ঢাকা রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

​লোহাগাড়ার ইউএনও’র খামখেয়ালিপনায় প্রশাসনিক স্থবিরতা, ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ


বেলাল উদ্দিন photo বেলাল উদ্দিন
প্রকাশিত: ২১-৬-২০২৬ দুপুর ৩:৩৯

দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লোহাগাড়া উপজেলা প্রশাসনকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগ ওঠায় স্থানীয় জনমনে তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং উপজেলা পরিষদের প্রশাসক মোঃ বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা, সরকারি নির্ধারিত সময়সূচি উপেক্ষা, নাগরিক সেবায় চরম অনাগ্রহ, সরকারের পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী নীতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতাসহ নানাবিধ প্রশাসনিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ, দূর-দূরান্ত থেকে আসা সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষ এবং স্বয়ং উপজেলা প্রশাসনেরই একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা এসব অনিয়মের কারণে এই উপজেলার সামগ্রিক প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে এবং সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

দেশে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার সব ধরনের সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অফিসের সময়সূচি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পুনঃনির্ধারণ করেছে। পবিত্র ঈদুল আজহার সরকারি ছুটি শেষে গত ১ জুন থেকে সারা দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠান এই নতুন সময়সূচি কঠোরভাবে মেনে যথারীতি কার্যক্রম শুরু করলেও লোহাগাড়া উপজেলা প্রশাসনে সরকারের সেই অতিগুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার কোনো প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সরেজমিন অনুসন্ধানে স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগের শতভাগ সত্যতা পাওয়া গেছে। মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানকালে দেখা যায়, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ বায়েজীদ-বিন-আখন্দকে অধিকাংশ দিনই সকাল ১১টা কিংবা দুপুর ১২টার আগে তাঁর কার্যালয়ে দেখা যায় না। সরকারি নিয়মানুযায়ী সকাল ৯টায় অফিস কার্যক্রম শুরু হওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও, সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে প্রতিদিন লোহাগাড়ার বহু গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি প্রশাসনিক কাজ স্থবির হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রশাসনের প্রধান কর্মকর্তার এই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে প্রান্তিক মানুষের নাগরিক সেবা পাওয়ার অধিকার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন, প্রশাসনিক অনুমোদন, জরুরি বিভিন্ন সরকারি প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ, সরকারি নানা অনুদান এবং স্থানীয় বিরোধ ও অভিযোগ নিষ্পত্তিসহ দৈনন্দিন সেবার জন্য আসা অসহায় মানুষকে দিনের পর দিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকেই ক্ষোভের সঙ্গে ক্ষুরধার প্রশ্ন তুলে বলেন, জনগণের রক্তঘামে উপার্জিত করের টাকায় পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা যদি নিজেই নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থাকেন, তবে সাধারণ মানুষের এই অন্তহীন ভোগান্তি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা থামবে কীভাবে?

লোহাগাড়ার একাধিক সচেতন নাগরিক গভীর হতাশা ব্যক্ত করে এই প্রতিবেদককে জানান, জনস্বার্থ রক্ষা এবং আইন-শৃঙ্খলা ও পরিবেশের সুরক্ষায় বিভিন্ন স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপজেলা প্রশাসনকে তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া হলেও, ইউএনও’র পক্ষ থেকে সেগুলোর ব্যাপারে কোনো ধরনের কার্যকর বা দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। তারা আরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করে বলেন, যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে তাঁর সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অধিকাংশ সময়ই কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। এমনকি আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপে কল কিংবা লিখিত বার্তা পাঠিয়েও কোনো দিন কোনো জবাব পাওয়া যায় না বলে তারা দাবি করেন। এরই মধ্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার কঠোর শর্তে আরও কিছু গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তাদের দাবি, ইউএনও’র সরকারি বাসভবনে প্রায়শই বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়, যা একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তার আচরণবিধি এবং মাঠ প্রশাসনের ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তবে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভাগীয় শাস্তির ভয়ে এসব অভিযোগের পক্ষে তারা প্রকাশ্যে ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এই প্রশাসনিক অনিয়মের আরেকটি অন্ধকার দিক হচ্ছে সরকারি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশাসনের চরম উদাসীনতা ও রহস্যজনক ভূমিকা। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার সারা দেশে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের শপিংমল, মার্কেট ও বিপণিবিতান বন্ধ রাখার কঠোর নির্দেশনা জারি করলেও লোহাগাড়া উপজেলায় সেই নির্দেশনার কার্যকারিতা শূন্যের কোঠায়। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলার বিভিন্ন বড় বড় মার্কেট, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং অতি সম্প্রতি গড়ে ওঠা কৃত্রিম টার্ফভিত্তিক খেলার মাঠগুলো সরকারি আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত অনায়াসে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারের জ্বালানি সাশ্রয়ের জাতীয় নীতি চরমভাবে অমান্য করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের ব্যাপক অপচয় ঘটিয়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, লোহাগাড়া উপজেলা প্রশাসনের কোনো ধরনের কার্যকর নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান না থাকায় এই সব অবৈধ ও নিয়মনীতিহীন প্রতিষ্ঠান বুক ফুলিয়ে নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তারা মনে করেন, উপজেলা প্রশাসন আন্তরিকভাবে চাইলে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সরকারি এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব, কিন্তু অজ্ঞাত ও রহস্যজনক কারণে পুরো বিষয়টি বছরের পর বছর ধরে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। আরও ভয়াবহ অভিযোগ হলো, এই নির্ধারিত সময়ের বাইরে ও সরকারি আইন অমান্য করে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যবসা পরিচালনার অবৈধ সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা বা অর্থ আদায়ের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখানে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয় জনগণের দাবি, এই অবৈধ অর্থ মাঠপর্যায়ে সংগ্রহের মূল দায়িত্বটি অত্যন্ত গোপনে ও বিশ্বস্ততার সাথে পালন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ ফয়সাল আমির।

এ ছাড়া স্থানীয়দের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো, যখনই এলাকায় কোনো অবৈধ কার্যক্রম, পরিবেশ ধ্বংসের পাঁয়তারা, ফসলি জমির টপ সয়েল বা মাটি কাটা, নিষিদ্ধ পাহাড় ও টিলা কাটা কিংবা অন্য কোনো সামাজিক অপরাধের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে গোপনে তথ্য দেওয়া হয়, তার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট অভিযানের আগেই অভিযুক্ত অপরাধী বা সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিষয়টি হুবহু জেনে যায়। ফলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লোক দেখানো অভিযানের কার্যকারিতা পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় মূল অভিযানের আগেই অপরাধীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার এবং অপরাধের সমস্ত প্রমাণ দ্রুত সরিয়ে ফেলার সুযোগ পেয়ে যায়।

প্রশাসনিক এই স্থবিরতা ও দুর্নীতির সমান্তরালে লোহাগাড়া উপজেলা যেন ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ ও অপরিবর্তনীয় পরিবেশ বিপর্যয়ের জনপদে পরিণত হচ্ছে। দিনের আলো ফুরিয়ে যখনই সন্ধ্যা নামে, তখনই পুরো উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় অবৈধভাবে মাটি কাটা, মাটি পরিবহন ও কোটি কোটি টাকার মাটি বাণিজ্যের বিশাল মহোৎসব। গভীর রাত থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত শত শত ভারী ভেকু তথা এক্সকাভেটর এবং দানবীয় ডাম্প ট্রাকের গগনবিদারী গর্জনে কেঁপে ওঠে লোহাগাড়ার শান্ত গ্রামাঞ্চল। নির্বিচারে কাটা হচ্ছে তিন ফসলি কৃষিজমি, ড্রেজার দিয়ে সমতল করা হচ্ছে সুউচ্চ টিলা ও পাহাড় এবং চিরদিনের জন্য বদলে দেওয়া হচ্ছে লোহাগাড়ার প্রাকৃতিক ভূ-প্রকৃতি। স্থানীয় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি, বছরের পর বছর ধরে এই পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চোখের সামনে চললেও প্রশাসনের কোনো স্তরেই এর কোনো কার্যকর প্রতিরোধ আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি।

স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্র ও ভুক্তভোগী কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার কলাউজান, পুটিবিলা, চরম্বা, চুনতি, বড়হাতিয়া, আধুনগর ও পদুয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত ও বিস্তীর্ণ এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এই মাটি কাটার মরণখেলা চলছে। রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পরিচালিত এই সব সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক ও শক্তিশালী ভেকু এবং শত শত ডাম্প ট্রাক। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দিনের বেলায় সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দিতে বা আইনি জটিলতা এড়াতে অনেক স্থানে কার্যক্রম কিছুটা সীমিত বা বন্ধ রাখা হলেও, সন্ধ্যার পর থেকেই পুরোদমে শুরু হয় মাটি কাটার মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি। রাত যত গভীর হয়, গ্রামীণ সড়কগুলোতে এই সব নিষিদ্ধ ও ভারী ট্রাকের সংখ্যা এবং যাতায়াতের গতি ততটাই বাড়তে থাকে।

কলাউজান ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কৃষক আবদুল গফুর তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, আগে যে উর্বর জমিতে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে ধান, শাকসবজি ও নানাবিধ মৌসুমি ফসল উৎপাদিত হতো, মাটিখেকোদের থাবায় এখন সেখানে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল ও ভয়ানক এক একটি গিরিখাদ বা গর্ত। এর ফলে পুরো এলাকার জমির স্বাভাবিক ভূ-প্রকৃতি ও পানি ধারণ ক্ষমতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। রাতভর সেখানে শত শত ভারী ট্রাক চলাচল করলেও স্থানীয় প্রশাসনের কোনো ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের চোখে পড়েনি। কলাউজানের আরেক প্রান্তিক কৃষক মোহাম্মদ ইদ্রিস অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে অভিযোগ করেন যে, এলাকার রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি গরিব কৃষকদের নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে কৃষিজমির এই মূল্যবান মাটি কেটে চড়া দামে অন্যত্র বিক্রি করছে। এর ফলে ফসলি জমির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ চাষাবাদ ও কৃষি অর্থনীতি চরম হুমকির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

একইভাবে পুটিবিলা ইউনিয়নের কয়েকটি দুর্গম এলাকায় পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে একের পর এক প্রাকৃতির টিলা ও উঁচু জমি কাটার কারণে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ ভূমিধসের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। শাহজাহান মিয়া নামের পুটিবিলার এক প্রবীণ বাসিন্দা জানান, তাদের বসতবাড়ির একেবারে গা-ঘেঁষে থাকা প্রাচীন টিলার একটি বড় অংশ রাতারাতি কেটে সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। এর ফলে আসন্ন বর্ষায় ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে যেকোনো সময় টিলা ধসে বড় ধরনের প্রাণহানি ও মানবিক দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। একই এলাকার গৃহিণী রহিমা বেগম ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন তুলে বলেন যে, যদি উপজেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সত্যি সত্যি চায়, তবে কি এই অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ করা একেবারেই অসম্ভব? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে?

চরম্বা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় টপ সয়েল বলা হয়, তা নির্বিচারে কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক হেলাল উদ্দিন বলেন যে, যেকোনো ফসলি জমির আসল প্রাণশক্তি ও পুষ্টি থাকে তার এই উপরিভাগের কয়েক ইঞ্চির উর্বর মাটিতে। সেই প্রাণশক্তিই যদি রাতের আঁধারে সিন্ডিকেটের লোকেরা কেটে নিয়ে যায়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এসব জমিতে ফসল উৎপাদন একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে। চরম্বার একজন স্থানীয় স্কুলশিক্ষক নাম প্রকাশ না করার কঠোর শর্তে বলেন যে, এই অবিবেচকের মতো মাটি কাটা শুধু একটি সাময়িক পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পুরো উপজেলার ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট ও অপূরণীয় হুমকি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং চিরহরিৎ বনাঞ্চলের জন্য দেশজুড়ে সুপরিচিত চুনতি ইউনিয়নেও চলছে নির্বিচারে পাহাড় ও টিলা কাটার ভয়াবহ উৎসব। চুনতির স্থানীয় এক পরিবেশ সচেতন বিশিষ্ট ব্যক্তি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন যে, চুনতির এই অনুপম প্রাকৃতিক ভূ-প্রকৃতি ও বনাঞ্চল যদি এভাবে ধ্বংস হতে থাকে, তবে শুধু লোহাগাড়া নয়, পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের পরিবেশগত ও জলবায়ুগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর মতে, পাহাড়ি ঢাল ও প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা টিলাগুলো কেটে ফেলার কারণে প্রতি বছর বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ঝুঁকি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

অন্য দিকে, মাটি বহনকারী অতিরিক্ত ওজনের এই সব ভারী ডাম্প ট্রাক যাতায়াত করার কারণে বড়হাতিয়া ও আধুনগর ইউনিয়নের গ্রামীণ জনগণের চলাচলের সড়কগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী নাছির উদ্দিন বলেন যে, জনগণের কোটি কোটি টাকার ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত গ্রামীণ পিচঢালা সড়কগুলো এই সব নিষিদ্ধ ও ভারী ট্রাকের অতিরিক্ত চাপের কারণে কয়েক মাসের মধ্যেই ভেঙে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি করছে। অথচ এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের জন্য আজ পর্যন্ত কাউকে কোনো জবাবদিহিতা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। আধুনগরের এক ভুক্তভোগী বাসিন্দা জানান যে, রাতভর শত শত ট্রাক চলাচলের কারণে পুরো এলাকায় শব্দদূষণ ভয়াবহ ও সহ্যাতীত আকার ধারণ করেছে, যার ফলে এলাকার কোমলমতি শিশু ও বৃদ্ধরা রাতে ঘুমাতে না পেরে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ও ভোগান্তিতে পড়ছেন।

পদুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন নিচু ও ফসলি এলাকায় বছরের পর বছর ধরে লাগামহীনভাবে মাটি কাটার ফলে জমির স্বাভাবিক উচ্চতা ও ঢাল নষ্ট হয়ে গেছে, যার প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতিতে পুরো এলাকায় স্থায়ী কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, অতীতে যেসব জমি থেকে বৃষ্টির পানি খুব সহজেই প্রাকৃতিকভাবে নিষ্কাশিত হয়ে যেত, মাটিখেকোদের কৃত্রিম গর্তের কারণে এখন সেখানে বছরের অধিকাংশ সময় পানি আটকে থাকে, ফলে হাজার হাজার একর জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, লোহাগাড়ার এই বুক চিরে কেটে নেওয়া মাটির একটি সিংহভাগ বা বড় অংশ জোগান দেওয়া হচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা অবৈধ, লাইসেন্সবিহীন এবং নিষিদ্ধ ইটভাটায়। এই সব ইটভাটার অধিকাংশেরই কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র কিংবা জেলা প্রশাসনের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। পরিবেশবিদদের মতে, কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি এভাবে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী এবং এর দীর্ঘমেয়াদি কুফল হিসেবে সমগ্র অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন হ্রাস ও তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

লোহাগাড়ার স্থানীয় আপামর জনসাধারণের একটি বড় অংশের সরাসরি অভিযোগ, এই অবৈধ মাটি কাটা এবং লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা পরিচালনার পেছনে এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের একটি অতি শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট বা চক্র কাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে যে, উপজেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু ও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রছায়ায় এই সব অবৈধ পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম কোনো বাধা ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে চলছে। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ ফয়সাল আমির এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত গাড়িচালক শাহ আলমের মাধ্যমে অবৈধ মাটি কাটা চক্র এবং অবৈধ ইটভাটার মালিকদের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ ও মাসোহারা লেনদেন করা হয়। তবে এই সব গুরুতর ও সুনির্দিষ্ট আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সমগ্র বিষয় ও স্থানীয়দের উত্থাপিত বিভিন্ন গুরুতর প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানতে লোহাগাড়া উপজেলার নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক মোঃ বায়েজীদ-বিন-আখন্দের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে তাঁর সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিক দিন ও সময়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি গভীর রাতে যখন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ভেকু দিয়ে মাটি কাটা হয়, তখন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা ইউএনও’র ফোনকল ও হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় দ্রুত হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানালেও তিনি কোনো উত্তর দেন না। ফলে প্রশাসনের এমন রহস্যজনক ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই।

এই প্রতিবেদনের সত্যতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র যাচাইয়ের জন্য এই প্রতিবেদক নিজে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে সরকারি নির্ধারিত সময় সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা উপস্থিত থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সরকারের বেঁধে দেওয়া এই দীর্ঘ সময়েও লোহাগাড়ার ইউএনও মোঃ বায়েজীদ-বিন-আখন্দ তাঁর কার্যালয়ে এসে উপস্থিত হননি। ফলে তাঁর প্রশাসনিক খামখেয়ালিপনা ও স্থানীয় জনগণের বিস্তর অভিযোগের বিষয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক কোনো আত্মপক্ষ সমর্থক বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবিদরা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন যে, লোহাগাড়ায় যেভাবে আইন অমান্য করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কৃষিজমি, টিলা ও পাহাড় কাটা এবং রাতভর ডাম্প ট্রাকের তাণ্ডব অব্যাহত রাখা হয়েছে, তা যদি এখনই বন্ধ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই পুরো অঞ্চল এক ভয়াবহ ও অপরিবর্তনীয় পরিবেশগত মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। এর ফলে এলাকায় আকস্মিক ভূমিধস, স্থায়ী জলাবদ্ধতা, মাটির চিরস্থায়ী উর্বরতা হ্রাস, স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি এবং সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে এক অপূরণীয় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাদের মতে, এখনই সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে, লোহাগাড়ার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এর জন্য অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হবে।

স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিশ্লেষকদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলার সার্বিক প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রধান দায়িত্বে থাকা প্রথম শ্রেণীর একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি ধারাবাহিকভাবে এবং সুনির্দিষ্টভাবে এই ধরনের দায়িত্বহীনতা, অবহেলা ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তবে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। রাষ্ট্রীয় সুশাসন সুসংহত করা এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষার স্বার্থে সরকারের উচ্চ মহলের উচিত অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে এই সমস্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা।

সার্বিক এই প্রশাসনিক স্থবিরতা, অনিয়ম ও লোহাগাড়ার পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার বক্তব্য জানতে তাঁর সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেও বক্তব্য চেয়ে বার্তা পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমএসএম / এমএসএম

রায়গঞ্জে মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে টাকা দাবি, ভুয়া ডিবি সদস্য আটক

কুড়িগ্রামে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত

কোম্পানীগঞ্জর মুছাপুরে নাছের উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩ শিক্ষকের বিদায়ী সংবর্ধনা ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান

মাদকের ভয়াবহতার ছোবলে গ্রাস যুব সমাজ

কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মানবিক ডাক্তার হাবিবুর রহমান

জামালপুরে ডিবির অভিযানে ৯০ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার, গ্রেফতার ২

নরসিংদীতে বিএসটিআই ও র‍্যাবের যৌথ অভিযানে তিন প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা

সলঙ্গায় আল আমিন সামিদুলের মাদক ব্যবসার নেপথ্যের খুঁটির জোর কোথায়

টুঙ্গিপাড়ায় ঋণের চাপে প্রধান শিক্ষকের আত্মহত্যা, ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

খালিয়াজুরীতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার দাবিতে প্রশাসন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান

ডুমুুরিয়ার ক্ষতিগ্রস্থ গুচ্ছ গ্রামের ৬৮ পরিবার পেলো আর্থিক সহায়তা

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে সখিপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পোস্টারিং, এলাকায় চাঞ্চল্য