ইমরান পরশ
‘‘একজন শাহজাহান আলীর গল্প’’
শালা আমার সাথে লাগতে আসে। দিছি এক্কবারে! এই শাহজাহান আলী বুড়া হইছে কিন্তু শরীরের ত্যাজ কমে নাই। কথাগুলো একটানে বললেন, শাহজাহান আলী। গতরখানায় হালকা ভাঁজ পড়েছে চামড়ার কিন্তু শরীরে এখনো বেদম শক্তি তার।
যখন রিকশার প্যাডেল মারে তখন মনে হয় রিকশা তার হাওয়ায় উড়ছে। হেলেদুলে সিটে বসেই প্যাডেল মারতে অভ্যস্থ সে। একহারা গড়নের চেহারা। শ্যামলা বরণ। মাথার চুলগুলো অর্ধেক কাঁচাপাকা। পেছনে কোকড়ানো চুল। বয়সের একটা ছাপ পড়েছে। কিন্তু মানসিকভাবে প্রবল শক্ত। কাউকে ছেড়ে কথা বলেন না তিনি। ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে একটা টেবিলে ঝম করে উঠে বসে রাগে গদগদ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন তিনি। পাশেই ডক্তার নাঈম ব্যান্ডেজ পরিয়ে দিচ্ছেন ইকবালের নাকে।
ঘুষিটা ঠিক নাক বরাবর লেগেছে। দরদর করে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছিল। রক্ত দেখে একটু ভড়কে গিয়েছিলেন শাহজাহান আলী। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে ইকবালের নাকে নিজের কোমরের গামছা খুলে চেপে ধরে সোজা ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে এসেছেন। ডাক্তার তাকে প্রথমিক চিকিৎসা দিতে গিয়ে নাম এন্ট্রি করলেন খাতায়। রেজিস্ট্রি খাতায় ইকবালের বাবার জায়গায় নিজের নাম লিখে দিলেন।
ইকবাল কে জিজ্ঞেস করেছিলেন
কী রে তোর বাপের নাম কি?
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ইকবাল বলল, জানি না। এখানে ভনিতা করার সময় নাই। দেরি করা যাবে না। আবার মেডিকেলের ব্যাপার। পুলিশ আনাগোনা করে এখানে। সন্দেহ করলে কেস পর্যন্ত গড়ায়। তাই আর দেরি না করে নিজের নামই বলে দিলেন বাবার জায়গায়। ব্যান্ডেজ শেষে ইকবালকে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন শাহজাহান আলী। যেন পুত্রের জন্য পিতার হাহাকার। পুত্রের প্রতি পিতার দরদ। ভেতর থেকে উছলে উঠেছে। বর্ষায় যেমন করে নদীর জল ফুলে ওঠে তেমনি তার বুকটাও ফুলে উঠেছে। এটা কি মায়া? হতে পারে। মায়ার শরীর নাহলে কি এভাবে কাউকে মেরে আবার নিজেই তাকে ধরে এনে কেউ চিকিৎসা করায়? দোষটা অবশ্য ইকবালেরই ছিল।
হাইকোর্টের উল্টোদিকের সড়কে ঘটনা। শাহজাহান আলী আসছিল বঙ্গবাজার থেকে। সোজা টিএসসি তার গন্তব্য। ওদিকে প্রেসক্লাবের দিক থেকে ইকবাল ডানে টার্ন করেই সজোরে লাগিয়ে দিলো তার রিকশায়। কটকট করে কয়েকটা স্পোক কেটে গেল শাহজাহান আলীর রিকশার ডান পাশের চাকার। তবুও উল্টো শাহজাহান আলীকে দোষারোপ করছিল ইকবাল। সিগন্যাল অমান্য করেই ডানে টার্ন করেছিল সে। রাগে আর নিজেকে সামলে নিতে পারেনি শাহজাহান আলী| তর্ক করছিল ইকবাল। অযথা তর্ক আর তেড়ে আসাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি শাহজাহান আলী। বাহুতে এখনো হস্তির শক্তি মনে হয়। ইকবালের লিকলিকে শরীর সেটা নিতেই পারেনি।
দুই
ইকবালকে ধরে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে জরুরি বিভাগের গেটে দাঁড়ানো শাহজাহান আলী কি করবেন এখন? ইকবালকে ছেড়ে দিবেন, নাকি তার সাথে করে নিয়ে যাবেন একটু সময় নিলেন। তারপর ইকবাল কে জিজ্ঞেস করলেন,
কী রে তোর বাসায় কে কে থাকে?
কি করবেন জেনে? একটু নরম সুরেই জবাব দিলো ইকবাল।
জরুরি বিভাগে তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নার আওয়াজটা এখনো কানে বাজছে তার। একজন মানুষ কতটা ভালো হলে এরকম কান্না করতে পারেন।
না, মানে তোমার বাসায় কি কেউ থাকে?
না। আমি মেসে থাকি। বাড়িতে মা একা থাকেন।
মেস কোথায় চলো পৌঁছে দিয়ে আসি।
লাগবে না। একাই যেতে পারব। কি মনে করে ইকবাল আবার পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো।
আপনার বাসায় কে থাকে? এই বয়সে রিকশা চালানো লাগে?
আমার আর বয়স! ছিল তো অনেক কিছুই। এহন কিছুই নাই। সে অনেক কথা। তোমার আপত্তি না থাকলে চলো আমার বাসায়। আমিও একাই থাকি।
হাঁ সূচক জবাব দিলো ইকবাল। ইকবালকে নিজের রিকশায় চড়িয়ে সিপাহিবাগের তিন নম্বর গলির বাসায় চলে এলেন শাহজাহান আলী| ছোট্ট একটা বাসা। টিডশেড বাসায় মূলি বাঁশের বেড়া দেয়া। মাথা গোজার মতো ছোট্ট একখান চৌকি। চৌকির নিচে একটা ট্রাঙ্ক| কি আছে ট্রাঙ্কে সেটা শাহজাহান আলী ছাড়া আর কেউ জানে না। খাওয়া-দাওয়া হয় পাশের একটি মেসে।
এই বাসাটায় থাকা যায় না| বৃষ্টি আসলিই পানি পড়ে টপটপ করে। চারদিন পরেই চেঞ্জ করে নেব। তোমার আপত্তি না থাকলে আমার সাথেই থাকতি পারো। তোমারও কেউ নাই। আমারও কেউ নাই।
ইকবাল মাথা নাড়ে। তার অপরাধবোধ জেগে উঠেছে। আসলেই সে অপরাধ করেছে। হোটেল থেকে কাবার কিনে নিয়ে এলেন শাহজাহান আলী। সাথে কিছু ফলমূলও। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ি ওষুধ। যেন নিজের সন্তানের জন্য পিতার প্রেমময় হৃদয় হু হু করে উঠেছে। আহত সন্তানকে যেভাবে কেউ আদর করে খাওয়ায় ঠিক তেমনি ইকবালকেও খাওয়ালেন। ইকবাল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে তার বাবার হাতে খাচ্ছে।
খা বাপ। তোর মতোই আমার একটা পুত আছিলোরে বাপ। ঠিক তোর মতো....। একমাত্র বাপ আমার।
কি হইছে তার?
আল্লার কাছে চলে গেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তি গেছিল। লালদিঘি ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভায় গুলি চলেছিল। সেই গুলিতে..... অঝোরে কাঁদতে থাকে শাহজাহান আলী। ছাওয়ালডার শোক সইতি না পাইরা তার মাও চলি গেল। আমি এহন একা। কিছুই ভাল্লাগে না আমার। কি হবে আমার বেঁচে থেইকে?
ইকবাল হাত রাখে শাহজাহান আলীর মাথায়। আপনার বাড়িঘর?
কিছুই নাই। যা আছিল তাও সিডরে ভাইঙ্গা নিছে। কি করব বাড়ি দিয়ে। কিডা থাকবি? কেউ তো নাই। আমি একলা মানুষ যেহানেই রাইত, সেইহানেই কাইত।
রাতের ঘন অন্ধকারে তারাগুলো জ্বলজ্বল করছে। বসন্তের বাতাস বইছে হু হু করে। রাতে কোনোরকম জড়াজড়ি করে ঘুমোতে গেল দুজন। যেন পিতা-পুত্রের গলাগলি ধরে ঘুমানো।
তিন
খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল ইকবালের। নাকে হাত দিয়ে দেখে ব্যান্ডেজ নাই। খুলে পড়ে গেছে। হালকা ব্যথা আছে। বাইরে থেকে ঘুরে এলো সে। চারদিকে হাঁকডাক। কেউ সবজি বিক্রি করছে। কেউ মাছ নিয়ে হাঁক দিচ্ছে। স্ট্যান্ডে কয়েকটি টেম্পু যাত্রী তোলায় ব্যস্ত। হোটেল থেকে পরোটা আর ভাজি কিনে নিলো সে। আস্তে করে রুমে ঢুকলো। দেখে শাহজাহান আলী ঘুমোচ্ছে। ডাক দিবে কিনা ভাবলো। ধাক্কা দিতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলো। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছে ইকবাল কিন্তু ঘুম থেকে উঠছেন না। অগত্যা আস্তে করে নাড়া দিলো। স্তব্ধ ইকবাল। সাড়া নেই মানুষটার। আবারও ধাক্কা দিলো। নিস্তেজ শরীর। কি হলো এটা! কি করবে ইকবাল ভেবে পায় না। একটা চিৎকার দিলো ইকবাল। কেউ কি আছেন? বাবা নেই। বাবা নেই। বাবা কথা বলছে না। বাবা তুমি এটা করতে পারো না।
আশেপাশের লোকজন জড়ো হয়ে গেল। পাশেই ফার্মেসীর সুমন ছুটে এলো। সুমন হাত ধরে বলল, নেই মারা গেছে। দেহে প্রাণ নাই।
মাঝে মাঝে শাহজাহান আলী আড্ডা দিতেন সুমনের ফার্মেসীতে। রিকশা চালানো তার পেশা ছিল না। সময় কাটাতে আর মানসিকভাবে সুস্থ থাকতেই রিকশা চালাতেন বলে জানালো সুমন। সুমনকে বলেছিলেন, আমি যদি মারা যাই বাবা আমার ট্রাঙ্কটা ভাইঙ্গে ডাইরির ঠিকানা অনুযায়ী লাশটা পাঠায়া দিও। চিন্তা কইরো না এ্যাম্বুলেন্স ভাড়াও পাইবা।
সকলের উপস্থিতিতে ইকবালকে বলল ট্রাঙ্ক এর তালা ভেঙে ডায়রিটা বের করেন। ইকবাল তালা ভেঙে অবাক। ডাইরির উপরে একটা চিঠি লেখা ইকবালকে উদ্দেশ্য করে। এখানে যে টাকা আছে এটা আমার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতার টাকা। তিন বছরের টাকা জমানো আছে। বাকিটা ব্যাংকে রাখা। একটা চেকও সই করা থাকল। যে দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সম্মান দেয়া হয় না সেখানে এই পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ হয়। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দাপট দেখে কষ্ট হয় অনেক। কাউকে বলতেও পারি না। কি হবে এই সার্টিফিকেট আর অর্থ দিয়ে। আমার তো কেউ উত্তরসূরি নাই। তাই তোমাকে উত্তরসূরি করে গেলাম। আমার ঠিকানা অনুযায়ী আমার শরীরটাকে পৌঁছে দিও। প্রয়োজন নেই জাতীয় পতাকা দিয়ে সম্মান জানানো। আমরা যুতদ্ধ করেছিলাম কিছু পাওয়ার জন্য নয়। জাতির পিতার আহবানে যুদ্ধে গিয়েছিলাম। সেই পিতাকেই আমরা হত্যা করেছি। কি ভয়ানক জাতি আমরা। চিঠিটা পড়তে পড়তে হু হু করে কেঁদে উঠল ইকবাল।
শান্তা / শান্তা
“বাবার স্বপ্ন”
‘‘একজন শাহজাহান আলীর গল্প’’
“পিতৃ বিভাজন”
“বিশ্বকাপ উন্মাদনা”
“অনুতপ্ত হৃদয়”
“চাওয়া”-সুলেখা আক্তার শান্তা
“জীবন জিজ্ঞাসা”-সুলেখা আক্তার শান্তা
“একটি হত্যার ইতিকথা” সুলেখা আক্তার শান্তা
“ফটিক দাদুর দুর্ভাগ্য” সাঈদুর রহমান লিটন
তুমিহীনা ফারজানা ইয়াসমিন
অন্তর্বাসের আড়ালে স.ম. শামসুল আলম
“দাদি-নাতির দোয়ার ফি” -সুলেখা আক্তার শান্তা