ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

শিশুতোষ গল্প

‘দুঃখ ভাঙার রূপকথা’ সুলেখা আক্তার সান্তা


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৫-৮-২০২৬ রাত ৯:১০

রাস্তার ধারে চুপচাপ বসে আছে ছোট্ট নাইজাফুটপাথ ঘেঁষে সারিবদ্ধভাবে স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েরা হর্ষউল্লাসে নিজ নিজ বিদ্যালয়ের দিকে ছুটে চলেছেতাদের পিঠের ব্যাগ, পরনের পরিপাটি ইউনিফর্ম আর মুখের হাসি দেখে নাইজার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসেতার মনেও তীব্র এক আকুলতা, সেও যদি ওদের মতো স্কুলব্যাগে বইপত্র নিয়ে স্কুলে যেতে পারত! কিন্তু এ সৌভাগ্য তার নয়তার সৎমা লোপা তাকে চৌকাঠের বাইরে পা ফেলতে দেয় না

হঠাৎ করেই পেছন থেকে কর্কশ কণ্ঠে ডাক আসে, নাইজা! ওরে হতভাগী, কাজ ফেলে কোথায় বসে আছিস রে?

চমকে উঠে নাইজা বলে ওঠে, আসছি মা, আমি তো এই পাশেই ছিলামকাছে গিয়ে সে মিনতিভরা কণ্ঠে বলে, মা, অনেকে তো স্কুলে যায়, ওদের মতো আমিও স্কুলে যেতে চাইস্কুল থেকে ফিরে আসার আগে আমি ঘরের সব কাজ একা হাতে সেরে ফেলব মা, তবুও আমাকে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ দাও

সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও নাইজার কপালে জোটে শুধু ধমকযে বয়সে তার হাতে খাতা-কলম থাকার কথা, সে বয়সে ঘরের সমস্ত কাজ করতে হয়লোপা চোখ রাঙিয়ে বলেন, হইছে, ঢং রাখ! সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘরের এত কাজ কে করবে শুনি? তোর মতো অলক্ষুণীর কপালে পড়াশোনা না

ক্ষুধায় পেট চোঁ-চোঁ করায় নাইজা বলে, মা, খুব খিদে পেয়েছে, খেতে দাও

লোপা এক ধমকে বলেন, ওই যে পাতিলে পান্তা ভাত আছে, ওখান থেকে কিছুটা তুই খা আর বাকিটা হাঁসগুলোকে দেএই বাড়িতে হাঁসগুলোর যেটুকু কদর আছে, তোর তো তার এক কানাাকড়ি মূল্য নেই! হাঁসগুলোকে তো সময়মতো খাবার দেই, তোরে তো তা দেইনা!

মনে মনে নাইজা ভাবে, বাবা বাড়ি ফিরলে বাবাকে সব কথা খুলে বলবেসে তো অবুঝ নয়, নাইজাকে দিয়ে কলসি ভরে পারি আনা হয়সে ঠিকমতো কলসি তুলতে পারে না, তাই ছোট জগে করে পানি এনে তিলে তিলে ভারী কলসি ভরতে হয় তার

 

রাত ঘরে আলো জ্বালিয়ে নাইজা পড়তে বসেলোপা চিৎকার করে ওঠে, আরে হতভাগী! তোর পড়ার চক্করে আমার ঘাড়ের ওপর যে গাদা গাদা কারেন্ট বিল এসে পড়বে! তাড়াতাড়ি লাইট অফ করতোর মতো গোবরে ভরা মাথায় পড়াশোনা করে আর কী হবে! নাইজার বুকটা ভেঙে আসে, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনা অশ্রু

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে প্রবেশ করেন বাবা জাহিদ হোসেনবাইরে থেকেই মেয়ের কান্নার আওয়াজ আর স্ত্রীর চেঁচামেচি তাঁর কানে এসেছিলতিনি বিরক্তি নিয়ে বলেন, কী হয়েছে লোপা, সারাক্ষণ চিলচিৎকার করো কেন? তোমার মেয়ে পড়াশোনা করবে? সে জজ-ব্যারিস্টার হবে নাকি! ওসব ঢং দেখলে আমার গা জ্বলে যায়

নাইজা কাঁদতে কাঁদতে বলে, বাবা, আমি পড়তে চাই

মেয়ের চোখের অশ্রু দেখে জাহিদ হোসেনের বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠেতিনি মেয়েকে কাছে টেনে কপালে হাত বুলিয়ে স্নেহের সুরে বলেন, কী রে মা, তুই কি পড়াশোনা করতে চাস?

বাবার মুখে এমন মায়াবী ডাক শুনে নাইজার বুকে আশা জেগে ওঠেসে দ্রুত মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ বাবা, আমি পড়তে চাই

জাহিদ হোসেন আশ্বস্ত করে বলেন, বেশ তো, তবে কাল সকালেই আমি নিজে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব

আনন্দ ও উত্তেজনায় নাইজার বুক ভরে ওঠেসে বলে, বাবা, তুমি সত্যিই আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে তো?

হ্যাঁ মা, হ্যাঁঠিক আছে, অনেক রাত হয়েছে, এখন তুই ঘুমিয়ে পড়

খুশিতে ডগমগ হয়ে নাইজা বইটা বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে যায়পরদিন ভোরে পাখির ডাকে ঘুম থেকে সে উঠে পড়েতাড়াতাড়ি ঘরের সব কাজ শেষ করে নেয়, চুলগুলো আঁচড়ে, পরিপাটি হয়ে সে যখন বাবাকে ডাকতে যায়, তখন পাশের ঘর থেকে লোপা স্বামীর দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেনস্বামীকে বাহানায় আটকে দেন

জাহিদ হোসেন স্ত্রীর ভয়ে নরম গলায় মেয়েকে বলেন, মা রে, আজ আর তোর স্কুলে যাওয়ার দরকার নেইতুই বরং বাড়িতেই পড়াশোনা কর

বাবার মুখে এমন আকস্মিক কথা শুনে নাইজা থমকে দাঁড়ায়সে আর্তনাদ করে ওঠে, কেন বাবা? তুমি না বলেছিলে আজ আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে?

জাহিদ হোসেন কোনো উত্তর দিতে পারেন না, মাথা নিচু করে থাকেনলোপা তেড়ে এসে বলেন, কী রে? আবার মুখে মুখে জবান খালাস করিস? বলেছি তো যাবি না, মানে যাবি না!

নাইজা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে নাসে বাবার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, বাবা, চলো না স্কুলে নিয়ে! 

লোপা এসে নাইজার হাত সজোরে ছাড়িয়ে নিয়ে বলেন, খবরদার! ওই এঁটো থালাবাসনগুলো পড়ে আছে, ওগুলো গিয়ে ধুয়ে ফেলতোর স্কুল যাওয়া হবে না! আর জাহিদ হোসেন স্ত্রীর ভয়ে চোখ ফিরিয়ে ঝিমিয়ে পড়েন, মুখ ফুটে একটি কথাও বলেন নাবাধ্য হয়ে জাহিদ হোসেন কাজের বাহানায় ঘর থেকে বেরিয়ে যানউঠানে পড়ে থাকা থালাবাসনগুলোর সামনে বসে নাইজা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেতার ছোট মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, তবে কি এ জন্মেই আমার পড়াশোনার কপাল নেই?

 

বাড়ির ঠিক এক কোণে জীর্ণ একটি ঘরে থাকেন বয়োবৃদ্ধ দাদি মনোয়ারাবার্ধক্যের ভারে তিনি প্রায় সারাদিন বিছানাতেই শুয়ে থাকেন, কিন্তু এই অবুঝ শিশুটির ওপর তাঁর তীক্ষ্ণ নজর থাকেনাইজার কান্নার শব্দে তিনি স্নিগ্ধ অথচ ভাঙা গলায় ডাকেন, নাইজা, এ দিকে আয়

চোখ মুছতে মুছতে নাইজা দাদির বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়মনোয়ারা তার থুতনি ছুঁয়ে বলেন, এত কান্নাকাটি কেন নাতনি? কে তোকে এমন করে কাঁদালো?

দাদির মমতাময়ী ছোঁয়া পেয়ে নাইজা বাঁধ ভেঙে সব উগরে দেয়সে ফুঁপিয়ে বলে, দাদি, আমি স্কুলে যেতে চাই, পড়তে চাইকিন্তু বাবা-মা কেউ আমাকে পড়াশোনা করতে দেয় না!

দাদি স্নেহে তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, কাঁদিসনে সোনা আমার, আর তোকে এক ফোঁটা চোখের অশ্রু ফেলতে হবে নাএই নে, আমার কাছে একটি জাদুকরী ময়ূর আছে, আজ থেকে এটি তোকে দিলাম

চোখ বড় বড় করে নাইজা ময়ূরটির দিকে তাকিয়ে বলে, দাদি! তুমি তোমার আদরের ময়ূরটা আমাকে দিয়ে দিচ্ছো?

হ্যাঁ রে নাতনি! এই ময়ূর তোকেই দিলামবল, এবার কি তোর মন একটু ভালো হলো না?

হ্যাঁ দাদি, ভীষণ খুশি আমি! আর কাঁদব না 

দাদি তখন মুচকি হেসে বলেন, এই ময়ূর নাচ দেখিয়ে মানুষকে আনন্দ দেবে, আর মানুষ তোকে যে টাকা দেবে, সেই টাকা দিয়ে তুই তোর পড়াশোনার খরচ চালাবি

নাইজার চোখ চকচক করে ওঠেসে প্রতিজ্ঞার সুরে বলে, দাদি, আমি মানুষের মতো মানুষ হবোশুধু নিজের ভাগ্য বদলাব না, মানুষের দুঃখ ঘুচিয়ে দেবো

দাদির ইশারায় ময়ূরটি পেখম মেলে নাচতে শুরু করেঝিলমিল করা পালক আর অপূর্ব ভঙ্গিমায় ময়ূরের সেই নৃত্য দেখে নাইজা হতবাক হয়ে যায়সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে, দাদি, এত সুন্দর ময়ূর আমি জীবনেও দেখিনি!

দিন যায়সেই ময়ূরের অদ্ভুত সুন্দর নৃত্য দেখতে আশপাশের গ্রামের মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেমায়াবী সেই নাচ দেখে মুগ্ধ হয়ে মানুষ নাইজার হাতে মুঠে টাকা গুঁজে দেয়সেই টাকা দিয়ে নাইজা তার খাতা, বই ও ময়ূরের খাবারের বন্দোবস্ত করেঅবশেষে তার স্কুলে যাওয়া শুরু হয়

এদিকে নাইজার এই অগ্রগতিতে সৎমা লোপার বুকে হিংসার আগুন জ্বলে ওঠেসে মনে মনে পণ করে, যেকোনো মূল্যে এই মেয়ের স্কুল যাওয়া বন্ধ করতে হবেবাড়িতে সারাদিন মানুষের এই হইচই ও ভিড় লোপার আর সহ্য হয় নাএকদিন সুযোগ বুঝে সে ময়ূরটিকে বস্তাবন্দী করে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে এক ঘুটঘুটে গভীর জঙ্গলে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে আসে

স্কুল থেকে ফিরে এসে নাইজা তার প্রাণের বন্ধু ময়ূরটিকে দেখতে পায় নাসে ঘরের কোণ থেকে উঠান, চারদিকে পাগলের মতো খুঁজতে থাকেবাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে, বাবা, আমার ময়ূরটা কোথাও নেই! তুমি দয়া করে আমার ময়ূরটাকে খুঁজে এনে দাও না!

মেয়ের কান্না দেখে জাহিদ হোসেনও চারপাশ চষে ফেলেন, কিন্তু কোথাও তার চিহ্নমাত্র মেলে নাহতাশ হয়ে তিনি মেয়ের কাছে ফিরে আসেন, নারে মা, অনেক খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও পেলাম না

প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে নাইজা খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিলোস্কুলেও যাওয়া বন্ধ করে দিলো সেএকটি কদম গাছের নিচে চুপটি করে গুটিসুটি মেরে বসে সে কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেঠিক সেই সময় তাদের স্কুলের সহপাঠী নাইজার কাছে এসে বলে, কী রে নাইজা এখানে বসে মন খারাপ করে আসিছ কনে? তুই স্কুলে আসিস না কেন? আয় তোর ময়ূর ফিরে এসেছে!

কথাটি কানে যাওয়া মাত্র নাইজা যেন নতুন জীবন ফিরে পায়সে চোখের অশ্রু মুছে ছুটে বাড়িতে চলে আসেউঠানে পা রাখতেই দেখে, তার সেই আদরের ময়ূরটি দাঁড়িয়ে আছেসে আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে ময়ূরটিকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ওঠেময়ূরটিও তার পালক দিয়ে নাইজার পিঠ আলতো করে ছুঁয়ে দেয়, যেন বলতে চায়, আমি আর কোথাও যাব না

দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা লোপা চোখ কপালে তুলে ভাবে, এ কীভাবে সম্ভব! যে গভীর জঙ্গলে ওটাকে নির্বাসন দিয়ে এলাম, সে সেখান থেকে পথ চিনে ফিরে এলো কী করে! হিংসায় তার বুক ফেটে চৌচির হয়ে যায়

এরপর থেকে নাইজা যেখানেই যায়, ময়ূরটি তার ছায়ার মতো সঙ্গে থাকেসে তার প্রিয় বন্ধুকে নিয়ে স্কুলেও যায়ময়ূরটি স্কুলের বাইরে শান্ত হয়ে বসে থাকে, ক্লাস শেষ হলে দুজনে একসঙ্গে বাড়ি ফেরে

একদিন অলৌকিক এক কাণ্ড ঘটে যায়সেই ময়ূরটি একে একে বেশ কয়েকটি সোনার ডিম পাড়ে! মুহূর্তের মধ্যে এ খবর দাবানলের মতো পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়েগ্রামের মানুষ হুল্লোড় করে তাদের বাড়িতে ভিড় জমায়নাইজার ভাগ্য পুরোপুরি বদলে যায়তাদের দরিদ্র কুঁড়েঘর নিমেষেই এক প্রাচুর্যময় সংসারে পরিণত হয়

এই বিশাল পরিবর্তনের পর নাইজা এক মুহূর্তের জন্যও তার দাদিকে ভোলেনিসে পরম যত্নে তার বৃদ্ধ দাদি মনোয়ারাকে নিজের ঘরে এনে নিজের কাছে রাখেদাদির হাত ধরে সে কৃতজ্ঞতার সুরে বলে, দাদি, তুমি সেদিন আমাকে যে ময়ূরটি দিয়েছিলে, আজ সে আমাদের সমস্ত দুঃখ মুছে দিয়েছেআজকের এই ভাগ্যের পুরো অংশীদার শুধু আমি নই, তুমিও দাদি!

মনোয়ারা আনন্দে দুচোখের অশ্রু মুছতে মুছতে বলেন, হ্যাঁ রে নাতনি, সেদিন ভালোবেসে আশীর্বাদ করেই তোকে ময়ূরটি দিয়েছিলাম

যে সৎমা কোনো দিন নাইজাকে সহ্য করতে পারত না, পড়াশোনার নাম শুনলে গায়ে আগুন ধরত, সেই লোপার সুরও আজ পুরোপুরি বদলে গেছেসম্পদের মোহে কিংবা ভালোবাসার ছোঁয়ায়, সেও এখন নাইজাকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রাখে

আজ নাইজাদের সংসার হাসিখুশি ও আনন্দে পরিপূর্ণউঠানে দাঁড়িয়ে ময়ূরটি মৃদুস্বরে ডেকে ওঠে, নাইজা... ও নাইজা... আমি তোমার চিরদিনের বন্ধু

খুশিতে ঝলমল করে ওঠে নাইজার মুখসে ময়ূরের পালকে হাত বুলিয়ে বলে, হ্যাঁ আমার সোনা বন্ধু, আমরা জনম জনমের বন্ধু হয়েই থাকব

 

শান্তা / শান্তা