ছোটগল্প
“অলীক বেদনা” -সুলেখা আক্তার শান্তা
অলীক বেদনা
সুলেখা আক্তার শান্তা
সব সময় সংসারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত আলিম। ছোটবেলা থেকেই সে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। তার বড় দুই ভাই—ইকবাল আর শাহাদাত—পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত। তারা ভালো রেজাল্ট করে বড় চাকরি করার স্বপ্ন দেখছে। আলিম তাদের দিকে তাকিয়ে গর্ব অনুভব করে। নিজের পড়ালেখা না হওয়া নিয়ে তার তেমন কোনো আফসোস নেই। সে মনে মনে ভাবে, “আমার দুই ভাই পড়ালেখা করছে—এইটাই আমার শান্তি।”
একদিন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বোরহান তাকে বলে, “আলিম, তুই যে পড়াশোনা করলি না, সেটা কি কখনো খারাপ লাগে না? দেখ তোর দুই ভাই কত সম্মান পায়! আর তুই সারাদিন সংসারের কাজ করিস।”
আলিম হেসে উত্তর দেয়, “আমার খারাপ লাগে না। আমি যদি পড়তাম, তাহলে বাবার এত জমি-জমা, ক্ষেত-খামার কে দেখতো? আমার দুই ভাই পড়ছে—এটাই তো আমার গর্ব।”
বোরহান আবার বলে, “তোর মনে কোনো হিংসা নেই? তুই ধনী পরিবারের ছেলে, তবুও এত সাধারণভাবে থাকিস!” ভাইদের সব ব্যাপারেও থাকিস নিরহংকার। আলিম শান্ত কণ্ঠে বলে, “ওরা আমার ভাই। ভাইয়ের প্রতি হিংসা কেমন করে হয়?”
তারপর একটু চুপ থেকে বলে, “তবে একটা কথা—আমার মনটা একজনের জন্য সবসময় কাঁদে।”
বোরহান মুচকি হেসে বলে, “সুমা, তাই তো?”
আলিম লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে। সে বলে, “আজ কিছু জিনিস কিনবো, তুই সুমাকে দিয়ে দিবি।”
বোরহান মাথা নেড়ে বলে, “না, তুই নিজেই দিবি। আর তুই তোর মনের কথাও বলবি।”
আলিম কাঁপা কণ্ঠে বলে, “আমি ওর সামনে গেলে কথা বলতে পারি না। সব গুলিয়ে যায়। অনেক কিছু বলতে চাই, কিন্তু কিছুই বলতে পারি না।”
বোরহান বলে, “এভাবে প্রেম করবি কীভাবে? মনের কথা তোকে বলতেই হবে।
সন্ধ্যার দিকে সাহস সঞ্চয় করে আলিম সুমার সাথে দেখা করতে যায়। তার হাতে একটি ব্যাগ। সে ব্যাগটা এগিয়ে দিয়ে বলে, “এই নাও, তোমার জন্য এনেছি।”
সুমা ব্যাগ নিয়ে কৌতূহলীভাবে জিজ্ঞেস করে, “কী এনেছো?”
আলিম একটু লজ্জা পেয়ে বলে, “কিছু কসমেটিকস।”
সুমা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে, “এইসব দিয়ে কী হবে? তুমি যদি সত্যি আমাকে চাও, তাহলে আমার মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাও।”
আলিম যেন আকাশ থেকে পড়ে। সে বলে, “বিয়ে? এখনই?”
সুমা বলে, “হ্যাঁ, এতে অবাক হওয়ার কী আছে?”
আলিম ধীরে ধীরে বলে, “আমার বড় দুই ভাই এখনো বিয়ে করেনি। আমি তাদের আগে কীভাবে বিয়ে করি!”
এই কথা শুনে সুমার মুখ ভার হয়ে যায়। সে বলে, “তাদের জন্য তুমি আমাদের বিয়ে আটকে রাখবে? তাহলে থাক—আমি আমার মাকে বলবো অন্য কোথাও আমাকে বিয়ে দিতে।” এই বলে সে রাগ করে চলে যায়। আলিম অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু কিছু বলতে পারে না।
কিছুদিন পর বাড়ির উঠানে কয়েকজন সমবয়সী মেয়ে গল্প করছিল। তাদের মধ্যে সুমাও ছিল। তারা হাসাহাসি করছিল, বেশ আনন্দে ছিল। হঠাৎ শাহাদাত সেখানে এসে বিরক্ত হয়ে বলে, “এই মেয়েরা, এত হইচই করছো কেন?”
সুমা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়, “আপনার সমস্যা হলে কানে তুলা দিয়ে রাখেন। আমাদের আনন্দ নষ্ট করবেন না।”
শাহাদাত কিছুটা রেগে বলে, “তোমাদের জন্য ঘরে থাকতে পারছি না।”
সুমা নির্ভয়ে বলে, “ঘরে থাকতে না পারলে বাইরে যান।”
এই সাহসী জবাবে শাহাদাত অবাক হয়ে যায়। সে সুমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ করে বলে, “তুমি খুব সাহসী মেয়ে। তোমাকে আমার ভালো লাগছে। তোমাকে আমি বউ বানাবো।”
সুমা একটু অবাক হলেও, সে মৃদু হাসে। সেই মুহূর্ত থেকেই তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়।
পরবর্তী দিনগুলোতে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে সুমার মন শাহাদাতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সে আলিমকে ভুলে যেতে শুরু করে। এখন তার স্বপ্নে শুধু শাহাদাত।
এরপর শাহাদাত পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পায়। বাড়িতে তার বিয়ের কথা ওঠে। বাবা-মা একটি ভালো পরিবারের মেয়ে পছন্দ করে। শাহাদাত মেয়েটিকে না দেখেই রাজি হয়ে যায়। সে বলে, “তোমরা যাকে পছন্দ করো, তাকেই আমার পছন্দ।”
একসাথে ইকবাল আর শাহাদাতের বিয়ে হয় ধুমধাম করে।
বিয়ের পরদিন শাহাদাত দেখে তার স্ত্রী দেখতে কালো। এতে তার মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়। সে মাকে বলে, “ মা আমার জন্য এমন কালো মেয়ে আনলে?”
মা শান্তভাবে বলেন, “মেয়ের গুণটাই বড়, রং নয়।”
অন্যদিকে সুমা ভেঙে পড়ে। সে কাঁদতে কাঁদতে শাহাদাতের কাছে যায়। বলে, “তুমি আমার সাথে বেইমানি করেছো!”
শাহাদাত বলে, “আমি কীভাবে বেইমানি করলাম?”
সুমা বলে, “তুমি তো বলেছিলে আমাকে বিয়ে করবে! এখন অন্য মেয়েকে বিয়ে করলে?”
শাহাদাত অসহায়ভাবে বলে, “আমি চাইছিলাম, কিন্তু বাবা-মা বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে।”
সুমা রাগে বলে, “তুমি চাইলেই থামাতে পারতে!” তারপর সে দৃঢ়ভাবে বলে, “এখন তোমাকে আমাকে বিয়ে করতেই হবে।”
প্রথমে শাহাদাত রাজি না হলেও, সুমার জেদের কাছে হার মেনে শেষ পর্যন্ত গোপনে তাকে বিয়ে করে। তারা এই বিয়েটা গোপন রাখে।
কিছুদিন পর আলিম সুমাকে বলে, “এখন আর বিয়ে করতে কোনো বাধা নেই। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”
সুমা ঠান্ডা গলায় বলে, “আমি তোমাকে বিয়ে করবো না। তুমি অশিক্ষিত!”
আলিম যেন বজ্রাহত হয়। সে বলে, “আমি অশিক্ষিত? তুমি বুঝি খুব শিক্ষিত?”
সুমা তখন বলে, “আমার বিয়ে হয়ে গেছে—তোমার ভাই শাহাদাতের সাথে। এখন তুমি আমাকে সম্মান দিয়ে কথা বলবে।”
এই কথা শুনে আলিম পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। সে কিছুই বলতে পারে না।
এরপর শুরু হয় সংসারের অশান্তি। শাহাদাতের প্রথম স্ত্রী সানজিদার সাথে সুমার ঝগড়া লেগেই থাকে। সুমা নিজেকে শাহাদাতের স্ত্রী হিসেবে দাবি করে। একসময় বিষয়টি প্রকাশ পায়।
সানজিদা অবাক হয়ে যায় এবং শাহাদাতকে জিজ্ঞেস করে, “সুমা তোমার কে?”
শাহাদাত এড়িয়ে যেতে চায়, কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়। আলিমও সব শুনে ফেলে। পুরো পরিবারে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। এই টানাপোড়েনে শাহাদাত মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। একসময় সে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
হঠাৎ একদিন খবর আসে—শাহাদাত আর বেঁচে নেই। এই খবর শুনে পুরো বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে। সবাই কান্নায় ভেঙে পড়ে। তাকে বাড়িতে এনে দাফন করা হয়।
কিন্তু দুঃখের মাঝেও শান্তি থাকে না। কয়েকদিন না যেতেই দুই স্ত্রীর মধ্যে পেনশনের টাকা নিয়ে তুমুল ঝগড়া শুরু হয়। বিষয়টি এতটাই খারাপ হয় যে সালিশ ডেকে মীমাংসা করতে হয়।
একদিন সুমা আবার আলিমের কাছে আসে। সে বলে, “আলিম, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”
আলিম দৃঢ় কণ্ঠে বলে, “তোমাকে বিয়ে করতে চাই না। আমি সারাজীবন বিয়ে না করেও থাকতে পারবো।”
সুমা তাকে প্রলুব্ধ করে বলে, আমাকে বিয়ে করলে, “আমি তোমাকে তোমার ভাইয়ের পেনশনের টাকা দেবো।”
আলিম কঠিন চোখে তাকিয়ে বলে, “আমি কোনো টাকা চাই না, আর তোমাকেও না। বেইমান মানুষকে আমি আমার জীবনে জায়গা দিতে পারবো না। তোমার কারণেই এই সংসারটা ভেঙে গেছে।” আর তাকে করব আমি আমার জীবন সঙ্গী!
শান্তা / শান্তা
“একটি হত্যার ইতিকথা” সুলেখা আক্তার শান্তা
“ফটিক দাদুর দুর্ভাগ্য” সাঈদুর রহমান লিটন
তুমিহীনা ফারজানা ইয়াসমিন
অন্তর্বাসের আড়ালে স.ম. শামসুল আলম
“দাদি-নাতির দোয়ার ফি” -সুলেখা আক্তার শান্তা
“অলীক বেদনা” -সুলেখা আক্তার শান্তা
“ভালোবাসার রক্তদাগ”-সুলেখা আক্তার শান্তা
ইবনে খালদুনের ‘আল মুকাদ্দিমা’ সমাজবিজ্ঞান রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির আকরগ্রন্থ এস ডি সুব্রত
হাহাকার জ. ই. মামুন
রূপান্তর রাত্রি-সুলেখা আক্তার শান্তা
বক্তা রেজাউদ্দিন স্টালিন
নিঃসঙ্গ ভোর -সুলেখা আক্তার শান্তা