মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সে ‘টোকেন সিন্ডিকেট’! অবৈধ অর্থ বাণিজ্যে মেতেছে টিআই আবু সাঈয়েদ বাকার!
দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক এলাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশ দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে। একই সঙ্গে এই মহাসড়ক ব্যবহার করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী, পেকুয়া, মগনামা, বদরখালীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের হাজার হাজার অবৈধ গ্রামীণ সিএনজিও নিয়মিত চলাচল করছে। আইন অনুযায়ী এসব গ্রামীণ সিএনজির জাতীয় মহাসড়কে চলাচলের কোনো বৈধ অনুমতি না থাকলেও বছরের পর বছর ধরে তারা প্রকাশ্যে মহাসড়ক ব্যবহার করছে। এই অবৈধ চলাচলের পেছনে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী ‘টোকেন সিন্ডিকেট’, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সাম্প্রতিক সময়ে এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্স। অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য, স্থানীয়দের বক্তব্য, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ এবং একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্যমতে, এই টোকেন বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সের টিআই আবু সাঈয়েদ বাকার। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া মহাসড়কে এত বিপুল সংখ্যক অবৈধ গ্রামীণ সিএনজির চলাচল কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী, পেকুয়া, মগনামা ও বদরখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার অবৈধ গ্রামীণ সিএনজি ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ওঠে। এসব যানবাহনের চালকদের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে ‘টোকেন’ নামে অর্থ আদায় করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো এলাকায় একটি টোকেনের মূল্য ৭০০ টাকা, কোথাও ৮০০ টাকা, আবার কোথাও তা এক হাজার টাকা ছাড়িয়ে ১,২০০ টাকায় পৌঁছেছে। এই অর্থ পরিশোধের পর চালকরা একটি ছোট কাগজ বা বিশেষ চিহ্ন পান, যা সিএনজির ভেতরে দৃশ্যমান স্থানে রাখা হয়। ওই কাগজই মূলত নিরাপদে মহাসড়কে চলাচলের ‘পাস’ হিসেবে ব্যবহৃত হয় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানান, টোকেন ছাড়া কোনো সিএনজি মহাসড়কে নামতে সাহস পায় না। আর টোকেন থাকলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ট্রাফিক পুলিশের চেকপোস্টে তাদের কোনো জটিলতায় পড়তে হয় না। ফলে এই অবৈধ অর্থ আদায়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ যাত্রীর ওপর। চালকরা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে যাত্রীদের কাছ থেকেই বেশি ভাড়া আদায় করেন। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ, যারা প্রতিদিন জীবিকার প্রয়োজনে এসব সিএনজিতে যাতায়াত করেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পুরো টোকেন বাণিজ্যের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করেন সাকিব নামের এক ব্যক্তি। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, ট্রাফিক বক্সে দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্জেন্ট কিংবা অন্যান্য কর্মকর্তার বদলি হলেও সাকিবের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকে। ফলে প্রশাসনিক রদবদল হলেও টোকেন সিন্ডিকেটের কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়ে না। বরং আগের মতোই অব্যাহত থাকে অর্থ আদায়।
এই সিন্ডিকেটে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদকের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, ইউসুফ, ইউনুস, রাকিব ও আনোয়ার নামের কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এই টোকেন বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন এবং প্রতি মাসের আদায় হওয়া অর্থের হিসাব সংরক্ষণের জন্য আলাদা একজন ক্যাশিয়ারও নিয়োজিত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত এসব তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
অভিযোগের পরিধি শুধু গ্রামীণ সিএনজিতে সীমাবদ্ধ নয়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন পরিবহন থেকেও নিয়মিতভাবে অর্থ আদায় করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সৈয়দ নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে কোনো কোনো পরিবহন থেকে মাসে ১০ হাজার টাকা, আবার কোনো কোনো পরিবহন থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এছাড়া অবৈধভাবে পরিচালিত ঈগল পরিবহন থেকেও নিয়মিত ‘চা-খরচ’ নামে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উপাত্ত প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মহাসড়কে চলাচলকারী অবৈধ সিএনজিগুলোর ভেতরে রাখা ছোট্ট একটি কাগজই মূলত তাদের পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করে। দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক সদস্যরা ওই কাগজ দেখেই অনেক ক্ষেত্রে গাড়িগুলোকে ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কোনো কারণে যদি ওই চিহ্নিত কাগজটি না থাকে, তখনই সংশ্লিষ্ট গাড়িকে আটক করে অভিযান পরিচালনা করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অভিযান মূলত লোক দেখানো। কারণ, কিছু সময় পর আবার একই ধরনের গাড়িগুলো আগের মতোই চলাচল করতে দেখা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রাফিক সার্জেন্ট অভিযোগ করেন, তারা অনেক সময় মহাসড়ক থেকে অবৈধ সিএনজি আটক করে মামলা দেওয়ার জন্য ট্রাফিক বক্সে নিয়ে আসেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর টিআই আবু সাঈয়েদ বাকার বিভিন্ন ফোনকল পাওয়ার পর অনেক গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ফলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয় না। উল্টো এ বিষয়ে আপত্তি জানালে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের তিরস্কারের মুখেও পড়তে হয় বলে দাবি করেন তারা।
বিশেষ সূত্রে আরও জানা গেছে, এই মহাসড়ক ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত শত শত চোরাই সিএনজিও চলাচল করছে। অভিযোগ রয়েছে, টোকেন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে এসব গাড়িও নির্বিঘ্নে মহাসড়ক ব্যবহার করছে। ফলে একদিকে যেমন সড়ক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
মইজ্জ্যারটেক স্টেশন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। কিছুদিন পর আবার আগের মতোই অবৈধ অটোরিকশার দখলে চলে যায় পুরো এলাকা। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করেই এসব যানবাহন পুনরায় চলাচল শুরু করে। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যও প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সের টিআই আবু সাঈয়েদ বাকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শুরুতেই প্রতিবেদকের প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। একপর্যায়ে তিনি সংবাদ প্রকাশ নিয়ে অসৌজন্যমূলক মন্তব্য করেন এবং কয়েকজন সংবাদকর্মীর সঙ্গেও অশোভন আচরণ করেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে টোকেন বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি এমন মন্তব্য করেন, যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেদকের কাছে ওই কথোপকথনসংক্রান্ত তথ্যও সংরক্ষিত রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক (বন্দর) বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) কবীর আহমেদ দৈনিক সকালের সময়কে বলেন, "আপনারা পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব তথ্য-উপাত্ত পেয়েছেন, সেগুলো আমাদের দিন। কোনো বেসামরিক ব্যক্তির ট্রাফিক পুলিশ বক্সের দাপ্তরিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ নেই। আপনারা যে অভিযোগ ও তথ্য দিয়েছেন, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করে দেখা হবে। তথ্য প্রদানকারীদের বক্তব্যও আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নয়ন দেব নাথ দৈনিক সকালের সময়কে বলেন, “জাতীয় মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশ বক্সকে কেন্দ্র করে টোকেন বাণিজ্য, অবৈধ অর্থ আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া জরুরি। তদন্তে যদি কোনো ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জনআস্থা বজায় রাখা এবং জাতীয় মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে আপসের সুযোগ নেই।”
পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, স্থানীয় সচেতন নাগরিক এবং বিভিন্ন মহলের অভিমত, যদি এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে এটি কেবল একটি অবৈধ টোকেন বাণিজ্যের ঘটনা নয়; বরং জাতীয় মহাসড়কে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম, সড়ক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার জন্যও একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। প্রতিদিন হাজার হাজার অবৈধ যানবাহনের চলাচল, নিয়মিত অবৈধ অর্থ আদায় এবং কথিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই কথিত টোকেন সিন্ডিকেট, অবৈধ অর্থ লেনদেন, মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের চলাচল এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এমএসএম / এমএসএম
রাজশাহীর শিক্ষার উন্নয়নে সর্বাধিক কাজ করে যাব: এমপি হাবীবা
মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সে ‘টোকেন সিন্ডিকেট’! অবৈধ অর্থ বাণিজ্যে মেতেছে টিআই আবু সাঈয়েদ বাকার!
রাণীনগরে সরকারের বহুমুখী উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা কর্মসূচির মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত
রামগড় রোড ট্রাক ও মিনি ট্রাক চালক কল্যাণ সমবায় সমিতির উদ্যোগে অনুদান প্রদান
নাচোলে আষাঢ়ের শেষেও অনাবৃষ্টি, বীজতলা ফেটে চৌচির
কাশিমপুরে ক্রয়কৃত জমি বেদখলের চেষ্টার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন
পটিয়ায় মাদ্রাসাছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার
নাগরপুরে চলমান জিও ব্যাগ ডাম্পিং কাজের অগ্রগতি দেখতে আকস্মিক পরিদর্শনে এমপি লাভলু
ঈশ্বরদীতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ালে এলাকার উন্নয়ন সম্ভব: প্রতিমন্তী ফারজানা শারমিন পুতুল
তীব্র তাপদাহে কুড়িগ্রামে বাড়ছে রোগব্যাধি, বেশি ঝুঁকিতে শিশু ও বৃদ্ধরা
২ মাদক ব্যবসায়ী আটক
পাথরঘাটায় শিক্ষার্থীদের মাঝে জেলা প্রশাসকের স্কুলব্যাগ বিতরণ