মেশকাতুন নাহার
“রামিসার রক্তে সভ্যতার আত্মদহন”
রাষ্ট্র যখন কেবল ইট-পাথরের উন্নয়নে ব্যস্ত থাকে, অথচ মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন নগরগুলো ধীরে ধীরে বসবাসের স্থান নয়—ভয়ের কারাগারে পরিণত হয়। বহুতল অট্টালিকার চকচকে দেয়ালের আড়ালে তখন জন্ম নেয় নীরব হিংস্রতা, বিকৃত কামনা, এবং মানুষের মুখোশে ঘুরে বেড়ানো আদিম পশুত্ব। রামিসা সেই পশুত্বের সর্বশেষ শিকার। একটি আট বছরের শিশু। যার পৃথিবী এখনো রঙ পেন্সিল, স্কুলব্যাগ আর মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হওয়ার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল। যে বয়সে শিশুরা আকাশে মেঘ দেখে গল্প বানায়, সে বয়সেই তাকে দেখতে হলো মানুষের বিকৃততম রূপ। তারপর নিভে গেল তার জীবন—নিষ্ঠুর, নোংরা, বিভীষিকাময় এক সহিংসতার ভেতর দিয়ে। এই ঘটনা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি সভ্যতার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এক ভয়ংকর অভিযোগপত্র। আমরা এমন এক সমাজে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে মানুষ আর মানুষকে ভয় পায় না—মানুষ ভয় পায় মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অমানুষকে। শিশুরা আজ ঘরের বাইরে নয়, ঘরের পাশের দরজাতেও নিরাপদ নয়। সিঁড়ি, লিফট, প্রতিবেশী, পরিচিত মুখ—সবকিছু আজ সম্ভাব্য আতঙ্কের নাম। সবচেয়ে শীতল সত্য হলো, এই সমাজ ধীরে ধীরে নিষ্ঠুরতার সাথে সহাবস্থান করতে শিখে ফেলেছে। সংবাদমাধ্যমে শিশু ধর্ষণ, নারী হত্যা, দেহ খণ্ডিত হওয়ার সংবাদ এখন আর মানুষকে দীর্ঘসময় নাড়া দেয় না। কয়েক ঘণ্টার সামাজিক ক্ষোভ, কিছু স্ট্যাটাস, কিছু প্রতিবাদ, তারপর আবার নীরবতা। যেন মৃত্যু এখন কেবল আরেকটি স্ক্রলযোগ্য সংবাদ। এই নীরবতা ভয়ংকর। কারণ সমাজ যখন অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া, আইনের ধীরগতি, সামাজিক উদাসীনতা এবং নতিক অবক্ষয়—সব মিলিয়ে এক ধরনের অদৃশ্য লাইসেন্স ˆতরি হয়েছে, যেখানে বিকৃত মানুষগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করেছে—তারা পার পেয়ে যাবে। রামিসার খণ্ডিত দেহ আসলে একটি শিশুর দেহ নয়; এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ছিন্নভিন্ন প্রতিচ্ছবি। এটি আমাদের সামাজিক চেতনার মৃতদেহ। কারণ একটি শিশু যখন নিজ বাসভবনের ভেতর থেকেও নিরাপত্তা পায় না, তখন বুঝতে হবে সমাজের মৌলিক কাঠামোতে পচন ধরেছে। আমরা উন্নয়নের গল্প বলি, অথচ মানুষের মনোজগতের অন্ধকার নিয়ে কথা বলি না। আমরা প্রযুক্তির উৎকর্ষ উদযাপন করি, কিন্তু বিবেকের অবক্ষয় দেখি না। মানুষের ভেতরে যখন ˆনতিকতা শুকিয়ে যায়, তখন শিক্ষা তাকে আলোকিত করতে পারে না; বরং সে হয়ে ওঠে আরও বিপজ্জনক। কারণ শিক্ষাহীন পশু যতটা ভয়ংকর, ˆনতিকতাহীন মানুষ তার চেয়েও ভয়াবহ।
এই সমাজে নারী ও শিশুকে এখনো পূর্ণ মানুষ হিসেবে নয়, অনেকের চোখে ‘দুর্বল শরীর’ হিসেবে দেখা হয়। আর এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে আছে দীর্ঘদিনের বিকৃত সামাজিক চর্চা, ক্ষমতাকেন্দ্রিক পুরুষতন্ত্র, সহিংস সংস্কৃতি এবং অসুস্থ বিনোদনের অবচেতন প্রভাব। ফলে কিছু মানুষ ধীরে ধীরে সহানুভূতি হারিয়ে ফেলে; তাদের ভেতর জন্ম নেয় কেবল ভোগের নেশা ও ধ্বংসের প্রবৃত্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আর কত? আর কত শিশুর রক্ত এই সমাজের দেয়ালে লেগে থাকলে আমরা সত্যিকারের জাগব? আর কত মায়ের বুক খালি হলে রাষ্ট্র নিরাপত্তাকে কেবল রাজনৈতিক ভাষণ নয়, বাস্তব দায় হিসেবে নেবে? আর কত বিভীষিকা দেখলে আমরা বুঝব—এই অবক্ষয় কেবল অপরাধীর নয়, এটি সমষ্টিগত নতিক বিপর্যয়? রামিসার মৃত্যু আমাদের শোক দিয়েছে—কিন্তু শোক যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধের নতুন ভাষা। প্রয়োজন এমন এক সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ, যেখানে শিশুকে কেবল পরিবার নয়, পুরো সমাজ নিজের দায়িত্ব মনে করবে। যেখানে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক অবস্থা বা সামাজিক প্রভাব নয়—শুধু অপরাধই হবে বিচার্যের বিষয়। কারণ সভ্যতা তখনই টিকে থাকে, যখন সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও নিরাপদ থাকে।
আজ রামিসা নেই। কিন্তু তার রক্তাক্ত নীরবতা আমাদের প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি সিঁড়িতে, প্রতিটি অন্ধকার করিডরে প্রশ্ন হয়ে ঝুলে আছে—‘এই সমাজ কি এখনো মানুষের বসবাসের উপযুক্ত আছে?’
শান্তা / শান্তা
“অনিন্দ্যর জন্য আকুলতা” জা কি র আ জা দ
“মাটির সুবাস ও আধুনিক নবান্ন” আব্দুল কাদের
“আতঙ্কের ছায়া” হানিফ রাজা
সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে স্মার্ট শিল্পকলা গড়তে চান রেজাউদ্দিন স্টালিন
শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর-এর ১৪টি ছোটকাকু প্রকাশিত
“শেষ দেখা হয়নি” মুহাম্মদ আকাশ মিয়া
“সিগনেচার” সামছুল আলম শিমুল
“দিওয়ান-ই-শামস -ই তাবরিজি : জালালুদ্দিন রুমি ” এস ডি সুব্রত
“অন্ন ও অন্যায়” সুলেখা আক্তার শান্তা
“কাকতাড়ুয়া নাকি ভূত” আসাদ সরকার
“জীবন-প্রেমিক” বিশ্বজিৎ মণ্ডল
“মেঘের এপিটাফ” জসীম উদ্দীন মুহম্মদ