ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

সুলেখা আক্তার শান্তা

“অনুতপ্ত হৃদয়”


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩-৬-২০২৬ বিকাল ৭:৫৭

বিড়ালপ্রেমী একজনের গল্প শুনেছিলাম বহু বছর আগে। পাশ্চাত্যের এক দেশে তিনি গিয়েছিলেন তাঁর এক বন্ধুর বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। বন্ধুর বাড়িতে ঢোকার আগে দেখলেন, তাঁর বন্ধুপত্নী অত্যন্ত উদ্বিগ্ন মুখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। কাছে গিয়ে দেখলেন, বন্ধুপত্নীর চোখ অশ্রুসিক্ত। গাড়ি থেকে নেমে তিনি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে ভাবি?

ভাবি রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, ভাই, আমার বিড়ালটা হারিয়ে গেছে!

তিনি পথে পথে বিড়াল খুঁজছিলেন। আমাদের দেশীয় মানসিকতায় একটা সাধারণ বিড়াল হারানোর জন্য এমন চোখ-মুখের জল এক করা দেখে তিনি বেশ বিস্মিত হয়েছিলেন।

তখন অবশ্য ভাবিনি আমার জীবনেও এমন কোনো ঘটনা ঘটবে। আমার ফ্ল্যাটের সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় প্রায়ই একটা সাদা বিড়াল দেখতে পেতাম। সে আমার দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে একপাশে সরে যেত। একদিন সে আমার দিকে এমন এক করুণ দৃষ্টিতে তাকাল যে আমি আর উপেক্ষা করতে পারলাম না। একটু এগিয়ে গেলাম। চোখের ইশারায় সে যেন আমাকে কিছু বলতে চাইছিল। আমি নিচু হয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। এরপর আমার ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দাঁড়ালাম। বিড়ালটিও দরজায় দাঁড়িয়ে রইল, যেন ভেতরে ঢোকার অনুমতি চাইছে। আমি ইশারায় ডাকতেই সে ভেতরে চলে এলো।

আমি একটা বাটিতে করে ওর দিকে পানি এগিয়ে দিলাম। অনেকক্ষণ ধরে চুকচুক করে পানি খেয়ে সে আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল। এবার একটা মাছের টুকরো দিতেই পরম তৃপ্তিতে সেটা খেয়ে সে বাইরের দরজার কাছে গিয়ে বসল। ভাবখানা এমন—কাজ শেষ, এবার নিয়মমাফিক বাইরে চলে যেতে হবে। কিন্তু আমি ওকে যেতে দিলাম না। দরজায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে ডাইনিং টেবিলের নিচে গিয়ে শুয়ে পড়ল। লক্ষ্য করলাম, সে ভীষণ ক্লান্ত।

আরেকদিন আলতো করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই গলায় গড়গড় শব্দ করে অনেকক্ষণ আদর নিলো। কয়েকদিন পর বিড়ালটিকে কোলে তুলে নিলাম। মনে হলো, এতদিনে একটা নির্ভরযোগ্য আশ্রয় পেয়ে পরম মমতায় সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। মুহূর্তের মধ্যে এক অদৃশ্য মায়ার বন্ধনে আসন্নপ্রসবা বিড়ালটি যেন আমাকে বেঁধে ফেলল। চিন্তায় পড়ে গেলাম, বিড়ালের বাচ্চা হওয়ার পর পুরো ব্যাপারটা কীভাবে সামলাব? ওর থাকার জন্য এবং আঁতুড়ঘর হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটা বড় কার্টন এনে চমৎকারভাবে গুছিয়ে দিলাম।

একদিন সকালে মিউ মিউ শব্দে আমার ঘুম ভাঙল। কার্টনে উঁকি দিয়ে দেখি, দুটি চমৎকার বাচ্চা হয়েছে। কিন্তু বাচ্চা হওয়ার পর থেকেই বিড়ালটি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে একদম নেতিয়ে পড়ল। ক্রমাগত ওর এমন অবস্থা দেখে আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম। অনেকেই পরামর্শ দিলেন পশু হাসপাতালে নিয়ে যেতে। মানুষের মতো পশুপাখির হাসপাতাল থাকে, তা শুনলেও কখনো দেখার সুযোগ হয়নি। হাসপাতালে গিয়ে তো আমার চোখ ছানাবড়া! প্রায় জনত্রিশেক মানুষ তাঁদের প্রিয় পশুপাখি নিয়ে বসে আছেন, যার মধ্যে বেশিরভাগই বিড়াল।

অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর আমার সিরিয়াল এলো। ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন, এখনই সিজার করতে হবে, না হলে ও বাঁচবে না। পেটের ভেতর একটা মরা বাচ্চা আটকে আছে। ডাক্তার আরও বললেন, শুধু সিজার করলেই হবে না, প্রতিদিন ড্রেসিং বদলাতে হবে। সেই সঙ্গে সাত দিন অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দিতে হবে। বাসায় আপনারা এগুলো সামলাতে পারবেন না। ডাক্তার বিশেষ একটা জ্যাকেট দিয়ে বিড়ালটাকে মুড়িয়ে দিলেন, যাতে সে নিজের ক্ষতস্থান চেটে ইনফেকশন না করে ফেলে। অ্যানেসথেসিয়ার প্রভাব না কাটায় ও তখনো অচেতন। ওই অবস্থাতেই ওকে বাসায় নিয়ে এলাম।

ওর বাচ্চা দুটো অনেকক্ষণ মাকে দেখেনি, ওদের যেন কত অভিযোগ জমে ছিল! মাকে পেয়েই ওরা শরীরে মুখ ঘষে আদর নিতে লাগল এবং চুকচুক করে দুধ খাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী আমি ওর পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ারের ব্যাপারে ভীষণ সচেতন ছিলাম।

কয়েকদিন পর বিড়ালটি সুস্থ হয়ে আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। আমি ওকে স্নেহের সুরে ডাকতেই ও নিঃশব্দে এসে আমার কোলে বসল। হাসপাতালের ডাক্তার কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, অনেক অবহেলা আর নির্যাতন সহ্য করে খুব লড়াই করে ওকে টিকে থাকতে হয়েছে।

বিড়ালটার সঙ্গে আমার যেন এক আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠল। জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বেদনা সেই সম্পর্কের মাঝে বিলীন হয়ে গেলো। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষই একমাত্র বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী। বিধাতা তাঁর অপার মহিমায় সৃষ্টিজগতের সবকিছু মানুষের অধীনস্থ ও কর্তৃত্বাধীন করে দিয়েছেন। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীকে তিনি এই শ্রেষ্ঠত্ব দেননি। অথচ মানুষ এই শ্রেষ্ঠত্বের বড়াইয়ে পশুর কথা তো ছেড়েই দিলাম, নিজের স্বজাতির মানুষকেই চূড়ান্তভাবে নিগৃহীত করছে। ছোটবেলার একটা স্মৃতি এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এলাকায় কুকুরের উৎপাত বাড়লে মিউনিসিপ্যাল অফিস থেকে কুকুর নিধন দল আসত। লম্বা সাঁড়াশি দিয়ে কুকুরগুলোকে জাঁতাকলে চেপে ধরে বিষাক্ত ইনজেকশন দেওয়া হতো। মুহূর্তের মধ্যে ওরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। তারপর ট্রাকে করে নিয়ে কোনো এক ভাগাড়ে পুঁতে ফেলা হতো।

সময়ের সাথে বিড়ালের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আরও গভীর হতে লাগল। আমার দিকে তাকিয়ে ও যেন চোখের পলকে সব বুঝে ফেলত। আমার পড়ার টেবিলে, কম্পিউটার স্ক্রিনের পাশের ছোট্ট জায়গাটা ছিল ওর খুব প্রিয়। আমার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে ওখানেই ঠায় বসে থাকত।

কদিন পর বিড়ালটা আবার একটু অসুস্থ হয়ে পড়ল। ওদিকে বাচ্চা দুটোও খুব চঞ্চল হয়ে উঠেছে, কোথাও স্থির থাকতে চায় না। ওদের নিয়ে সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হয়, কখন কোন ফাঁকফোকরে আটকে যায়! বাচ্চার মা মুখ দিয়ে কামড়ে ওদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রাখে, তাও ওরা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে।

এদিকে বিড়াল পোষা নিয়ে প্রতিনিয়ত আশেপাশের মানুষের নানা সমালোচনা শুনতে হচ্ছিল। যেখানে নিজের বেঁচে থাকাই কঠিন, সেখানে বিড়াল পালন নাকি এক ধরনের আদিখ্যেতা! মানুষের এই সমস্ত কথায় প্রভাবিত হয়ে আমি এক মারাত্মক ভুল করে বসলাম। বাচ্চা দুটো তখন একটু বড় হয়েছে, মা ছাড়াও থাকতে পারে। একজন পরামর্শ দিলো, ওগুলো কাউকে দিয়ে দাও। যেমন কথা, তেমন কাজ। বাচ্চা দুটোকে নিয়ে এক পশুপাখি বিক্রেতার কাছে দিয়ে এলাম। ওদের মা তখন বাসায় ছিল না।

আমি বাসায় ফেরার পর বিড়ালটি আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। ওই চাউনিতেই যেন সে তার সব কথা বলে দিলো—এ কী করলে তুমি? 

আমার সমস্ত মানবিকতা মূহূর্তেই বিড়ালের সেই অবুঝ মাতৃত্বের কাছে ছোট হয়ে গেলো। আমি পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে গেলাম যার কাছে বাচ্চা দুটো দিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাউকেই খুঁজে পেলাম না। আমার অমন উদ্বিগ্ন অবস্থা দেখে ওখানকার একজন লোক বলল, ওর চেয়ে ভালো জাতের বিড়াল আছে, চাইলে নিতে পারেন। আমার কানে তখন কোনো কথাই ঢুকছিল না। একরাশ তীব্র অপরাধবোধ বুকে নিয়ে এক যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো আবার বাসার দিকে পা বাড়ালাম।



শান্তা / শান্তা