ব্যাংককে ১৯১ দেশের অর্থনৈতিক মহাযজ্ঞ শেষ: বৈশ্বিক সংস্কারের নতুন রূপরেখা, অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ যা পেল
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং থমকে যাওয়া বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের 'কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে' (QSNCC) সফলভাবে শেষ হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলন। ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই আন্তর্জাতিক মিলনমেলায় বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বহুপক্ষীয় সিদ্ধান্ত ও নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
সম্মেলনে আন্তর্জাতিক উপস্থিতি
বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় এই সম্মেলনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মোট ১৯১টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি অংশ নেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, শীর্ষ ব্যাংকার ও উন্নয়ন সংস্থার প্রধানসহ ১৫ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত প্রতিনিধি ব্যাংককে একত্র হন। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক সুশীল সমাজ, উদীয়মান প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ৫০০-রও বেশি সাংবাদিক এই সম্মেলন কভার করেন।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও কোন দেশ বা খাত কী পেল
সম্মেলন শেষে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল তাদের অর্থনৈতিক সুরক্ষায় বড় ধরণের ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি অর্জন করেছে:
* স্বাগতিক থাইল্যান্ড: আয়োজক দেশ হিসেবে থাইল্যান্ড তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোর জোট 'ওইসিডি' (OECD)-র সদস্যপদ পাওয়ার পথ সুগম করেছে দেশটি। পাশাপাশি পর্যটন ও প্রযুক্তি খাতে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
* নিম্ন আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশসমূহ: স্বল্পোন্নত দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রবৃদ্ধি সুরক্ষায় আইএমএফ-এর বিশেষ ফান্ডের (PRGT) আওতায় ধনী দেশগুলো থেকে নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, যা এসব দেশের জন্য সুদমুক্ত ও সহজ শর্তের ঋণ নিশ্চিত করবে।
* উন্নত অর্থনীতি ও উদীয়মান বাজার: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-র কারণে চাকরির বাজারে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সামাল দেওয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারসাম্য আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় 'জলবায়ু তহবিল' (Climate Financing) সম্প্রসারণে নতুন গাইডলাইন অনুমোদন করা হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির পূর্বাভাস ও আইএমএফ-এর বার্তা
সম্মেলনের সমাপনী ব্রিফিংয়ে আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বিশ্ব অর্থনীতির মূল চিত্র তুলে ধরেন। আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৩.১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা প্রাক-মহামারী সময়ের চেয়ে এখনো কম। আইএমএফ জোর দিয়ে বলেছে যে, যেসব দেশে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় রয়েছে, সেখানে কঠোর বা সংকুচিত মুদ্রানীতি ধরে রাখতে হবে এবং ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ নজর দিতে হবে।
ব্যাংককে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর জোরালো ভূমিকা
সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ব্যাংককের কুইন সিরিকিত সেন্টারে অনুষ্ঠিত একাধিক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তিনি সরকারের ঘোষিত অর্থনৈতিক নীতি, সাম্প্রতিক কাঠামোগত সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের কথা তুলে ধরেন।
বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্দেশ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ অন্ধভাবে কোনো বহিরাগত বা আন্তর্জাতিক শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী নয়। দেশের অর্থনীতির বাস্তবতার নিরিখে আমরা নিজস্ব উদ্ভাবিত বা 'হোমগ্রোন' অর্থনৈতিক সংস্কার রূপরেখা বাস্তবায়ন করছি।"তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো মুক্তবাজার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণে বাধা দূর করা এবং রিজার্ভ সুরক্ষায় বাণিজ্যভিত্তিক কঠোর শর্তের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত নমনীয় বাজেট সহায়তা নিশ্চিত করা। তাঁর এই জোরালো ও দূরদর্শী উপস্থাপনার পর আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ কর্তারা বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কার পরিকল্পনার প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন।
দিনশেষে বাংলাদেশের ঝুলিতে কী এলো?
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং এআইআইবি-র শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বেশ কয়েকটি সফল দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সম্পন্ন করেছে। সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের মূল অর্জন ও প্রাপ্তিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ‘হোমগ্রোন’ বা নিজস্ব সংস্কার এজেন্ডার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মহলে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, চাপিয়ে দেওয়া একপাক্ষিক শর্তের বদলে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতায় প্রণীত ‘হোমগ্রোন সংস্কার পরিকল্পনা’ বেশি কার্যকর। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক সরকারের রাজস্ব নীতি আধুনিকীকরণ, ব্যাংক খাতে গতিশীলতা ও শৃঙ্খলা ফেরানো এবং বাজার অর্থনীতি জোরদার করার এই দেশীয় উদ্যোগগুলোকে নীতিগত অনুমোদন ও পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে।
২. বাজেট সহায়তা ও অতিরিক্ত ফান্ডের প্রতিশ্রুতি: বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও ডলার রিজার্ভের ওপর চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশ বাড়তি ঋণ ও সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বিশেষ উদ্যোগে চলমান আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি দেশের রিজার্ভের সুরক্ষা বলয় (Cushion) মজবুত করতে অতিরিক্ত তহবিল দেওয়ার বিষয়ে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে জোরালো আশ্বাস পাওয়া গেছে।
৩. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রানীতির নতুন দিকনির্দেশনা: আইএমএফ বাংলাদেশ ব্যাংককে দেশের মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসা পর্যন্ত সুদের হার ও টাকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে সংকুচিত মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এবং রিজার্ভের ক্ষয় রোধ করতে সহায়তা করবে।
৪. বিশ্ববাজারে উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা: অতীতের ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধের রেকর্ড এবং নতুন সরকারের উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ আর্থিক নীতি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও বহুপক্ষীয় সংস্থাসমূহের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয়েছে। এর ফলে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়া এবং ভবিষ্যতে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্প ঋণ পাওয়ার পথ সুগম হলো।
প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ: সব মিলিয়ে ব্যাংককের এই বার্ষিক সম্মেলন থেকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ কোনো কৃত্রিম প্রতিশ্রুতি নয়, বরং নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রেখে রিজার্ভ সুরক্ষায় বাজেট সহায়তার সুনির্দিষ্ট ও সফল পথ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
এমএসএম / এমএসএম
ব্যাংককে ১৯১ দেশের অর্থনৈতিক মহাযজ্ঞ শেষ: বৈশ্বিক সংস্কারের নতুন রূপরেখা, অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ যা পেল
দেশের বাজারে আজ সোনার ভরি কত?
বৈরুতের মতো চট্টগ্রাম বন্দরে বিস্ফোরণের শঙ্কা
দাম কমার প্রভাবে ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে ধাক্কা
বাংলাদেশের অর্থনীতি রক্ষায় বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর ইতিবাচক সাড়া: অর্থমন্ত্রী
বাজারে কম দামি সবজি কেবল পেঁপে-মিষ্টি কুমড়া
কালিয়াকৈর-ময়মনসিংহ ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন চালু বৃহস্পতিবার
কারখানায় উৎপাদন নেই, কাগজে রপ্তানি, ৮৫ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ছে, আরও সহায়তা আসা উচিত: অর্থমন্ত্রী
বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সহযোগিতার উদ্যোগ
সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে সব ধরনের পণ্য উৎপাদন করছে ওয়ালটন
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে একমত বিশ্বব্যাংক : অর্থমন্ত্রী