প্রদীপ সেন, আগরতলা
“সৃষ্টিসুখের উল্লাসে”
লোকটার পেশা দোকানদারি। শিক্ষিত, রুচিশীল, শান্তিপ্রিয়। বড্ড বেশি স্বাভিমানী। রাজনৈতিক দলের মিছিলে হাঁটেনি। তাই বেচারা বেড়ালের ভাগ্যে সিঁকেও ছিঁড়েনি! ছিল স্কুল-কলেজের বান্ধবী অপূর্বা মাইতি। ওর মুরোদ দেখে গতিবিজ্ঞানের মন্দনের মতো সেও দোলন হ্রাস করতে করতে ওকে পরিক্রমণ করা ছেড়ে দিয়ে অন্য মৌলের সাথে জোট বেঁধেছে। সে শুধু অবুঝের মতো চেয়েই দেখেছে।
সেই ব্যর্থ প্রেমিক, পরাজিত জীবন-সৈনিকই ছেলে থেকে লোকটা হয়ে রকমারি জিনিসের দোকান খুলে বসেছে। মা অনেক চেষ্টা করেও হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। ছেলে চিরকুমার হয়েই থাকবে বলে গোঁ ধরে বসে আছে। অগত্যা ছোটো ভাই অভীককে সংসারী করে সংসার গুছিয়ে মা নাতি সৌম্যকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।
এভাবেই লোকটা মানে অনিন্দ্য নিষ্ক্রিয় মৌলের মতো সংসারে আছেও আবার নেইও। ভাই পুলিশের মাঝারি কর্তা। বেতনের চাইতে অবেতনের স্বাস্থ্য বহুগুণ বেশি। সংসারে অভাব থাকার কথা নয়, নেইও। তবুও অনিন্দ্যর মনটা কেমন যেন হয়ে থাকে সবসময়। সুর-কাটা গানের সাথে বাদ্যযন্ত্রের ঐকতান কেমন বেসুরো বেসুরো লাগে তার কাছে। অব্যবস্থার সাথে মানুষ কী অদ্ভুতভাবে অভিযোজিত হয়ে দিব্বি সুস্থ সবলভাবে বেঁচে আছে! অনিন্দ্য এই অব্যবস্থার সাথে লীন হতে না পেরে কেবল খাবি খেতে খেতেই টিকে আছে।
সবসময় ডুবে থাকে দোকানদারিতে আর বইয়ে। অবসর পেলে বাঁধানো খাতায় কবিতা লিখে, গল্প লিখে। নিজেই নিজের লেখা পড়ে, কাটাকুটি করে ঠিক করে। মুখবইয়ে লেখালেখিও করে। কিছু কিছু মানুষ কমেন্ট করে, বাহবাও দেয়। কৃত্রিম অকৃত্রিমের বিচার না করেই নিজের অগোছালো নিরানন্দ জীবনে অনিন্দ্য ওই আনন্দটুকু নিয়েই বেঁচে থাকার চেষ্টা করে চলেছে।
বিনিময় মূল্য দক্ষিণা দিয়ে কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিনের পাতায় তার গল্প-কবিতাও প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছে। তার দোকানদার মনের দখল নিতে শুরু করেছে স্ববিবেচিত লেখকসত্তা।
সেদিন ছোটো ভাইয়ের ছুটির দিন। সে দোকানে এলো। আরো কিছু পুঁজি ঢেলে দাদার দোকানটার শ্রীবৃদ্ধি ঘটাবে - এই ছিল তার উদ্দেশ্য। হঠাৎ তাকের ওপর ম্যাগাজিনগুলোর ওপর চোখ পড়ে তার। দাদার লেখা ছাপার অক্ষরে! একবার চোখ বুলিয়ে নিল। মন্দ লাগেনি।
- দাদা! কী ভালো লিখেছিস রে! এদ্দিন সব চেপে রেখেছিস্? পারলি?
অনিন্দ্য বোকার মতো হাসে।
ধেৎ, কী এমন ছাই লিখি যে ঢোল পেটাবো। অবসর সময়ে নেই কাজ তো খই ভাজ আর কি। আবোল তাবোল লিখি, ওসব ধর্তব্য নয় রে ভাই। ওরা কি ফ্রিতে ছাপায় নাকি? দু'শ আড়াই শ ছাড়তে হয় এক একবার। তারপর না ছাপায়।
- এক কাজ কর্ না। বইমেলা আসছে। তুই তোর বই বের কর্।
দূর পাগল। কত টাকা খরচ হবে জানিস্? ও টাকায় দোকানে শীতের কসমেটিক্স তুললে বেশ চলতো। পুরো টাকাটাই জলে যাবে।
- সে চিন্তা আমার। তোকে ভাবতে হবে না। কিছুই জলে যাবে না। আমি দোকানে মালও তুলবো তোর বই ছাপানোর সব খরচও দেবো। তুই লেখা রেডি কর্।
অনিন্দ্য একবার ছোটো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল। তার কি সেই প্রতিভা আছে? কে পড়বে তার বই? শুধু পড়ে পড়ে ধুলো মাখবে। উত্তেজনাও হচ্ছে। তার একক বই বেরুবে? অভীক নাছোরবান্দা।
সাত দিন ধরে খুব যত্ন করে গল্পগুলো বাছাই করেছে, প্রয়োজনীয় সংশোধন পরিবর্তন করে ছোটো ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছে সে পাণ্ডুলিপি।
অনিন্দ্যর চোখে ভাবী বইমেলার ছবি। সে বসে আছে,
বইপ্রেমিকেরা আসছে, ঘেঁটেঘুটে দেখছে, কেউ কেউ কিনছেও। বইয়ে তার অটোগ্রাফ নিচ্ছে কেউ কেউ। স্টলে ওর ভাইয়ের চেনাজানা লোকগুলো কিনছে, অভীকও উপস্থিত আছে। আর সে ডুবে আছে সৃষ্টিসুখের উল্লাসে।
শান্তা / শান্তা