ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

গল্প

‘দায়িত্বের বৃক্ষ’ আলিফা তাবাচ্ছুম শিখা


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৪-৮-২০২৬ বিকাল ৫:২৫

গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি ক্ষুদ্র নদী বহিয়া যায়। নদীর তীরে একটি পুরাতন বটবৃক্ষ।
সেই বৃক্ষের ন্যায় এক ব্যক্তি গ্রামে বাস করেন তিনি মইফুলের বাবা। 
তিনি কথা অল্প কহেন, কিন্তু তাঁহার কর্মের শব্দ দূর পর্যন্ত পৌঁছে।
গ্রামের লোকেরা তাঁহাকে সৎ মানুষ বলিয়াই চেনে।
মইফুলের বাবা  পেশায় একজন সরকারি কর্মচারী এবং কৃষক।তিনি পরিশ্রমী। প্রত্যুষে ফজরের আজানের সহিত তাঁহার দিন আরম্ভ হয়, আর নিশীথে এশার নামাজের পর তাঁহার বিশ্রাম। তাঁহার কপালে ঘাম আর আল্লাহর রহমতে যেমন মাঠের ফসল বৃদ্ধি পায়, তেমনি তাঁহার সততায় সংসারে বরকত বৃদ্ধি পায়।
তাঁহার সংসার বৃহৎ। ঘরে বৃদ্ধ পিতা-মাতা, পত্নী, দুই পুত্র-কন্যা। গ্রামে দুই ভ্রাতা ও এক ভগিনী বাস করে। আত্মীয়-স্বজনের সংখ্যাও নিতান্ত অল্প নহে।
অনেকে কহে, এত লোকের দায়িত্ব কেমন করিয়া পালন করেন?
মইফুলের বাবা হাসিয়া বলেন, দায়িত্ব পালনই তো ইবাদত। একা জান্নাতে যাওয়া যায় না।
তাঁহার জীবন একখানি বৃহৎ বৃক্ষের ন্যায়।
মূলে রহিয়াছেন জনক-জননী, শাখায় ভ্রাতা-ভগিনী, পত্রে আত্মীয়-স্বজন, এবং ছায় স্ত্রী-পুত্র-কন্যা।
তিনি সেই বৃক্ষের মালী। প্রতিদিন জল দেন, পরিচর্যা করেন, যেন কোনো শাখা শুষ্ক না হয়।
প্রতি মাসের প্রথমে বেতনের অর্থ হস্তে পাইয়াই তিনি মাতার হস্তে কিছু অর্থ প্রদান করেন। বলেন, মা, ইহা আপনার। হিসাব দিতে হইবে না।পিতার ঔষধ তিনি নিজে আনিয়া দেন। বৃদ্ধ পিতা একদিন বলিলেন, বাবা, তুই আমাকে এত যত্ন করিস কেন?
তিনি উত্তরিলেন, আব্বা, আপনি আমাকে ছোটবেলায় কোলে লইয়া বড় করিয়াছেন। এখন আমার পালা আপনাকে কোলে লইয়া বাঁচাইবার।
কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তাহার বেতন ও পুস্তকের ভার মইফুলের বাবার। ভগিনীর বিবাহের জন্য তিনি প্রতি মাসে কিছু অর্থ সঞ্চয় করেন। ভগিনি একদিন আবদার করিল, ভাইজান, আমার একটি শাড়ী লাগিবে।
তিনি পরের দিনই বাজার হইতে শাড়ী কিনিয়া আনিলেন। বলিলেন, বোনের আবদার ফিরাইয়া দিলে আল্লাহও আমার দোয়া ফিরাইয়া দিবেন।
 
গৃহের বধূটি সারাদিন সংসারের কার্যে ব্যস্ত থাকেন। মইফুলের বাবা সপ্তাহে একদিন তাঁহাকে লইয়া নদীর পাড়ে বেড়াইতে যান। সন্তানদিগকে নিয়া মসজিদে যান। রাত্রে তাহাদিগকে নিয়া কুরআন পাঠ করেন। তিনি বলেন, ঘরের মানুষের সহিত সদ্ব্যবহারই সর্বোত্তম সদকা।
 আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর প্রতি
ঈদ আসিলে তিনি সবাইকে টাকা পাঠান। কাহারো অসুখ হইলে খোঁজ লন। প্রতিবেশী বিধবা রমণীর গৃহে প্রতি মাসে এক বস্তা চাল পৌঁছাইয়া দেন। কেহ ঋণ চাহিলে সাধ্যমত সাহায্য করেন। কিন্তু কখনো প্রচার করেন না। বলেন, ডান হস্তে দান করিলে বাম হস্ত যেন জানিতে না পারে।
একদা একজন বন্ধু  বলিলেন, মইফুলের বাবা তুমি এত ব্যয় করিয়া কি অবশিষ্ট রাখো?
তিনি কহিলেন, আমি ব্যাংকে অর্থ জমাই না। আমি মানুষের দোয়ায় জমাই। মাতার দোয়া, ভগিনীর হাসি, প্রতিবেশীর হক।
ইহাই আমার সর্বশ্রেষ্ঠ সঞ্চয়, ইবাদত।

বৎসর আবর্তিত হয়। তাঁহার গৃহে ধন-সম্পদ বৃদ্ধি না পাইলেও, শান্তি বৃদ্ধি পায়।
লোকে বলে, ওই গৃহে ঝগড়া নাই, কারণ গৃহকর্তা সৎ, পরিশ্রমী ও সকলের খোঁজ রাখেন।
মইফুল যৌবনে পদার্পণ করিয়া উপলব্ধি করিল, পিতা তাহাকে বাড়ী গাড়ী দিয়া যান নাই।
তিনি দিয়া গিয়াছেন একখানি চরিত্র। 
সেই চরিত্রের নাম — সততা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও সকলের প্রতি দয়া।
আর ইহাই হইল পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার।
যে ব্যক্তি নিজের সুখ বিসর্জন দিয়া মাতা-পিতার সেবা করে, ভ্রাতা-ভগিনীর আবদার মেটায়, স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা করে, আত্মীয়ের বন্ধন অটুট রাখে, এবং গরীবের প্রতি সাহায্যের হস্ত প্রসারিত করে সেই ব্যক্তির জীবনই সার্থক। কেননা রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 
বলিয়াছেন, তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই জন যে আপন পরিবারের নিকট উত্তম।

শান্তা / শান্তা