ঢাকা সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬

“মেছো ভূত” আসাদ সরকার


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮-৮-২০২৬ বিকাল ৬:১৬

গ্রামের এক সহজ সরল ছেলে সোহেল। এস এস সি পাশ করে সবে মাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছে প্রতি শুক্রবার কলেজের সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। তাই বৃহস্পতিবার হলেই সোহেল গ্রামের বাড়িতে ছুটে যায়। প্রতি সপ্তাহের মতো আজও বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। নরসিংদী থেকে শেষ নৌকা সন্ধ্যা ৭: ৩০ মিনিটে। সোহেলের বাবা বিদেশে থাকেন। সে বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। সে বড় হওয়ার পর থেকে বাড়ির বাজারের দায়িত্ব তারই কাঁধে। সোহেল রিকশা নিয়ে নৌকা ঘাটে পৌঁছে গেছে। এমন সময় সোহেলের মায়ের ফোন। বাড়িতে বাজার করে নিয়ে যেতে হবে। সোহেল মায়ের কথা মতো বাজারে ছুটে গেলো। বাজার করতে করতে সোহেল আর সময়ের দিকে খেয়াল করেনি। নৌকা ঘাটে এসে দেখে নৌকা চলে গেছে। সোহেল বাই রোডে রওনা হলো শ্রীনগর পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত প্রায় দশটা বেজে গেলো। ইতোমধ্যে শ্রীনগর থেকে আলোক বালীর উদ্দেশ্য ছেড়ে যাওয়া খেয়া বন্ধ হয়ে গেছে। অমাবস্যার রাত। ঘন কালো কুয়াশা। দশ হাতের বেশি পথ দেখা যায় না। শীতের রাত, ঘন কুয়াশায় ঢাকা চারিপাশ। তাছাড়া নদী কচুরিপানায় ভরপুর। সেই জন্য সোহেলকে পারাপারের জন্যে কোন মাঝি রাজি হচ্ছে না। অবশেষে এক বৃদ্ধ মাঝি রাজি হলো। যা-ই হোক, বিপদ হলে কেউ না কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। কচুরিপানা দিয়ে ঠেসা নদী পার হতে রাত প্রায় বারোটা বেজে গেল। খেয়া ঘাট থেকে সোহেলের বাড়ি যেতে আরও লাগবে পৌনে এক ঘন্টার মতো। আশেপাশে কোন ঘর বাড়ি নেই। চারিদিকে কৃষি জমি। নৌকা থেকে নেমে সে দ্রুত হাঁটা শুরু করল। হঠাৎ পিছন থেকে সবুজের ডাক
এই সোহেল,
এত রাতে কোথায় থেকে এলে?
সবুজ হচ্ছে সোহেলের চাচাতো ভাই। ২০ দিন আগে পারিবারিক জামেলা সহ্য করতে না পেরে সে সোহেলদের ঘরের কোণে ফাঁসি দিয়ে মৃত্যু বরণ করেছে। মৃত্যুর সময় তার জিহ্বা অনেক লম্বা হয়ে মুখের বাহিরে চলে আসে। চোখ দুটি বড় বড় করে তাকিয়ে ছিল। প্রথমে সবুজের কণ্ঠ শুনে সোহেল একটু ভয় পেল। কোন উত্তর না দিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করলো। শীতের রাত তবুও সারা শরীর দিয়ে ঘাম বের হচ্ছে। সোহেল যত দ্রুত হাঁটছে কিন্তু তার পা যেন সামনে আর চলছে না। এক পা সামনে তো আর এক পা পিছনে। বিপদে যেন বর্ষার নদীতে হঠাৎ ভাটা
সবুজ আবার ডাকছে কিরে সোহেল আমার সাথে রাগ করলি? 
সোহেল কোন কথা না বলে দ্রুত হাঁটতে থাকে। এবার সোহেলের মনে হচ্ছে তার পিছনে কে যেন হাঁটছে। ভয়ে তার হাত পা কাঁপতে শুরু করলো কিন্তু সে হাঁটা বন্ধ করেনি। হাঁটতে হাঁটতে চরের কদম গাছ তলার কাছে এলো। কদম তলায় তিন থেকে চার জন লোক বসে আড্ডা দিচ্ছে। সবুজ চিৎকার দিয়ে বললো এই সোহেল দাঁড়া  আমার কথা তোর কানে ডুকে না। তখন কদম তলা থেকে তিনজন লোক সোহেল পথ আটকে ধরলো
তাদের গায়ের রং কালো, মাথার চুল গুলো জট পাকানো, চোখ দুটি বড় বড় করে সোহেলর পথ আটকালো। সোহেল ভয়ে কাঁপতে থাকে। সবুজ পিছন থেকে সামনে এলো জিহ্বা এক হাত লম্বা চোখ গুলো বড় ডাবের মতো। মাথার চুলগুলো জট পাকানো

সোহেল কে ধরে প্রথমে হাত থেকে বাজারের ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ব্যাগে ছিল পাঁচ কেজি ওজনের রুই মাছ। দুই কেজি গরুর গোশত। ব্যাগটি ছিঁড়ে রুই মাছ বের করে তিনজনে মিলে ছিঁড়ে ছিঁড়ে টুনা টুন করে মাছ খাচ্ছে আর একজন বলছে পেট না ভরলে সোহেলের কলিজা ছিঁড়ে খাবে। হঠাৎ সোহেল বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পরে গেল। রাত ১ টা বেজে গেছে। সোহেলের মা বাড়ির লোকজন নিয়ে খেয়া ঘাটের দিকে রওনা হয়েছে। কদম গাছের তলা এসে দেখে সোহেল বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। সোহেলের মা চিৎকার দিয়ে উঠলো। তার দুই চাচাতো ভাই ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে গেছে। তার বড় চাচা খবর পেয়ে মসজিদের হুজুর ডেকে আনছে। হুজুর দেখে বুঝতে পেরে জানারেন যে তার পক্ষে সম্ভব না। মাদ্রাসার হোসাইন মোহাম্মদ ভান্ডসীকে নিয়ে আসেন। তিনি জ্বিন-পরী চালান করেন। হুজুরের কথা শুনে বাড়ির সবাই ভয় পেয়ে গেলো। কেউ একা একা বাহির হচ্ছে না। দুই তিনজন মিলে ভান্ডসী হুজুরকে ডেকে আনলো। হুজুর দেখার সাথে সাথে বুঝতে পারছে মেছো ভূতের কাজ। সোহেলের মা'র নিকট জানতে চাইলেন তিনি ছেলেকে বাজার আনতে বলেছিলেন কিনা। তিনি বললেন মাছ আর গরুর গোশত আনতে বলেছিলাম। হুজুর বললো রাত্রি করে কেউ একা একা মাছ নিয়ে চর দিয়ে আসে। তিনি বললো এক গ্লাস পানি দেন। হুজুর মনে মনে কী পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে তার হাতে নখে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো। প্রথমে কিছু বলেনি তারপর হুজুর চোখে মুখে পানি ছিটে দিলেন। এরপর সোহেল কথা বলতে শুরু করলো মূলত মাছের জন্য তাকে আঘাত করেছে। কিছুক্ষণ পর সোহেলের হুঁশ হলো। সারারাত বাড়ির ছোট বড় সবাই ভয়ে ছিল। মেছো ভূত মাছের লোভী, তাদের গায়ে মাছের গন্ধ করে তাদের নাকে কাঁচা মাছের গন্ধ লাগলে আর লোভ সামলাতে পারে না

 

শান্তা / শান্তা