ঢাকা সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬

“পরিশ্রমের দশ টাকা” কাজী তানভীর


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮-৮-২০২৬ বিকাল ৬:২২

‘ভাই আর দশ টাকা। ভাই আর দশ টাকা। চিল্লাতে চিল্লাতে বাসের পেছনে অনেকদূর দৌড়ালো রাহাত৷ ছোট্ট বালক রাহাতের মাথায় পানির কেস। অসুস্থ বাবা চলতে পারেন না। টাকাপয়সার যথাযথ জোগাড় না থাকায় শয্যাশায়ী শরীরের চিকিৎসাও করাতে পারছে না। পরিবারে রুজিরোজগারে একমাত্র ব্যক্তি ছিলো রাহাতের বাবা, খালেদ মিয়া রিকশা  চালিয়ে যা আয় করতেন তা দিয়ে দুচালা টিনের ঘরে তাদের ছোট্ট মিষ্টি একটা সংসার—রাহাত, তার ছোট বোন আয়েশা এবং বাবা-মা। ভালোমন্দ মিলে খারাপ না- মোটামুটি আল্লাহর রহমতে চলছিলো৷ কিন্তু খালেদ মিয়ার সব আকাঙ্ক্ষা বাসের চাকার নিচে পিষে যায়

সেদিন খালেদ মিয়া যাত্রী নামাচ্ছিলেন। যাত্রী ভাড়া বের করে গুনছিলেন, এমন সময় পেছন থেকে একটি বেপরোয়া বাস এসে তার কোমর থেকে নিচের অংশ থেঁতলে দেয়। ওখানেই গুরুতর আঘাতে অবচেতন হয়ে পড়েন রাহাতের বাবা৷ সংকটাপন্ন অবস্থায় আশপাশের লোকজন ধরাধরি করে সিএনজিতে উঠিয়ে মেডিকেলে নিয়ে যায়। খালেদ মিয়া ‘বাঁচবে না’ মর্মে আশঙ্কাজনক বার্তা জানিয়েছিলেন ডাক্তাররা। তারপরও ডাক্তারদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। সুপ্রসন্ন ভাগ্য আর ছোট বাচ্চাদের দোয়ার বদৌলতে বেঁচে ফিরেন খালেদ মিয়া। এরিমধ্যে মাসদেড়েকে কেটে যায় মেডিকেলের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে আর বেডে। হায়াত আছে বলেই বেঁচে আছেন৷ কিন্তু শরীর একেবারে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। বিছানায় শুয়ে থাকেন আর মাঝে মাঝে রাহাতের মা গুলজার বেগম ধরে বসান। খাওয়া-গোসল সব এক বিছানাতেই। গুলজার বেগম ঘর সামলান আর অসুস্থ স্বামীর সেবায় নিয়োজিত থাকেন৷ বালক রাহাত সবে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ছিলো। তার চার বছরের বোন এখনো পড়াশোনা শুরুই করেনি৷

রিকশাওয়ালার ঘরে দেড়-দুমাস আয়-রোজগার বন্ধ মানে চরম বিপর্যয়। খালেদ মিয়া সজ্জন ব্যক্তি৷ মহল্লার সরদার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা দেখতে এলে কিছু খরচপাতি আর রাহাতের জন্য একটা ছোট তহবিল গড়ে দেন৷ খালেদ সাহেব স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে কী তা নিশ্চিত নয়। রাহাত বড়দের পরামর্শে, ছোট একটা ব্যবসা করবে এই টাকা দিয়ে। কয়েক কেস পানি কিনে বাজারে পথচারী এবং বাসে বাসে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করবে৷ রাহাতের ছোট কাঁধে আকাশ সমান দায়িত্বভার। পড়াশোনা থেমে যায়। স্বপ্নরঙিন জীবনের গতিপথ মুহূর্তেই পাল্টে যায়। বয়সে কিশোর হলেও ভাবনা চিন্তায় এখন আর সেই শৈশবের দুরন্তপনা নেই৷ ভাবগম্ভীর মনে ভাবে কীভাবে দুমুঠো চালের ব্যবস্থা করা যায় আর বাবার চিকিৎসা চালিয়ে নিতে পারে। একমাত্র ছোটবোনের চোখে নিজের অপূরণীয় স্বপ্ন দেখা। পড়ালেখা করানো। প্রতিদিন আরো কত নিত্য নতুন ভাবনাচিন্তা যোগ হচ্ছে রাহাতের মাথায়

বাসের জানালা দিয়ে এক যাত্রীর কাছে হাফ লিটার পানি বিক্রি করেছিল রাহাত। পানির দাম ২০ টাকা হলেও বাস চলার মুখে লোকটা ১০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। লোকটা বাকি টাকা দিল না। বাস আপন গতিতে টেনে গেলো। সেই যাত্রী বাকি দশ টাকা দেওয়ার চেষ্টাও করল না, আর রাহাতও বাসের পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। এই রাহাতের জন্য দশটা টাকা যে কতটা মূল্যবান তা যদি বাসের ঐ অসচেতন লোকটা বুঝত তাহলে বাস থামিয়ে হলেও দশটাকা দিয়ে যেত। এই দশ টাকাই যে  রাহাতদের জন্য পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার একমাত্র অবলম্বন। অসুস্থ বাবার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ খরচ। আয়েশার পড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায়! যে শিশু বা মানুষ ভিক্ষা না করে পরিশ্রমে উপার্জন করে, তাকে ঠকানো কখনোই উচিত না—বরং তার পাশে দাঁড়ানো, হাত বাড়িয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব

 

শান্তা / শান্তা