ঢাকা মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

ছোটগল্প

রূপান্তর রাত্রি-সুলেখা আক্তার শান্তা


ডেস্ক রিপোর্ট photo ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৮-৬-২০২৬ রাত ৮:৪৮

রূপান্তর রাত্রি
সুলেখা আক্তার শান্তা 

রহিমা জন্মেছিল টানাটানির সংসারে। আশা করেছিল বিয়ের পর স্বামীর সংসারে সুখ করে নারী জন্ম সার্থক করবে। বিয়ের পর বুঝতে পারে কল্পনা এক জিনিস আর সংসারের বাস্তবতা ভিন্ন। সংসারের খুঁটিনাটি সংকট ক্রমশ ঘনীভূত হতে থাকে সময়ের সাথে সাথে। স্বামী সিরাজ প্রাণবন্ত মানুষ। স্কুল-কলেজে খেলাধুলায় দারুণ নাম করেছিল কিন্তু সংসারের খেলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রাণান্ত পরিশ্রম করলেও সুখের দর্শনীয় উজ্জ্বলতা ছিল ম্রিয়মাণ। গতানুগতিক বিকল্পই ঠিক হয় শেষ পর্যন্ত। সিরাজ বিদেশে যাবে কাজ করতে। ইতিমধ্যে রহিমা দুই সন্তানের মা হয়েছে। বিদেশ যাবার আগের রাতে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল সিরাজের বুকে মাথা রেখে। 
বিদেশ যাবার পর রহিমা অনুভব করতে শুরু করে একাকীত্বের যন্ত্রণা। কর্মব্যস্ততায় দিন কেটে গেলও রাতের একাকীত্ব কিছুতেই কাটেনা। মনটা ভারী পাথরের মতো হয়ে ওঠে রাত জাগা পাখিদের হাহুতাশ আর হতাশার ডাকে। প্রতিবেশী লোকমানের চোখে বিষয়টি এড়ায় না। সে পরিস্থিতির সুযোগ নিতে এগিয়ে আসে।
এক কান দু কান করে বিষয়টি সিরাজের কানেও যায়। শুধু  যায় না, যায় নানা রঙে রঞ্জিত হয়ে। সিরাজের অন্তর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয় রাগে ক্ষোভে, প্রতিহিংসার আগুনে। সে দীর্ঘদিন দেশে আসতে পারছিল না কর্মক্ষেত্রে তার উন্নতি ব্যাহত হবে বলে। কিন্তু আর সে বিলম্ব করতে চায় না। তার মনে নিষ্ঠুর এক পরিকল্পনা কাজ করে। দেশে ফেরার তারিখ জানিয়ে দিলেও প্রকৃতপক্ষে নির্দিষ্ট তারিখের একদিন আগে সে‌ দেশে ফিরে হোটেলে অবস্থান করে। 
সিরাজের দেশে ফেরার খবর পেয়ে রহিমা এবং লোকমান আতঙ্কিত হয়ে পড়ে! রাগী স্বভাব সিরাজের সামনে পড়লে ভয়ংকর কান্ড হয়ে যেতে পারে। নিরুপায় হয়ে তারা পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। এদিকে সিরাজ গভীর রাতে তার পরিকল্পনা কার্যকর করতে বাড়ির দিকে এগোতে থাকে। সে দু’জনকে হত্যা করে পরের দিনের ফ্লাইটে বিদেশ চলে যাবে। কেউ তাকে ধরতে পারবে না।  


কাকতালীয়ভাবে লোকমান এবং রহিমা পালানোর জন্য সেই সময়টাই বেছে নিয়েছিল। বাড়ির পাশে জনমানবহীন বিস্তীর্ণ মাঠ। তারা সেই পথে যাত্রা করেছিল। আর সিরাজও এগোচ্ছিল সেই পথে। সিরাজ কলেজ জীবনে কারাতে ট্রেনিং নিয়েছিল, সে জানতো কোথায় আঘাত করলে মুহূর্তে কাউকে অজ্ঞান করে ফেলা যায়। সে নিঃশব্দে এগিয়ে পিছন থেকে লোকমানকে আঘাত করে। লোকমান জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুকিয়ে পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই রহিমাকেও অজ্ঞান করা হয়। সিরাজ তাদের রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলে। নিশুতি রাতের ঘন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে থাকে এখন কী করবে? দু’জনকে হত্যা করতে হবে? রহিমা তার দুই সন্তানের জননী। সন্তান দুটি মাতৃহারা হবে। লোকমান সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সংসারটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। মানুষ ভুল করে, সেও ভুল ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। হত্যার অপরাধে বিচারের সম্মুখীন হলে তার ফাঁসি না হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। তাতে তার সংসারও হবে লন্ডভন্ড। দাদা-দাদির কোলে ঘুমিয়ে থাকা দুই সন্তানের কথা মনে পড়ে। নিশুতি রাতের শীতল বাতাসে সিরাজের  মনে অলৌকিক এক চেতনা ভর করে। মনের মধ্যে লৌকিক লাভ ক্ষতি ভালো মন্দের‌ উর্ধ্বে আলোকিত হয়ে ওঠার চাপ অনুভব করে।
ইতিমধ্যে লোকমান এবং রহিমার জ্ঞান ফিরে আসে। সিরাজ দু’জনকে বসিয়ে বলে, রেডি হও দু’জনকে খুন করবো। লোকমান ক্ষিণ কন্ঠে বলে, সেই ভালো, তা না হলে সারা জীবন অপমানের বোঝা বইতে হবে। সিরাজ রহিমার দিকে তাকায়। জীবনের একাকিত্বের দুর্বিষহ যন্ত্রণা আর প্রলোভনে প্রবাসীদের সংসার ভেঙে যাওয়ার কাহিনী গুলো মনে পড়ে তার। অন্ধকারের মধ্যে পুব আকাশে তখন আলোর রেখা ফুটে উঠতে শুরু করেছে। সিরাজ দু’জনের  রশির বাধন খুলে দিলে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে সিরাজের পায়ের উপর। নিঃশব্দ এক উপলব্ধিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সিরাজ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে, রাত্রি অন্ধকার ভেদ করে আলোর রেখা ফুটে ওঠা দিগন্তের দিকে এগিয়ে যায় সে।

 

শান্তা / শান্তা