গল্প
“ইলিশ” প্রদীপ সেন
রিকশাটা নিয়ে বাড়ি ফিরছিল কালু। আজ সে খুব ভোরেই উঠেছিল। সকালে স্নান না করলে তার স্ত্রী মধু তাকে রিকশা ছুঁতেও দেবে না। তর্জনী উঁচিয়ে সে বলত,
— ওটা বিশ্বকর্মার দান। শীতের ভয়ে স্নান করতে পারতা না যখন, তখন রাতভর মধু খাইতে আইও কেরে? যাও, নন্তুর ডোবায় ডুব দিয়া আইসো, তারপর বিশ্বকর্মারে ধূপকাঠি দেখাইয়া চা-রুটি খাইয়া ‘দুগ্গা, দুগ্গা’ কইরা বাইরইবা।
কালু জানে, মধুর কথা বেদবাক্য। তা না হলে রাতে মধু আর কদু—দুটো থেকেই বঞ্চিত হতে হবে। তাই সে সুবোধ বালকের মতো নিয়ম মেনেই চলে।
রিকশা চালাতে চালাতে কালু সকালের ভাত খেতে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ পালবাবুর মোটরবাইক এসে তার রিকশার সামনে দাঁড়াল। ঠিক তখনই পালবাবুর ফোন বেজে উঠল। বাইকের হ্যান্ডেলে ঝুলছিল দেড়-দুই কেজি ওজনের একটি চকচকে ইলিশ।
ফোন ধরেই পালবাবু উৎকণ্ঠিত গলায় বলে উঠলেন,
— কী বলছিস! আমি এক্ষুনি আসছি!
কথা শেষ করে তিনি তাড়াহুড়ো করে ইলিশটা খুলে কালুর রিকশায় ঝুলিয়ে দিলেন।
— নে কালু, মাছটা তোকে দিলাম। বউ-বাচ্চাকে নিয়ে খাস।
কালু কিছু বলার আগেই পালবাবু বাইক ঘুরিয়ে উল্কার গতিতে শহরের দিকে ছুটে গেলেন।
রিকশা চালাতে চালাতে কালু বারবার দুলতে থাকা ইলিশটার দিকে তাকায়। পথচলতি মানুষও বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে। দিন আনি দিন খাই এক রিকশাওয়ালার রিকশায় এমন বিশাল ইলিশ! যেন রাজকীয় কোনো পুরস্কার ঝুলছে।
আজ কালুর নিজেকে কেমন যেন নায়ক-নায়ক লাগছে। মনে মনে ভাবতে থাকে, মধু মাছটা দেখে কী খুশিই না হবে! এত বড়ো ইলিশ তো তারা কোনোদিন কেনেনি, ছুঁয়েও দেখেনি। আজ নিশ্চয়ই মধুর মুখে হাসি ফুটবে। হয়তো খাওয়াদাওয়ার পর সে আর রাগ দেখাবে না। এই বিরল সুখের দিনটা তাদের সংসারে অনেক দিন মনে থাকবে।
সেদিন দুপুরে ইলিশের ঝোল, ভাজা আর ডিম দিয়ে কী তৃপ্তি করেই না খেল সবাই! মধুর মুখেও ছিল তৃপ্তির হাসি। কালুর মনে হয়েছিল, এমন আনন্দ যেন বহুদিন পরে তাদের ঘরে নেমে এসেছে।
দুদিন পরে কালু কৃতজ্ঞতা জানাতে পাল স্টোরসে গেল। দোকানে গিয়ে সে অবাক হয়ে দেখল, পালবাবুর মুখ শুকনো, চোখ লাল, দাড়ি না-কাটা। দোকানের পরিবেশও থমথমে।
একজন কর্মচারীর কাছে জানতে পারল, সেদিন ফোনে খবর এসেছিল—পালবাবুর বাবা হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই তিনি মারা যান। সেই আকস্মিক দুঃসংবাদের তাড়াহুড়োয় বাইকের হ্যান্ডেলে ঝোলানো ইলিশটার কথা আর তাঁর মনে ছিল না। তাই সেটাই কালুকে দিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন।
কালুর বুকটা হু হু করে উঠল। যে ইলিশ তাদের সংসারে এক দিনের উৎসব এনে দিয়েছিল, সেটি ছিল অন্য এক পরিবারের গভীর শোকের দিনের নীরব সাক্ষী।
সে আর কিছু বলতে পারল না। নিঃশব্দে দোকান থেকে বেরিয়ে এল। আনন্দ আর বেদনা—জীবনের রিকশায় যে কখন পাশাপাশি ঝুলে থাকে, তা সেদিন কালু নতুন করে বুঝেছিল।
শান্তা / শান্তা
“ইলিশ” প্রদীপ সেন
“একটি খুনের ইস্তাহার” বিশ্বজিৎ মণ্ডল
“পরিশ্রমের দশ টাকা” কাজী তানভীর
“মেছো ভূত” আসাদ সরকার
“অবহেলা” সুলেখা আক্তার শান্তা
“অদৃষ্টের বিপত্তি” সুলেখা আক্তার শান্তা
এস এম পিন্টুর কবিতা ও জীবনবোধ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে
“অনুভবের অনুপস্থিতি”
রবীন্দ্রনাথের চীন সফর : বিতর্ক ও প্রাপ্তি
যদি দেখা দাও
আমিও অপরাধী
নিউইয়র্কে চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা অনুষ্ঠিত