প্রবন্ধ
ইবনে খালদুনের ‘আল মুকাদ্দিমা’ সমাজবিজ্ঞান রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির আকরগ্রন্থ এস ডি সুব্রত
ইবনে খালদুনের "আল মুকাদ্দিমা" সমাজবিজ্ঞান রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির আকরগ্রন্থ
এস ডি সুব্রত
বিখ্যাত দার্শনিক ও চিন্তাবিদ ইবনে খালদুনকে বলা হয় সমাজ বিজ্ঞানের অলিখিত জনক। পাশ্চাত্য জ্ঞানজগতে যখন সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসতত্ত্বের সূচনা হয়নি, তার আগেই তিনি তার লিখনিতে এ বিষয়ের অবতারণা করেছেন চিন্তা ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে। তার গ্রন্থ বিধৃত বিষয়বস্তু বিশ্লেষণের দক্ষতা বিবেচনায় নিয়ে ঐতিহাসিকরা তাকে ইতিহাস বিজ্ঞানের একজন শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক বলে গণ্য করেছেন। চতুর্দশ শতকের পাশ্চাত্য লেখকদের জন্য তার ধ্রুপদী আল মুকাদ্দিমা গ্রন্থটি ইউরোপে অষ্টাদশ শতকের ইতিহাস তত্ত্বের ভিত্তি রচনা করেছে। ইবনে খালদুন সম্পর্কে বাংলা ভাষায় তেমন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়নি। গোলাম সামদানী কোরায়শী আল মুকাদ্দিমা গ্রন্থের দুটি খণ্ড অনুবাদ করে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক রংগলাল সেনের একটা গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ আছে ইবনে খালদুনকে নিয়ে যা থেকে বাংলা ভাষার লেখক সমাজ উপকৃত হয়েছেন প্রভূত পরিমাণে। আল মুকাদ্দিমার একটি সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছিলেন নূর মোহাম্মদ মিয়া নামে একজন ব্যক্তি। এর বাইরে তেমন কোনো লেখাপত্তর দৃষ্টিগোচর হয় না। পাশ্চাত্যে তাকে নিয়ে প্রচুর কাজ হয়েছে, ভবিষ্যতে আরো হবে। বাংলাদেশেও তাঁকে নিয়ে কাজ করতে পারলে আমরা উপকৃত হব নিঃসন্দেহে। ইবনে খালদুন আরো অনেক বিষয়ে কাজ করলেও, তিনি মূলত তার বিখ্যাত আল মুকাদ্দিমা গ্রন্থের জন্য বিশ্বের বিজ্ঞজনদের ও সমাজের কাছে বেশি পরিচিত। বিশ্বের লেখালেখির পরিসরে তিনি আজও খুবই আলোচিত ব্যক্তি। তাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এখানেই তিনি অনন্য ও অসাধারণ।ইবনে খালদুন তিউনিসিয়ার তিউনিস শহরে জন্মগ্রহণ করেন। আরবি ভাষাতত্ত্ব ছিল তার অধ্যয়নের অন্যতম বিষয়। কোরআন, হাদিস, শরিয়া আইন, ফিকাহও শাস্ত্র পড়েছেন। সেইসাথে তিলিমসানের (উত্তর-পশ্চিম আলজেরিয়ার অঞ্চল) দার্শনিক ও গণিতবিদ আল-আবিলির কাছে গণিত, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন শেখার সুযোগ হয়েছিল তার। তিনি আবু রুশদ, ইবনে সিনা, আল-রাজির কাজ নিয়েও পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছেন এবং পড়াশোনা করেছেন। ২০ বছর বয়সে খালেদুন তিউনিসিয়ার শাসক ইবনে তাফরাকিনের দরবারে ক্যালিগ্রাফার হিসেবে কাজ নেন। দরবারের কাজকর্মের বিবরণ লিখে রাখতেন। ১৩৫২ সালে কনস্টানটিনের সুলতান আবু জিয়াদ তিউনিস দখল করে নিলে খালদুন তার শিক্ষক আবিলিকে অনুসরণ করে মরক্কোর একটি শহর ফেজে চলে যান। সেখানে তিনি রাজকীয় ফরমান লেখার কাজ পান। তবে রাজার কথা ঠিকমতো মেনে না চলার কারণে তিনি ২২ মাস কারাগারে বন্দি ছিলেন। এভাবে অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে খালেদুন সময় অতিবাহিত করেছেন। জীবনের শেষ দিকটা কাটিয়েছেন মিসরে। পড়িয়েছেন আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েও।
তিনি ছিলেন একজন কঠোর সমাজ সমালোচক। তিনি তার দেশে যখন যে অবস্থায় অবস্থান করেছিলেন, তখন সেখানকার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহে নিরলসভাবে নিয়োজিত ছিলেন। এভাবে তিনি এ অঞ্চলের জনগণ ও রাজনীতি সম্পর্কে প্রচুর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করেন। ১৩৭৪ সাল থেকে তিনি নিরবিচ্ছিন্নভাবে চার বছর সামাজিক ইতিহাস রচনায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। উক্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৩৭৭ সালের মে-অক্টোবর তিনি তার ধ্রুপদী মুক্কাদ্দিমার রূপরেখা প্রণয়ন করেন, যার বিশদ ব্যাখ্যার জন্য তাকে অন্তত আরো সাত বছর সময় ব্যয় করতে হয়। আল মুকাদ্দিমা গ্রন্থটি রচনায় খালদুন দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। তিনি তার সমকালীন লিখিত সূত্রসমূহ পর্যালোচনা করে প্রচুর উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। আবার উত্তর আফ্রিকার আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কিত তার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। এ কথা বলাই বাহুল্য যে, উক্ত অঞ্চলের লোকজন ও তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে ছিল তার সুগভীর আগ্রহ এবং ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘ পরিচয়। তিনি তার ওই গ্রন্থটি রচনায় শুধু রাজদরবারে সংরক্ষিত দলিল দস্তাবেজই পাঠ করেননি, অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত বিপুল তথ্যের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ যথাসম্ভব যৌক্তিকভাবে পরিবেশনের প্রয়াস পেয়েছেন। আল মুকাদ্দিমাকে সামাজিক বিজ্ঞানের যে তিনটি প্রধান শাখার আকরগ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা যায়, সে সব হলো- সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি। যদি শুধু সমাজবিজ্ঞানের দিক থেকে মুকাদ্দিমাকে মূল্যায়ন করা যায়, তাহলে ওই গ্রন্থের ছয়টি অংশকে সমাজবিজ্ঞানের ছয়টি ক্ষেত্রে অনায়াসে বিভক্ত করা সম্ভব। ক্ষেত্রগুলো হলো যথাক্রমে- সামাজিক ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা, জাতিতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞান, রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞান বা রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান, পরিবেশ সমাজবিজ্ঞান, সমাজ কাঠামো ও সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং শিক্ষার মনোবিজ্ঞান। মুকাদ্দিমা সম্পর্কে বৈরুত-আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক চার্লস ইসাবী বলেছেন, ‘চতুর্দশ শতকের আরব দার্শনিক ও ঐতিহাসিক ইবনে খালদুনের গবেষণা কর্মকে আমরা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতে পারি। সর্বজনীন ইতিহাসে তার মুখবন্ধ ইতিহাসতত্ত্বের উল্লেখযোগ্য ব্যাখ্যা প্রদান করেছে, যাতে উনিশ শতকের কার্ল মার্কসসহ আঠারো শতকের ইউরোপীয় লেখকদের ধ্যান-ধারণার পূর্বাভাস পাওয়া যায়। খালদুন সত্যিই ছিলেন একজন ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্ব।’
জর্জ সার্টনের মতে, ‘ইবনে খালদুন একজন ঐতিহাসিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও মানুষের কর্মকাণ্ডের গভীর অনুসন্ধিৎসু ছাত্র। তিনি মানবজাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উপলব্ধির জন্য এর অতীতের সুক্ষ্ম বিশ্লেষণে বিশেষভাবে ব্রতী হয়েছিলেন। খালদুন কেবল মধ্যযুগের ঐতিহাসিকই ছিলেন না। তিনি মেকিয়াভেলি, বোদে, ভিকো ও সমাজবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক জনক অগাস্ট কোৎয়েরও ছিলেন অগ্রপথিক। এছাড়া যেটি সমভাবে উল্লেখযোগ্য তা হলো এই যে, খালদুন সমাজবিজ্ঞানে ব্যবহৃত ঐতিহাসিক গবেষণা পদ্ধতির বিকাশ সাধনে সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।’
অষ্ট্রিয়ার প্রাচ্যবাদী সামাজিক ঐতিহাসিক ব্যারন ভন ক্রেমারের বিবেচনায় খালদুনের সবচেয়ে বড় অবদান ঐতিহাসিক গবেষণা পদ্ধতির মৌলিক প্রস্তাবসমূহের বিকাশ সাধন, যা পরবর্তীকালে পাশ্চাতের সমাজবিজ্ঞানীদের দ্বারা অনুসৃত ঐতিহাসিক পদ্ধতি তথা ঐতিহাসিক সমাজবিজ্ঞান নামে অভিহিত হয়েছে।
অন্যদিকে ডাচ পন্ডিত টি জে দ্যা বোয়ার এর মতে, খালেদুন মূলত দার্শনিক। তার দর্শনচিন্তার আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য এই যে, খালদুন নিজে একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও কখনো রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ধর্মকে ব্যবহার করার পক্ষপাতী ছিলেন না।ইবনে খালদুনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বসমূহ ধর্মের দ্বারা কখনো প্রভাবিত হয়নি; বরং এরিস্টটল ও প্লেটোর যুক্তিশীল ভাবাদর্শের দ্বারাই তার ধ্যান-ধারণা অধিকতর রূপায়িত হয়েছিল। ইবনে খালদুন এমন একটি নতুন দার্শনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছিলেন, যা এরিস্টটলের চিন্তায় কখনো আসেনি। এর কারণ খালদুন তার ইতিহাসতত্ত্ব থেকে ওই দার্শনিক ব্যবস্থার বিকাশ সাধন করতে চেয়েছিলেন, যা সামাজিক জীবন ভিন্ন অন্য কিছু নয়। অধিকন্তু সমাজের অভ্যন্তরেই মানুষের বৌদ্ধিক সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটে।
এ মহান দার্শনিক ব্যক্তির আল মুকাদ্দিমা গ্রন্থটি আজো জ্ঞানকাঠামোর পরিষরে দীপ্তমান আলো ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে
ইবনে খালদুনের আল মুকাদ্দিমায় বিভিন্ন দেশের সীমারেখা, নদী, সাগর, অঞ্চল, জলপথ, জলবায়ু এবং কালের বিবর্তনে রাজ্যের সীমারেখা, রাজ্যের উত্থান-পতন, যুদ্ধবিধ্বস্ত নগরীর পটভূমি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
-মহামারী, প্রাচীন বিলুপ্ত শহর ও অঞ্চল, জ্যোতিষশাস্ত্রের বাস্তব প্রভাব, দুষ্প্রাপ্য ও বিলুপ্ত আরবি শব্দের বিবরণ, বিভিন্ন পর্বত ও গোত্রের নাম, যাযাবর জাতির জীবনযাত্রা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় পণ্ডিতদের নাম, তাদের রচনা ও শাস্ত্রীয় গ্রন্থের মূল্যায়ন করা হয়েছে এই গ্রন্থে। সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, আল মুকাদ্দিমা হলো "জ্ঞানের সমুদ্র"—যেখানে সকল উচ্চস্তরের বিদ্যা সংকলিত হয়েছে। এটি সমাজবিজ্ঞানের একটি প্রাচীনতম ও মৌলিক গ্রন্থ, যার ধারণাগুলো পরবর্তীতে অনেক পশ্চিমা চিন্তাবিদ যেমন লেনিন, কার্ল মার্ক্স প্রমুখ তাদের তত্ত্বে উপস্থাপন করেছেন। ইবনে খালদুনের আল-মুকাদ্দিমা প্রকৃতই একটি অসাধারণ গ্রন্থ, যা কেবল ইতিহাস বা সমাজবিজ্ঞান নয়, বরং এক জ্ঞানসাগর যেখানে ভূগোল, জলবায়ু, মানবসভ্যতা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং দর্শনের সমন্বয় ঘটেছে।
এই গ্রন্থে তিনি আকাশীয় প্রভাব (জলবায়ু, মহামারী) এবং মানবসভ্যতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। ইবনে খালদুনের কাজ শুধু অতীতের দলিল নয়, বর্তমানের জলবায়ু পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বা সাংস্কৃতিক পতন বুঝতেও প্রাসঙ্গিক।
শান্তা / শান্তা
“পিতৃ বিভাজন”
“বিশ্বকাপ উন্মাদনা”
“অনুতপ্ত হৃদয়”
“চাওয়া”-সুলেখা আক্তার শান্তা
“জীবন জিজ্ঞাসা”-সুলেখা আক্তার শান্তা
“একটি হত্যার ইতিকথা” সুলেখা আক্তার শান্তা
“ফটিক দাদুর দুর্ভাগ্য” সাঈদুর রহমান লিটন
তুমিহীনা ফারজানা ইয়াসমিন
অন্তর্বাসের আড়ালে স.ম. শামসুল আলম
“দাদি-নাতির দোয়ার ফি” -সুলেখা আক্তার শান্তা
“অলীক বেদনা” -সুলেখা আক্তার শান্তা
“ভালোবাসার রক্তদাগ”-সুলেখা আক্তার শান্তা