ছোটগল্প
নিঃসঙ্গ ভোর -সুলেখা আক্তার শান্তা
নিঃসঙ্গ ভোর
সুলেখা আক্তার শান্তা
ওমর সুদর্শন। কিন্তু তার জীবন পঙ্কিল। জন্ম থেকে এই পর্যন্ত ওমরের কেটেছে চরম অবহেলায়। জীবনে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। ধপ করে যেন আকাশ থেকে পড়েছে সে। কে তার বাবা, কে তার মা কিছুই জানে না সে। শুধু এক বুড়ির কথা তার মনে আছে। নানি বলে ডাকত তাকে। সেই বুড়ির কাছে শুনেছে বুড়ি তার আসল নানি না। এক শীতের রাতে রাস্তায় বসে কাঁদছিল ওমর। তাকে তুলে বুড়ি নিজের কম্বলের ভেতর জায়গা দিয়েছিলেন। সেদিন থেকে বুড়ির সেই ভাঙ্গা ঘরটাই ওমরের আশ্রয়। ওমরের বয়স যখন আট-দশ, একদিন বুড়ি আর ঘুম থেকে ওঠেনি। নিস্তব্ধ সকালে ওমর ডাকাডাকি করে, জোরে নাড়াচাড়া করে কোনো সাড়া নেই। বুড়ি মারা গেছে!
বুড়ির মৃত্যুর পর প্রথম বাস্তবতা ছিল খাওয়া নিয়ে। তাকে আর কেউ খেতে ডাকে না। প্রতিবেশীরা উঁকি মেরেও দেখে না। ক্ষিদের জ্বালায় পেট জ্বলতে থাকে। খাওয়ার লড়াই দিয়েই শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। ভিখারি হলো ওমর। পরে ছোটোখাটো চুরি, হাত সাফাই, ধীরে ধীরে সে মিশে গেল অপরাধের জগতে। সমাজের অবহেলা আর সংসারের উদাসীনতা তাকে গড়ে তুলল সন্ত্রাসী হিসেবে।
শেফালী ছিল ওমরের সন্ত্রাসের শিকার। এক রাতে ওমরের কাছে শেফালী নির্যাতনের শিকার হয়। নিষ্ঠুর সেই রাত শেফালীর সবকিছু কেড়ে নেয়। সমাজ তাকে গ্রহণ করে নেই, নিজের ঘরও তার স্থান হয়নি। অপবিত্র শেফালী আর কারো ঘরে ঠাঁই পায়নি। কিন্তু নারীর শাশ্বত চাওয়া একটি ঘর, একটি আশ্রয়। এই চাওয়ার মাঝেই টিকে আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, জন্ম থেকে জন্মান্তর। শেফালী সেই চাওয়া নিয়েই বাঁচতে চেয়েছিল। নারী অপরাধ না করেও অপরাধী হয়। নিষ্ঠুর প্রতিকূল পরিবেশের মাঝেই সে ওমরকে আশ্রয় করে বাঁচতে চায়।
শেফালী ধীরে ধীরে ওমরকে বোঝাতে সক্ষম হলো—ভালোবাসা, প্রেম, প্রীতি বলে কিছু আছে। নারীর ভালোবাসা ছাড়া সংসার অসম্পূর্ণ, জীবন অসম্পূর্ণ। ওমর প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি। সে তো কখনো ভালোবাসা পায়নি। কিন্তু শেফালীর স্পর্শ, তার সহিষ্ণুতা, তার মমতা একদিন ওমর গলাধঃকরণ করে। শেষ পর্যন্ত ওমর মেনে নেয় শেফালীর কথা। তারা বিয়ে করে। সংসারী হয়। নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করে।
কিন্তু ওমরের বিগত জীবনের ছায়া তার পিছু ছাড়ে না। এলাকায় কিছু ঘটলেই পুলিশ ওমরকে ধরে নিয়ে যায়। অথচ অপরাধ অন্য কেউ করে। ওমরের নাম সন্দেহের প্রথম তালিকায় থাকে। তারপর থানা, পুলিশ, উকিল, কোর্ট, কাচারি সব ধকল সহ্য করতে হয় শেফালীকে। দিতে হয় ঘুষ, খরচ করতে হয় উকিলের ফি। একদিন পুলিশ ওমরকে মার্ডার কেসের আসামি হিসেবে গ্রেফতার করে। প্রতিবেশী এক ব্যক্তি খুন হয়েছে। ওমর নিরপরাধ, কিন্তু তার অতীত তাকে বাঁচাতে দেয়নি। বিচারে রায় হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। শেফালী একা পড়ে যায়। স্বামীহীনা, সমাজহীনা, নিঃস্ব। অপেক্ষায় অপেক্ষায় হারিয়ে যায়।
ওমর কারাগারে ভালো আচরণের কারণে দশ বছর পর মুক্তি পায়। জেলের গেট পেরিয়ে বেরিয়ে এসে ওমর শুধু শেফালীকেই খুঁজেছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে, ঘুরে ঘুরে সেই পুরোনো বস্তি, পাড়া, গ্রাম কোথাও শেফালির দেখা মেলে না। কেউ জানে না কোথায় গেছে সে। কেউ বলে মরে গেছে, কেউ বলে অন্য জায়গায় চলে গেছে।
ওমরের কাছে তখন জীবন অর্থহীন মনে হয়। শেফালিই ছিল তার ভর ভরসা। সেই একমাত্র মানুষ, যে তাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল। তাকে ছাড়া সংসার, ভালোবাসা, আশ্রয় সব মিথ্যে। এখন ওমর বুঝতে পারে, একবার যে ভালোবাসা পায়, তার জন্য হারানোটা কত বড় শাস্তি। ওমর দাঁড়িয়ে থাকে ফাঁকা রাস্তায়। কোথাও কোনো ঠিকানা নেই। শুধু চারপাশে ধুলো আর অবহেলা যেন ফিরে এসেছে শৈশবের সেই ভোর বেলায়, যখন বুড়ি আর ঘুম থেকে ওঠেনি।
শান্তা / শান্তা
ইবনে খালদুনের ‘আল মুকাদ্দিমা’ সমাজবিজ্ঞান রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির আকরগ্রন্থ এস ডি সুব্রত
হাহাকার জ. ই. মামুন
রূপান্তর রাত্রি-সুলেখা আক্তার শান্তা
বক্তা রেজাউদ্দিন স্টালিন
নিঃসঙ্গ ভোর -সুলেখা আক্তার শান্তা
মে দিবসের কবিতা: ব্যবধান
সড়কে সচেতনতা
সমান বিচার
কবি অনিতা আনন্দ কবিতার জন্মদিন আজ
রঙ্গ ব্যঙ্গ
একজন ফাঁকিবাজ
বৃষ্টি ভালোবাসো!