সুলেখা আক্তার শান্তা
“অনুভবের অনুপস্থিতি”
বিয়ের দিন নীলাঞ্জনার সাজ দেখে সুমনের চোখে অশ্রু। গাঁটছড়া বাঁধার সময় মন্ত্রপাঠের আওয়াজে দুজনের হাত কাঁপছিল। শত শত আলোর মালা, ফুলের সুবাস, বরযাত্রীর হুল্লোড়—সব মিলিয়ে সেদিন পৃথিবীটা ছিল নব দম্পতির জন্য রঙিন কাঁচের মতো। সুমন বলেছিল, ‘তুমি আমার জীবনের প্রথম সূর্যোদয়।’ নীলাঞ্জনা হেসেছিল, তার হাসিতে ছিল স্বপ্নের ব্যঞ্জনা।
কাঁচ সেই সৌধ ভেঙে যায় অতি সহজে। বিয়ের এক মাস পার হতেই স্বপ্নের প্রলেপ খসে পড়তে থাকে। প্রথম দিন সুমনের মা নীলাঞ্জনার রান্নায় টিপ্পনি কাটেন, ‘বৌমা, নুনটা বুঝি তুমি মাপো না?’ দ্বিতীয় সপ্তাহে সুমন অফিস থেকে ফিরে বিরক্ত, কারণ নীলাঞ্জনা তাঁর প্রিয় খবরের কাগজটা গুছিয়ে রাখেনি। তৃতীয় সপ্তাহে নীলাঞ্জনার কেনা নতুন শাড়িটা দেখে শাশুড়ি বলেন, ‘এতো টাকা নষ্ট। সংসার চালাতে শেখো আগে।’ নীলাঞ্জনা চুপ করে থাকত। তার মুখে তখনও হাসি লেগে থাকে, কিন্তু চোখের কোণে জমে ওঠে বিষণ্নতার শিশির। সুমন ভাবে এ সবই ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’। কিন্তু কোনও কোনও অ্যাডজাস্টমেন্ট ঘুনে ধরে সম্পর্কের বুননে।
ছয় মাস পর নীলাঞ্জনা কাজে ফেরার ইচ্ছে প্রকাশ করে। সুমনের বাবা বললেন, ‘আমাদের ঘরের মেয়ে কি চাকরি করবে? লোকে কী বলবে?’ সুমন চুপ করে থেকে। নীলাঞ্জনা রাতের অন্ধকারে বালিশে মুখ চেপে কেঁদে, কিন্তু সকালে উঠে আবার চোখে কাজল দেয়। কারণ সমাজের চোখে ‘বউ’কে সব সময়‘ সেজে’ থাকতে হয়।
এক বছর কেটে গেল। গর্ভপাতের যন্ত্রণা নীলাঞ্জনাকে আরও নীরব করে দিলো। সুমন তখনও অফিসের চাপে ব্যস্ত, কোনও সময় জিজ্ঞেস করল না, “তোমার কেমন লাগছে?” বরং বলল, ‘আবার চেষ্টা করলে হয়|’ যেন সন্তান একটা প্রজেক্ট, আর নীলাঞ্জনা একজন কর্মী।
নীলাঞ্জনার মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো—এই যে বিয়ে, যেখানে হাজার হাজার টাকার আয়োজন, অথচ শুধু কারও ‘অভিমান’-এর দাম নেই। যে কয়েকটি দিনের জন্য বরপক্ষ এসে বলে ‘আমরা সব সহ্য করব’, সেই কথাগুলো কোথায় মিলিয়ে গেল?
দুই বছর পরে এক সন্ধ্যায়, সুমনের ক্লাসরুমের পুরনো প্রেমিকা ফোন করেছিল। সুমন ভুল করে বসার ঘরে ফোন ধরেছিল, নীলাঞ্জনা শুনেছিল—ওই কন্ঠে বলছে, ‘তোমার বিয়ে হয়েছে শুনে আমার খুব খারাপ লেগেছে।’ সুমন হেসে বলল, ‘সব বিয়েই তো কমপ্রোমাইজ।’ নীলাঞ্জনা সিঁড়ি ধরে উপরে উঠছিল, পা থেমে গেলো। ‘কমপ্রোমাইজ’—এই শব্দটা যেন তার বুকে ছুরির মতো বিঁধল।
সে রাত দুজনের মধ্যে কথা হয়নি| কিন্তু নীলাঞ্জনার নীরবতার ভেতর ফুটতে থাকে প্রতিবাদের বীজ| সকালে সুমন যখন অফিসে যাবার জন্য ˆতরি হচ্ছিল, নীলাঞ্জনা বলল, ‘আমি চাকরি করব।’ সুমন চাবির গোছা ঝনঝনিয়ে বলল, ‘এখনও ওসব নিয়ে তুমি ভাবো?’ নীলাঞ্জনার চোখে প্রথম বার আগুন জ্বলে উঠল, ‘আমার যখন কিছুই নেই, তখন ভাবারও তো কিছু নেই।’
তারপর শুরু হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট সংঘা। শাশুড়ি বলেন ‘বৌ নাকি বিদ্রোহী হচ্ছে’, সুমন বলে ‘তুমি বদলে গেছো’। নীলাঞ্জনা হাসতে হাসতে বলে, ‘আমি বদলাইনি, আমি শুধু হয়ে গেছি যা আমি ছিলাম।’
একদিন সকালে নীলাঞ্জনা স্যুটকেস গুছিয়ে বাবার বাড়ি ফিরে গেল| সুমন ভেবেছিল, দু’দিন পর ফিরবে। কিন্তু ফিরল না। তিন মাস চেষ্টা করে সুমন, তারপর হার মানল। ডিভোর্সের কাগজে সই করার সময় সুমন জিজ্ঞেস করল, ‘আমি কী ভুল করেছিলাম?’ নীলাঞ্জনা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি ভুল করোনি, তুমি শুধু আমাদের ‘আনন্দ’-কে ‘বাধ্যবাধকতা’ ভেবেছিলে। বিয়েতে যে ভালোবাসার শুরু, সেটা তোমার মনে ছিল না।’
আজ নীলাঞ্জনা শহরের এক স্কুলে পড়ায়। সুমন রয়েছে সেই পুরনো বাড়িতে, যেখানে এখনও বিয়ের মঞ্চের প্যান্ডেলের খুঁটিগুলো পড়ে আছে। সে প্রায়ই ভাবে—হাজার আনন্দের আয়োজন, অথচ দু’টি হৃদয়ের জন্য একটু বুঝতে পারাটাই ছিল আসল আয়োজন। যেটা তারা করেনি, অনেকেই করতে পারে না। এমন কি কেউ আছে বুকে হাত দিয়ে বলতে পারে আমরা সুখী। সুখ নেই তবু সুখের তালাশে কেটে যায় জীবন অগোচরে।
বিষাদের শেষে সুমন গল্পটা যেখানে শুরু করেছিল, সেখানেই ফিরে যায়—বিয়ের মঞ্চে ফুলের গুঁড়ো মাথায় পড়ার মুহূর্তে। কিন্তু আজ শুধু ধুলো উড়ছে ওই মাঠে। কারণ আনন্দের অঙ্কুর বাঁচে সেচে, আর উপেক্ষার দুপুরে পুড়ে যায় সবুজের স্বপ্ন।
শান্তা / শান্তা
এস এম পিন্টুর কবিতা ও জীবনবোধ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে
“অনুভবের অনুপস্থিতি”
রবীন্দ্রনাথের চীন সফর : বিতর্ক ও প্রাপ্তি
যদি দেখা দাও
আমিও অপরাধী
নিউইয়র্কে চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা অনুষ্ঠিত
“পাতার টাকা”
“মধুমাস”
“ঝুম ঝুম বৃষ্টি”
“আজ আকাশের মন ভালো নেই”
“নিরামিষ নেকড়ে”
“হৈমন্তীর ফুলসজ্জা”