গল্প
“একটি খুনের ইস্তাহার” বিশ্বজিৎ মণ্ডল
প্রথম
ভাড়াটিয়া ঘাতক হিসেবে এলাকায় আমার যথেষ্ট দুর্নাম আছে। কেউ কারও পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ালেই কোন না কোন পক্ষ গোপনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাদের একটাই চাওয়া—নির্দিষ্ট একজন মানুষকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে। কাজের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা। আমি কখনও প্রশ্ন করি না, কেন একজন মানুষকে সরাতে হবে। কারণ জানতে গেলে বিবেকের সঙ্গে লড়াই শুরু হয়, আর আমি বহু বছর আগেই সেই বিবেককে মাটিচাপা দিয়েছি।
তবে আমি জন্মগত অপরাধী নই।
দশ বছর আগে আমি ছিলাম একেবারে সাধারণ একজন যুবক। বাবা মারা যাওয়ার পর ছোট্ট একটি দোকান চালিয়ে সংসার টানতাম। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী আর ছোট্ট মেয়েকে নিয়েই ছিল আমার পৃথিবী। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই ছিল আমার স্বভাব। কিন্তু সেই স্বভাবই একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।
পাড়ায় রাজনৈতিক সংঘর্ষে একজন গুরুতর আহত হয়। আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম বলে আদালতে সাক্ষ্য দিতে হয়। এলাকার এক প্রভাবশালী নেতা আমাকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেন। পরে সমস্ত দোষ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রকৃত অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায়, আর আমি ছয় মাসের জেল খাটি।
জেলের প্রতিটি দিন আমাকে বদলে দেয়। সেখানে আমি দেখেছি, সত্যের চেয়ে টাকার দাম বেশি, সততার চেয়ে ক্ষমতার জোর বড়। মুক্তি পাওয়ার পর সমাজও আমাকে আর গ্রহণ করেনি। কেউ কাজ দেয়নি, কেউ বিশ্বাস করেনি। সংসারের অভাব, অপমান আর ক্ষোভ ধীরে ধীরে আমার ভেতরের মানুষটাকে হত্যা করে দেয়।
ঠিক তখনই এক অচেনা লোক আমার কাছে আসে।
‘একটা কাজ করবেন?’
আমি তাকিয়ে ছিলাম।
লোকটি টেবিলের ওপর মোটা অঙ্কের টাকা রেখে বলেছিল, ‘একজন মানুষকে সরিয়ে দিতে হবে।’
সেদিন অনেকক্ষণ দ্বিধায় ছিলাম। কিন্তু মেয়ের ওষুধ কেনার টাকা ছিল না, ঘরে চাল ছিল না। শেষ পর্যন্ত টাকার বান্ডিলটাই আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে দেয়। সেই একবারের ভুলই আমাকে এমন এক অন্ধকার জগতে টেনে নিয়ে যায়, যেখান থেকে আর ফেরা হয়নি।
বছরের পর বছর কেটে গেছে। এখন আমার নাম কেউ জানে না, কিন্তু আমার কাজ সবাই জানে। আমি শুধু চুক্তি পালন করি।
এক শীতের সন্ধ্যায় একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো।
‘আপনাকে একটা দায়িত্ব নিতে হবে।’
‘কার?’
‘সানোয়ার মাস্টার। আপনাদেরই এলাকার মানুষ।’
নামটা শুনে আমি চুপ করে গেলাম।
লোকটি আবার বলল, ‘ও খুব জনপ্রিয়। আমাদের রাজনৈতিক পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই ওকে সরানো জরুরি।’
আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘বাকিটা সামনাসামনি হবে।’
পরদিন রাতের অন্ধকারে অচিনতলার পুরোনো বটগাছের নীচে আমার হাতে তুলে দেওয়া হলো একটি মোটা খাম। ভেতরে অগ্রিম টাকা, সানোয়ার মাস্টারের একটি ছবি এবং একটি ছোট্ট কাগজ—যেখানে লেখা ছিল শুধু একটি নাম।
খামটা জ্যাকেটের ভেতর রেখে মোটরসাইকেল স্টার্ট করলাম। কুয়াশায় ঢেকে যাওয়া রাস্তায় এগিয়ে যেতে যেতে ছবিটার দিকে আর একবার তাকালাম।
তখনও বুঝিনি, এই মানুষটিকে ঘিরেই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। আর সেই সিদ্ধান্তই একদিন ছিঁড়ে ফেলবে—একটি খুনের ইস্তাহার।
দ্বিতীয়
সানোয়ার মাস্টার—নামটা এখন আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। বহু মানুষের জীবনে যার অবদান, সেই মানুষটিই আমার কাছে হয়ে উঠেছে একটি চুক্তির নাম। এতদিন যেসব কাজ করেছি, সেখানে আমি কখনও ব্যক্তির কথা ভাবিনি। শুধু একটি নাম, একটি দায়িত্ব, তারপর সব শেষ।
কিন্তু এবার কোথায় যেন একটা অস্বস্তি কাজ করছিল।
কয়েকদিন ধরে দূর থেকে সানোয়ার মাস্টারকে দেখছিলাম। তিনি একটি সাধারণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে আসেন, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন, দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের খোঁজ নেন। স্কুল ছুটির পরেও অনেক সময় তাঁকে দেখা যায় কয়েকজন ছাত্রকে আলাদা করে পড়িয়ে দিতে।
একদিন স্কুলের পাশের চায়ের দোকানে বসে তাঁর সম্পর্কে কিছু কথা শুনলাম।
এক বৃদ্ধ বলছিলেন, ‘সানোয়ার মাস্টার না থাকলে আমার নাতিটা পড়াশোনা ছেড়ে দিত। বই-খাতা পর্যন্ত কিনে দিয়েছে লোকটা।’
আর একজন বললেন, ‘আজকাল নিজের কথা না ভেবে অন্যের জন্য ভাবেন এমন মানুষ খুব কম।’
আমি চুপ করে শুনছিলাম।
মনের ভেতর একটা অদ্ভুত প্রশ্ন জেগে উঠল—যে মানুষ এত মানুষের উপকার করেছে, তার বিরুদ্ধে এত বড় অভিযোগ কী করে সত্যি হতে পারে?
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে শক্ত করলাম। আমার কাজ প্রশ্ন করা নয়। বহু বছর ধরে এভাবেই নিজেকে বুঝিয়েছি।
শীতের সন্ধ্যা তখন দ্রুত নেমে আসে। চারদিকে কুয়াশার চাদর। গ্রামের পথগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়। সেই সময়েই সানোয়ার মাস্টার প্রতিদিন বাড়ির দিকে রওনা হন।
একদিন দূর থেকে তাঁকে অনুসরণ করতে করতে দেখলাম, রাস্তার পাশে এক ছাত্র দাঁড়িয়ে আছে। সানোয়ার মাস্টার মোটরবাইক থামিয়ে ছেলেটির সঙ্গে কথা বললেন।
‘কী হয়েছে? বাড়ি যাচ্ছ না কেন?’
ছেলেটি মাথা নিচু করে বলল, ‘বাবা অসুস্থ। তাই মন খারাপ।’
মাস্টারমশাই তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘মন খারাপ করলে চলবে না। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। তোমার স্বপ্নটাই তোমার শক্তি।’
দূর থেকে কথাগুলো শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন একটা চাপ অনুভব করলাম।
আমি জানি না কেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ল। কতদিন তার সঙ্গে বসে কথা বলিনি! কতদিন শুধু টাকার চিন্তায় নিজের পরিবার থেকে দূরে সরে আছি!
সেদিন রাতে ঘুম এলো না।
বারবার মনে হচ্ছিল, আমি কি শুধু টাকার জন্য এমন এক পথে হেঁটে চলেছি, যেখান থেকে ফিরে আসার কোন রাস্তা নেই?
তবু পরদিন আবার নির্দিষ্ট সময়ে বেরিয়ে পড়লাম। কারণ বহু বছরের অভ্যাস এত সহজে বদলায় না।
সানোয়ার মাস্টার সেদিনও আগের মতোই শান্ত ছিলেন। তাঁর মুখে কোন ভয় নেই, কোন সন্দেহ নেই। যেন পৃথিবীর কারও প্রতি তাঁর কোন অভিযোগ নেই।
কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ তাঁর গাড়ি থেমে গেল। তিনি নেমে দাঁড়ালেন। চারপাশে তখন নিস্তব্ধতা। কুয়াশায় ঢাকা ফাঁকা রাস্তা।
আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম।
আজ এতদিনের পথচলার শেষ মুহূর্ত কি এসে গেল?
নাকি এ রাতেই আমার নিজের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হবে?
আমি জানতাম না।
শুধু জানতাম, সানোয়ার মাস্টারের সঙ্গে আমার দেখা হওয়াটা আর পাঁচটা ঘটনার মতো সাধারণ হবে না।
তৃতীয়
শীতের রাত। চারপাশে কুয়াশার আস্তরণ। ফাঁকা রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন সানোয়ার মাস্টার। তাঁর মোটরবাইকে সমস্যা হয়েছে। তিনি একবার গাড়ির দিকে তাকাচ্ছেন, আবার চারপাশের অন্ধকার পথের দিকে।
আমি ধীরে ধীরে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম।
আমার ভেতরে তখন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। এত বছরের অভ্যাস, এত অন্ধকার পথ পেরিয়ে আসা জীবন আর অন্যদিকে একজন মানুষের মুখ, যার চোখে কোনো ভয় নেই।
আমাকে দেখে তিনি প্রথমে একটু অবাক হলেন। তারপর ভাল করে তাকিয়ে বললেন, "তুমি কি রফিক?"
আমি থমকে গেলাম।
এত বছর পর কেউ আমার নাম এমন স্বাভাবিকভাবে উচ্চারণ করল!
আমি কোন উত্তর দিলাম না।
সানোয়ার মাস্টার আবার বললেন,
‘দাঁড়াও, তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে।’
আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালাম।
‘আমার সঙ্গে?’
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
‘হ্যাঁ। অনেকদিন ধরে বলতে চেয়েছিলাম। বলা হয়নি, তোমার মেয়ের কথা।’
মুহূর্তের মধ্যে আমার শরীর কেঁপে উঠল।
‘আমার মেয়ে?’
সানোয়ার মাস্টার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
‘কয়েক মাস আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল। তোমার মেয়েটা তখন ক্লাস টেনে পড়ে। একদিন স্কুল ছুটির পর দেখলাম, ও খুব অস্থির অবস্থায় এক ছেলের সঙ্গে কোথাও যাওয়ার চেষ্টা করছে। ছেলেটার সম্পর্কে এলাকার লোকজনের ভাল ধারণা ছিল না।’
আমি নিঃশব্দে শুনছিলাম।
তিনি আরও বললেন, ‘আমি ওদের কাছে গিয়ে কথা বলি। বুঝতে পারি, একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল তোমার মেয়ে। তখন যদি বিষয়টা বাড়িয়ে দিতাম, হয়তো ওর জীবন কঠিন হয়ে যেত। তাই কাউকে কিছু না জানিয়ে ওকে স্কুলে নিয়ে আসি। পরে তোমাদের বাড়িতে গিয়ে তোমার স্ত্রীর হাতে মেয়েকে তুলে দিই।’
আমার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে গেল। এসব ঘটনার আমি কিছুই জানতাম না ।
সেদিন স্ত্রী কেন এত কাঁদছিল, কেন বারবার বলছিল, ‘মাস্টারমশাই না থাকলে আজ কী যে হতো!’ সব মনে পড়ে গেল।
আমি এতদিন নিজের দুঃখ, অপমান আর রাগের মধ্যে ডুবে ছিলাম যে, একজন মানুষের ভালোবাসার মূল্য বুঝতেই পারিনি।
সানোয়ার মাস্টার বললেন, ‘তোমার মেয়েটা খুব ভালো। শুধু ওকে সময় দিও। বাবা-মায়ের ভালোবাসার অভাব যেন ওকে ভুল পথে না নিয়ে যায়।’
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না।
আমার মনে হলো, এতদিন যাকে পৃথিবীর শত্রু ভেবেছি, সেই মানুষটাই আমার পরিবারের সবচেয়ে বড় উপকার করেছে।
আমার জীবনের সমস্ত অন্ধকার যেন এক মুহূর্তে আমার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।
আমি পকেট থেকে সেই কাগজটা বের করলাম। যে কাগজে লেখা ছিল একটি মানুষের বিরুদ্ধে আমার অন্ধ প্রতিশোধের চুক্তি।
কাগজটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
তারপর ধীরে ধীরে সেটাকে ছিঁড়ে ফেললাম।
টুকরো টুকরো কাগজগুলো কুয়াশার মধ্যে উড়ে গেল।
সানোয়ার মাস্টার বিস্মিত হয়ে বললেন,
‘কী করছ?’
আমি শুধু বললাম, ‘একটা ভুলের শেষ করছি।’ তিনি কিছু বুঝলেন না। বোঝার কথাও নয়।
আমি নিজের মোটরসাইকেলের চাবি তাঁর হাতে দিয়ে বললাম, ‘আপনি এটা নিয়ে বাড়ি চলে যান। রাস্তা দূর। আমি হেঁটে চলে যাব।’
তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘তুমি?’
আমি মৃদু হেসে বললাম, ‘আমার অনেক পথ বাকি। তবে আজ থেকে অন্য পথ।’
সানোয়ার মাস্টার কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বাইকে উঠে চলে গেলেন।
আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম সেই কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায়।
বহু বছর আগে জেলের অন্ধকারে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজের মানুষটাকে। টাকার লোভ, অপমান আর প্রতিশোধ আমাকে এমন এক জীবনে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে মানুষের জীবন শুধু একটি নাম আর একটি দামের হিসাব ছিল।
কিন্তু আজ একজন শিক্ষক আমাকে আবার মানুষ হতে শিখিয়ে গেলেন।
সেদিন রাতে আমি শুধু একটি কাগজ ছিঁড়িনি।
আমি ছিঁড়ে ফেলেছিলাম আমার অতীতের সমস্ত অন্ধকার।
আর সেই ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলোর সঙ্গে বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল , একটি খুনের ইস্তাহার।
শান্তা / শান্তা
“ইলিশ” প্রদীপ সেন
“একটি খুনের ইস্তাহার” বিশ্বজিৎ মণ্ডল
“পরিশ্রমের দশ টাকা” কাজী তানভীর
“মেছো ভূত” আসাদ সরকার
“অবহেলা” সুলেখা আক্তার শান্তা
“অদৃষ্টের বিপত্তি” সুলেখা আক্তার শান্তা
এস এম পিন্টুর কবিতা ও জীবনবোধ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে
“অনুভবের অনুপস্থিতি”
রবীন্দ্রনাথের চীন সফর : বিতর্ক ও প্রাপ্তি
যদি দেখা দাও
আমিও অপরাধী
নিউইয়র্কে চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা অনুষ্ঠিত