্য স্মৃতির স্থাপনা হয়ে থাকে।

বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের স্মৃতিবাহী এই বাড়িটি এখন সময়ের সঙ্গে লড়াই করছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কবি ফররুখ আহমদের জন্মভিটাও হয়তো ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে এমন আশঙ্কাই করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যরা

এমএসএম / এমএসএম

কুড়িগ্রামে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে প্রস্তুতি সভা

চউক'র ১১ গ্রেডের কর্মচারীকে ১৪তম গ্রেডে পদোন্নতি

ঠাকুরগাঁওয়ে মাল্টিস্টেকহোল্ডার প্লাটফর্ম গঠন ও পরিচালনা বিষয়ক কর্মশালা

থানা চত্বরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা না হওয়ায় সরকারি সংবাদ বর্জনের ঘোষণা

হাটহাজারীতে জোরপূর্বক পুকুর ভরাট করার দায়ে এক ব্যাক্তিকে জরিমানা

কোনাবাড়ী থানার নতুন ভবনের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন

গ্রামীণ ঐতিহ্যের ভরসা হয়ে টিকে আছে শতবর্ষী ‘দাসের বাজার"

হামের উপসর্গে রাজশাহীতে ৩ শিশুর মৃত্যু

নাতিকে স্কুলে দিয়ে ফেরার পথে রেললাইনে শেষ যাত্রা: লোহাগড়ায় মর্মান্তিক মৃত্যু

মোহনগঞ্জে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যতিক্রমী উন্মুক্ত আলোচনা

শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি নিরসনে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র ভূঞাপুরে স্থানান্তরের দাবি: প্রশাসনের নিকট স্মারকলিপি পেশ

নলছিটির দপদপিয়ায় এ্যাডভেন্সার শিপ বিল্ডার্স লিঃ এর জমির গাছ কেটে নেয়ার অভিযোগ

কবি ফররুখ আহমদের স্মৃতিবিজড়িত বসতভিটা বিলীন হওয়ার পথে, হতাশায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের