ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

ছোটগল্প

“একটি হত্যার ইতিকথা” সুলেখা আক্তার শান্তা


সাহিত্য ডেস্ক photo সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১-৬-২০২৬ রাত ৯:৩২

খুব ভোরেই ডাকাডাকি শুরু হয়ে যায়।

নাফিজা ওঠ, উঠে হাঁটতে যা।

উফ, কী শুরু করলে তোমরা! ভীষণ ঘুম পাচ্ছে, আমাকে একটু ঘুমাতে দাও।

সারাদিন তো শরীর ব্যথা নিয়ে চেঁচামেচি করিস। ডাক্তার বলেছে হাঁটতে, ওজন কমাতে। ওঠ এখন।

ঠিক আছে উঠছি, তোমরা আর ডাকাডাকি কোরো না। আর মাত্র পাঁচটা মিনিট ঘুমাবো।

না, এখনই ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে যা। তারপর এসে নাস্তা খেয়ে যত ইচ্ছে ঘুমাস।

বাসায় সবার ডাকাডাকি শুনে বিছানা থেকে না উঠে পারলাম না। তৈরি হয়ে নিলাম হাঁটতে যাওয়ার জন্য। গেটের বাইরে পা রাখতেই একঝলক ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগল। ভীষণ শীত, চারদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা। তার মধ্যেই হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তায় পথচারীদের তেমন দেখা নেই। কুয়াশার কারণে দু-এক কদম সামনে যতটুকু দেখা যায়, ততটুকুই ভরসা। হাত দুটো ঠান্ডায় জমে আসছে। উফ, কী যে শীত! তখনই মনে হলো, হাত দুটো তো সোয়েটারের পকেটে রেখেও হাঁটা যায়।

আমি যখন হাঁটি, তখন ডানে-বায়ে তেমন একটা তাকাই না, নিজের গতিতে চলি। সামনেই বারেক মোল্লার মোড়। মোড়টা পার হয়ে এপারে আসতেই কয়েকটা বাড়ি চোখে পড়ল। আপনমনে হাঁটছিলাম, হঠাৎ একটা গুনগুন শব্দ শুনে থমকে দাঁড়ালাম। তাকিয়ে দেখি, একটা মা কুকুর তার আটটি ছানা নিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। শীতে বাচ্চাগুলো খুব কাঁপছিল। দৃশ্যটা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। মায়ায় পড়ে গেলাম, ওখান থেকে পা বাড়াতে পারছিলাম না। পাশেই কিছু ইটের খোয়া আর বালুর বস্তা রাখা। সেই ভেজা মাটিতেই মা কুকুরটি তার বাচ্চাদের আগলে বসে আছে। আমি মুগ্ধ হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলাম, ওরাও বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো ওদের খুব খিদে পেয়েছে। আহা, কী যে করি! তাড়াহুড়ো করে বের হওয়ায় কোনো টাকাও নিয়ে আসিনি যে কিছু কিনে দেব। আবার ওদের ছেড়ে যেতেও মন চাইছে না। মনে মনে বললাম, ঠিক আছে, আগামীকাল তোমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করব। আমি যখন আবার হাঁটতে শুরু করলাম, ওরা আমার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। খানিক দূর গিয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলাম, ওরা তখনও একদৃষ্টিতে আমার দিকেই চেয়ে আছে।

হাঁটা শেষ করে বাসায় ফিরলাম। কিন্তু মন থেকে ওদের চিন্তা কিছুতেই যাচ্ছিল না। বাসায় আমার নিজের পোষা বিড়ালগুলোর সাথে কিছুটা সময় কাটালাম। আমি বাইরে থাকলে ওদের মন ভীষণ খারাপ থাকে, আর আমি বাসায় ফিরলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। ওরা আমার মনের ভাষা বোঝে, আর আমিও ওদের চোখের ভাষা দেখলেই বুঝি ওরা কী বলতে চাইছে। আমি ওদের কখনো 'বিড়াল' বলে ডাকি না, সবার আলাদা নাম আছে। বিড়াল বললে যেন ওরা কষ্ট পায়, মন খারাপ করে। তবে বাসায় মেহমান আসলে তাদের বোঝানোর জন্য কখনো কখনো 'বিড়াল' শব্দটা মুখ থেকে বেরিয়ে যায়। তখন আমি মেহমানদেরও বুঝিয়ে বলি, ওদের বিড়াল বলবেন না দয়া করে, যার যা নাম, সেই নামে ডাকবেন।

পরদিন সকালে আর কাউকে আমাকে ডেকে তুলতে হলো না। আজ নিজের তাগিদেই ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে বের হলাম। তবে আজ বের হওয়ার সময় কিছু টাকা নিয়ে নিয়েছিলাম। গুটিগুটি পায়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু ওখানে গিয়েই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। আটটা ছানার মধ্যে তিনটা ছানা নেই! মাত্র পাঁচটা ছানা মায়ের সাথে বসে আছে। আশেপাশে অনেক খুঁজলাম, কিন্তু কোথাও পেলাম না। আহা রে, কী বিচিত্র জীবন এদের! সব দুঃখ-কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করে নিতে হয়। না আছে মাথা গোঁজার ঠাঁই, না আছে একটু খাবার। এই তো ওদের জীবন।

কাছের দোকান থেকে কয়েকটা কেক কিনে ওদের সামনে দিলাম। দেখলাম, ওতটুকু বাচ্চা ক্ষুধার্ত অবস্থায় কত আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে। খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকাচ্ছে। ওদের পেট ভরে খেতে দেখে আমার মনটাও এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেলো। মনে মনে বললাম, ঠিক আছে, তোমরা পেট পুরে খাও। ছানাগুলো দেখতে মাশাল্লাহ খুব সুন্দর ছিল। এরপর আমি হাঁটতে চলে গেলাম। অনেকটা পথ হেঁটে ফেরার পথে ওদের আবার একটু দেখে বাসায় ফিরলাম। মনে মনে ভাবলাম, থাকো তোমরা, আগামীকাল আসা-যাওয়ার পথে আবার দেখা হবে। এভাবে দু-তিন দিন ওদের কেক আর রুটি খাওয়ালাম। কিন্তু পরে মনে হলো, এই শুকনো খাবারে ওদের ঠিকমতো পেট ভরছে না। তার চেয়ে বাসা থেকে ভাত নিয়ে আসলেই তো ভালো হয়।

পরের দিন বাসা থেকে ভাত মেখে নিয়ে গেলাম। ওদের সামনে গিয়ে যখন ভাতটা দিতে যাব, দেখি পাঁচটা ছানার মধ্যে আরও তিনটি নেই! এখন মাত্র দুটি ছানা আছে। চারদিকে অনেক খোঁজাখুঁজি করলাম। তখন ওখানকার একজন দোকানদার বললেন, "তিনটা বাচ্চাই রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে আপা। যেভাবে ওরা ছোটাছুটি করত! আর এই গাড়ির ড্রাইভারগুলো তো দেখেশুনে গাড়ি চালায় না, যে যার মতো বেপরোয়া চালায়। মনের ভেতরটা হু হু করে উঠল। যে তিনটি বাচ্চা দেখতে সবচেয়ে সুন্দর ছিল, তারাই দুনিয়া থেকে চলে গেল!

আমি আশেপাশের দোকানদারদের অনুরোধ করলাম, একটু দেখে রাখবেন বাচ্চাগুলোকে। চায়ের দোকানদার এক মুরুব্বি বললেন, আচ্ছা, দেইখা রাখুমনে কুত্তাগুলার খেয়াল রাখুম। ওরা খালি ছোটাছুটি করে তো! কত সুন্দর তিনটা বাচ্চা গাড়ির নিচে পইড়া মইরা গেলো! আমি তো খাওন দিতে পারমু না, তবে এমনি চোখে চোখে রাখুমনে। আমি বললাম, ঠিক আছে চাচা, আপনি একটু দেখলেই হবে।

তার পরের দিন গিয়ে দেখি সেখানে আর কেউ নেই। চারদিক শূন্য। মনে বড় ভয় লেগে গেলো, ওরা গেলো কই? একটু দূরে মা কুকুরটাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাচ্চা কই? সে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, বুকফাটা অনেক অভিযোগ জমে আছে ওর অবলা মনে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর, ওরা আগে যেখানে থাকত, তার থেকে কিছুটা দূরে দুই জায়গায় দুটি বাচ্চাকে দেখতে পেলাম। ওরা আমাকে দেখতে পেয়েই লেজ নাড়তে নাড়তে ছুটে এলো। খাবার দিতেই মা আর ছানা দুটি গোগ্রাসে খেতে লাগল। খাচ্ছে আর কৃতজ্ঞ চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে।

এই দুটি ছানার মধ্যে একজনকে দেখে আমার ভীষণ মায়া হতো। আসলে ওর জন্যই আমার রোজ খাবার নিয়ে আসা। ছানা দুটির একটি জন্ম থেকেই পঙ্গু, সামনের দুটি পা তেমন নাড়াতে পারে না। ও আমাকে দেখলেই আনন্দে কী করবে বুঝে উঠতে পারত না। আমি খুব আপন মনে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এর মধ্যেই চায়ের দোকানদার চাচা এসে ফিসফিস করে বললেন, এই বাড়ির মালিক ওদের এখানে থাকতে দিতে চায় না। পিটিয়ে তাড়িয়ে দেয়। আমি কিছু বলি না, বললে আবার আমার দোকান নিয়ে সমস্যা করতে পারে। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, কী যে করি চাচা! দেখে ভীষণ মায়া লাগে। চাচা বললেন, দেখেন কী করবেন।

সেদিন থেকে আমি ওদের নাম রাখলাম, ঝন্টু' আর 'মন্টু। একজন কুচকুচে কালো, আর অন্যজন হলুদ-কালো মেশানো। কালো ছানাটাকে ডেকে বললাম, তোমাকে আমি আজ থেকে 'কালু' বলেও ডাকব। আমার মনে হলো, নামটা শুনে কালু লেজ নেড়ে সম্মতি দিলো। অল্প দিনেই ওদের প্রতি আমার গভীর মায়া জন্মে গেলো।

এখন রোজ সকালে আমার ছোট বোন খুব আগ্রহ নিয়ে বাসা থেকে ভাত প্যাকেট করে দেয়। কালু-মন্টুর যতটুকু লাগে, ও তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে দেয়। আমি মাঝে মাঝে বলি, এত ভাত দিচ্ছিস কেন রে তুই? ও হাসিমুখে উত্তর দেয়, আহা দাও না, একবেলা পেট পুরে খাবে। আর যাওয়ার পথে তো আরও কত কুকুর-বিড়াল চোখে পড়ে, ওদেরও কিছু দিও। সত্যিই, ভাত নিয়ে যাওয়ার পথে রাস্তায় আরও যেসব কুকুর-বিড়াল দেখতাম, তাদেরও কিছুটা করে খাবার দিতাম।

একদিন সকালে এসে দেখি আবার সেই একই অবস্থা, আশেপাশে ওদের কোথাও দেখা যাচ্ছে না। আমি ডাকতে লাগলাম, ঝন্টু, মন্টু কই তোমরা? কোনো সাড়াশব্দ নেই। বুকটা কাঁপতে শুরু করল। আবার ডাকলাম, কালু! হঠাৎ একটা 'হো হো' শব্দ শুনতে পেলাম। আওয়াজটা পেয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। তাকিয়ে দেখি, সামনে একটা বড় জায়গা নিয়ে সীমানা প্রাচীর দেওয়া একটি বাড়ির নির্মাণকাজ চলছে, ভেতরে অনেকটা জায়গা খালি পড়ে আছে। যাক, এখানে থাকলেই ভালো। রাস্তার গাড়ির ভয় অন্তত থাকবে না। দোকানদার চাচা দূর থেকে দেখে বললেন, হ্যাঁ মা, কুত্তাগুলো ওইখানেই থাকে এখন। ওইখানে থাকলে ওরা ভালো থাকবে। আমারও তাই মনে হলো। ওদের খাবার খাওয়ালাম, ওরাও সেখানে মনের আনন্দে ছোটাছুটি করতে লাগল। কালুর পায়ে সমস্যা থাকার পরও তার আনন্দের কোনো কমতি ছিল না, খোড়াতে খোড়াতেই ভাইটির সাথে খেলছিল। 

পরের দিন ভাত নিয়ে এসে দেখি গেট বন্ধ। ভেতরে কালু আর মন্টু গেটের ফাঁক দিয়ে আমাকে দেখে খুব ছোটাছুটি করছে আর ডাকছে। কিন্তু গেট বন্ধ থাকায় ভেতরে যাওয়ার উপায় নেই। বাধ্য হয়ে আমি পলিথিন গেটের নিচ দিয়ে খাবারটা ভেতরে ঠেলে দিলাম। ঝন্টু, মন্টু আর ওদের মা মিলে খেয়ে নিলো। কিন্তু ওদের কাছে যেতে না পেরে আমার মনটা খুব ছটফট করছিল। এভাবে কিছুদিন চলার পর, ওখানকার দারোয়ান আর কন্সট্রাকশন কন্ট্রাক্টরের সাথে আমার পরিচয় হলো। তারা মানুষ হিসেবে ভালোই মনে হলো, আমি গেটে গেলে গেট খুলে দিত। আস্তে আস্তে দিন পার হতে লাগল, কিন্তু আমি ওদের খাওয়ানো একদিনের জন্যও বন্ধ করলাম না। আমার সারাক্ষণ চিন্তা হতো, আমি যদি খাবার না নিয়ে যাই, ওরা সারাদিন না খেয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকবে। আমি সামনে গেলেই ওরা আমার পায়ে গা ঘষত, আমার হাত চাটত। আমি তাতে এক স্বর্গীয় আনন্দ পেতাম। আমি গেটে নক করলেই ওরা ভেতর থেকে কুঁইকুঁই করে ডাকতে ডাকতে ছুটে আসত। আমি বলতাম, চুপ করো, শান্ত হও। কিন্তু আমি ভেতরে না ঢোকা পর্যন্ত ওদের আনন্দ থামত না। ওদের এই ভালোবাসা ওখানকার অন্য মানুষরাও দেখত এবং আনন্দ পেত। ওদের এই মায়ার টানে আমি দূরে কোথাও বেড়াতেও যেতাম না, ভাবতাম আমার অনুপস্থিতিতে ওদের খাওয়ার খুব কষ্ট হবে।

দেখতে দেখতে রমজান মাস চলে এলো। ভাবলাম, রোজা রেখে এত রোদ আর গরমে হাঁটা হয়তো সম্ভব হবে না, শরীর দুর্বল লাগবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, আমি না গেলে ওরা আর ওর মা খাবে কী? তাই রোজা রেখেও আমি প্রতিদিন বারেক মোল্লার মোড়ে ওদের জন্য খাবার নিয়ে যেতাম। কিন্তু ইদানীং লক্ষ্য করছিলাম, ওখানকার দারোয়ান আর কন্ট্রাক্টরের তাকানো বা আচরণ কেমন যেন বদলে গেছে। ওদের ভাবভঙ্গি দেখে আর ওখানে যেতে ইচ্ছে করত না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওদের 'ভাইয়া' বলে ডেকে সম্মান দেখাতাম, যাতে কুকুরগুলোকে কিছু না বলে। মাঝে মাঝে দারোয়ান বলত, আজকে খাবার দিতে হবে না, চলে যান। ওরা এখানে নাই। আমি বলতাম, ঠিক আছে, আমি একটু ভেতরে গিয়ে দেখি। আমি ভেতরে পা রাখতেই ওরা কোথা থেকে যেন দৌড়ে চলে আসত। ওরা যখন আসত, আমি দারোয়ানের দিকে তাকাতাম। দারোয়ান তখন চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিত।

 

আরেকদিন বলল, আজ ওরা খাবে না, আপনি চলে যান। ওরা অন্য খাবার খেয়েছে। কিন্তু আমি দেখতাম, খাবারের প্যাকেটটা হাতে নিলেই ওরা খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যেত। খাবারটা ঢেলে দিতেই দারোয়ানের স্ত্রী মর্জিনা বলে উঠল, ওরা খাবারের জন্য পাগল হয়ে গেছে আপা, আমি তো কেবল ভাত বসালাম। আমি মনে মনে ভাবলাম, দারোয়ান বলল ওরা খেয়েছে, আর তার বউ বলছে অন্য কথা! বউ যখন কথাটি বলছিল, দারোয়ান তখন সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমি আর কিছু বললাম না। যেখানে মিথ্যাটা হাতেনাতে ধরা পড়ে, সেখানে তর্ক না করে চুপ থাকাই ভালো। এমন আচরণ সে প্রায়ই করত। তারপরও আমি তার কথা গায়ে না মেখে রোজ ঝন্টু-মন্টুকে খাবার দিয়ে আসতাম।

কিছুদিন পর অফিসে কাজের খুব চাপ বেড়ে গেলো। একদম সময় পাচ্ছিলাম না। ছোট বোনটাকে বললাম, তুই যদি একটু কষ্ট করে খাবারটা দিয়ে আসতি, আমার খুব উপকার হতো। ও আমার কাজের চাপ দেখে রাজি হলো। এরপর থেকে ওই খাবার নিয়ে যেত। আমি অফিস থেকে ফিরে খুব উদগ্রীব হয়ে ওর কাছে ঝন্টু-মন্টুর খোঁজ নিতাম। ও আমাকে প্রতিদিনের সব কথা বলত।

হঠাৎ একদিন আমার বোন এসে বলল, আপু, আমি আর ওইখানে খাবার নিয়ে যাব না।

আমি চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, কেন? কী হয়েছে?

ওখানকার দারোয়ান লোকটা ভালো না। কেমন অদ্ভুতভাবে তাকায়, কেমন জানি কথা বলে।

আমি একটু ভেবে বললাম, ঠিক আছে, তুই গেটের ভেতরে ঢুকবি না। গেটের সাইডে খাবারটা দিয়ে চলে আসবি।

ও বলল, তারপরও তো গেটের ভেতরে একটু ঢুকতেই হয়, একদম বাইরে থেকে তো খাবার দেওয়া যায় না।

বোনের কথা শুনে আমি ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম। বললাম, আচ্ছা, তুই আর মাত্র দু’দিন একটু সাবধানে গিয়ে খাবারটা দিয়ে আয়। ও পরদিনও খাবার নিয়ে গেলো। কিন্তু সেদিন খাবার খাওয়ানোর সময় পেছন থেকে দারোয়ান এসে ওর পরনের ওড়না পা দিয়ে মাড়িয়ে ধরল। আমার ওড়না পা দিয়ে পারা দিয়ে ধরছে কেন? ছাড়েন! তখন লোকটা কুৎসিত হেসে বলল, ছাড়ব না, ছাড়ব না। তাহানা ভীষণ ভয় পেয়ে ওখান থেকে কোনোমতে চলে এলো এবং বাসায় এসে কান্নায় ভেঙে পড়ল। ও পরিষ্কার জানিয়ে দিলো, ও আর কখনো ওখানে যাবে না।

আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। তাহানা জমির মালিকের কাছে গিয়ে তুই পুরো বিষয়টা খুলে বল। ও তাই করলো। মালিক সবকিছু শুনে ভীষণ রেগে গেলেন। বললেন, কী! ওই দারোয়ানের এত বড় সাহস! ঠিক আছে মা, আমি বিষয়টা দেখছি। তুমি নিয়মমতো খাবার দিয়ে যেও, খাবার দেওয়া বন্ধ কোরো না। একদিন তোমার বোনের সাথেও আমার কথা হয়েছিল, খুব ভালো লেগেছিল। এই স্বার্থপর পৃথিবীতে মানুষ যেখানে মানুষের খোঁজ নেয় না, সেখানে তোমরা রাস্তার অবলা কুকুরকে খাবার দাও! এটা অনেক বড় পুণ্যের কাজ। দেখবে, আল্লাহ তোমাদের মঙ্গল করবেন। কোনো ভালো কাজের প্রতিদান কখনো বিফলে যায় না। মালিকের কথায় আশ্বস্ত হলো।

 

এরপর চলে এলো কোরবানির ঈদ। ঈদের আগের দিন। আমি খাবার নিয়ে গেলাম। অনেকক্ষণ যাবৎ গেট নক করলাম, কিন্তু কেউ গেট খোলে না। প্রায় এক ঘণ্টার মতো গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমিও দমার পাত্র নই, নাছোড়বান্দার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। একদিকে প্রচণ্ড বৃষ্টি, অন্যদিকে ভ্যাপসা গরম, শরীর যেন সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে গেট খুলল। দারোয়ান চরম অহংকার নিয়ে বলল, নাই, ওরা এখানে নাই।

আমি তাও ভেতরে ঢুকে ঝন্টু, মন্টু বলে ডাকতে লাগলাম। মন্টু ছুটে এলো, কিন্তু কালু এলো না। কালুর জন্য আমার মনটা ভীষণ খারাপ হতে লাগল, কারণ কালুই সবসময় আগে দৌড়ে আসত। আমি কালুরে খোঁজাখুঁজি করে পাচ্ছিলাম না। কালুর মা আমাকে ইশারা বুঝালো কালু এখানেই আছে। কালুর মায়ের ইশারায় আমি বুঝে নিলাম কালু এখানে আছে। এর মধ্যে দারোয়ান নির্মাণাধীন ভবনের নিচতলার অন্ধকার থেকে কালুকে ডাকতে লাগল, বাইরে আয়, বাইরে আয়। কিন্তু কালু বের হতে পারছিল না। আমি ভাবলাম, কী ব্যাপার! কালু বের হচ্ছে না কেন? আমি একটু সামনে এগিয়ে যেতেই দেখলাম, কালু অনেক কষ্ট করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বের হয়ে এলো।

আমাকে দেখে ও এক করুণ ও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কালু ওর পা ফেলে হাঁটতে পারছে না, ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছে না, বারবার পড়ে যাচ্ছে। এতো সুস্থ-সবল কালুটার এই অবস্থা! দূর থেকে দারোয়ান বলতে লাগল, অসুস্থ, ও কয়দিন ধইরা অসুস্থ। আমার মনে খটকা লাগল, আমার বোন তো একদিনও বলল না কালু অসুস্থ! দারোয়ানের বউও সুর মিলিয়ে বলল, হ্যাঁ আপা, কয়দিন ধইরা ও অসুস্থ।

আমি কালুর অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লাম। এমন কী হতাশ হয়ে পড়লাম। ওই খালি জায়গায় ঈদের গরু-ছাগল রাখার জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছিল।ওখানকার একজন লোক এসে আমাকে বলল, কুত্তা পালা হারাম আপা, কুত্তা পালা জায়েজ নাই। ওরে যে ইচ্ছেমতো পিটিয়েছে, ভালোই করেছে। আমি স্তম্ভিত হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। রাগ ও ক্ষোভে আমার গা কাঁপছিল। আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, আপনি কী বললেন? ওকে পিটিয়েছে? আমার কথা শুনে লোকটা আর কোনো উত্তর না দিয়ে চলে গেলো।

তার মানে, কালুকে পিটিয়ে এই অবস্থা করা হয়েছে! আমি কিছুতেই কান্না থামাতে পারছিলাম না, কাঁপতে কাঁপতে বাসায় ফিরলাম। বোনের সাথে আলাপ করলাম যে কালুর অবস্থা খুব খারাপ। হঠাৎ আমার মনে হলো, দারোয়ান জানত আমি কালুকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। আর আমার বোন যেহেতু বাড়ির মালিকের কাছে ওর বিরুদ্ধে বিচার দিয়েছিল, সেই আক্রোশ আর রাগ সে ওই অবলা, পঙ্গু কালুটার ওপর ঝেড়েছে! মানুষ একটা নিষ্পাপ প্রাণীকে এভাবেও মারতে পারে?

আজ ঈদের দিন। সকাল সকাল খাবার নিয়ে রওনা হলাম। আজও সেই একই অবস্থা, কেউ গেট খুলছে না। কিন্তু কালুকে দেখার অধীর আগ্রহে আমি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। অনেকক্ষণ পর গেট খুললে আমি ভেতরে গেলাম। আজ মন্টু এলো, কিন্তু কালু এলো না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কালু কই? দারোয়ান ধমক দিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল, কালু বাঁচব না, মইরা যাইব।

কথাটা শুনে বুকটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। আমার চোখের পাতা বেয়ে পানি পড়তে লাগল। আমি তখনই আমার এক বড় আপুকে ফোন দিলাম। বললাম, নিপা আপু, কালুর অবস্থা খুব খারাপ, আমি কী করব? নিপা আপু বলল, তুই কোনো চিন্তা না করে ওরে এক্ষুনি একটা রিকশায় তুলে আমার বাসায় নিয়ে আয়।

আমি মুহূর্তের মধ্যে একটা রিকশা নিয়ে কালুকে কোলে তুলে নিপা আপুর বাসার দিকে রওনা হলাম। বাসার গলির মুখে আপু আগেই দাঁড়িয়ে ছিল। আপু পরম মায়ায় কালুকে কোলে করে তার বাসায় নিয়ে গেলো। বিছানায় সুন্দর করে কালুকে শোয়ানো হলো। আমার চোখ দিয়ে তখন শুধু পানি পড়ছিল। আপু চটপট রান্নাঘর থেকে মুরগির স্যুপ বানিয়ে নিয়ে এলো আর বলল, তুই ওরে চামচ দিয়ে এই স্যুপটুকু খাওয়া, আমি ওর জন্য স্যালাইন আর বাটারফ্লাই নিডল নিয়ে আসছি, স্যালাইন পুশ করতে হবে।

আমি কালুকে চামচ দিয়ে স্যুপ খাওয়াতে শুরু করলাম। পাশে নিপা আপুর ছোট মেয়েটি জিমিও আমাদের সাথে ওর যত্ন নিচ্ছিল। কিছুটা স্যুপ মুখে দিতেই কালু শেষবারের মতো একটু নড়ে উঠল। ও আমার দিকে তাকাল, ওর চোখ কোণ দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। তারপর... চিরতরে শান্ত হয়ে গেলো কালু। আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আমি কেঁদে বললাম, জিমি কালু আর নেই। নিপা আপু রুমে এসে দেখল কালু সত্যি চলে গেছে। কালুর পেছনের অংশ থেকে তখন অনেক রক্ত ঝরছিল। অর্থাৎ, ওকে নির্মমভাবে আঘাত করা হয়েছিল।

কালুর নিথর দেহটা নিয়ে আমরা আবার সেই জায়গায় ফিরে এলাম। দারোয়ান ভণ্ডামি করে জিজ্ঞেস করল, কালুর কী হইছে? আমি বললাম, ও আর নেই, মারা গেছে! ওকে একটু মাটি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। দারোয়ান তখন একটা কোদাল নিয়ে গর্ত খুঁড়ল। তারপর কালুকে সেখানে মাটি দেওয়া হলো। আমি অশ্রুসজল চোখে চারদিক দেখছিলাম। মনে হলো, কালু এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর মানুষের প্রতি এক বুক অভিমান আর অভিযোগ নিয়ে চলে গেছে। হায়রে মানুষ! নিজের সামান্য রাগ আর অহংকার মেটাতে একটা অবলা প্রাণীকে পিটিয়ে মেরে ফেললে?

ঈদের পরের দিন আমি মন্টুর জন্য খাবার নিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, দারোয়ান আর তার বউয়ের মুখ খুব মলিন, দুজনেই মন খারাপ করে বসে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে আপনাদের? দারোয়ান বলল, আমার ছেলেটা ভীষণ অসুস্থ আপা, কাল ঈদের দিন থেকেই ও বিছানায়। আমি শুধু বললাম, ও, আচ্ছা।

এদিকে দেখলাম মন্টু খাবারটার দিকে তাকিয়েও দেখছে না, কিছুই খাচ্ছে না। ওর খেলার সাথী, ওর ভাই কালুর জন্য ওর মনটা ভীষণ খারাপ।

পৃথিবীতে কেউ মায়া করে ভালোবাসে, আর কেউ আঘাত করে আনন্দ পায়। এটাই কি এই পৃথিবীর নীতি আর নৈতিকতা? 



শান্তা / Aminur